তবে মুনসি তখনো উড়াল দেয় নি। বিলের পাড় থেকে হাঁক ছাড়ে এই শালা মাঝির বাচ্চা, খানকির পয়দা, এটি আয়, লাও এই ঘাটোত ভেড়া।
মুনসির ধারাই অন্যরকম, সে গালি দিয়ে কাছে ডাকে। ব্যাকুল হয়ে নৌকা ঘাটে ভিড়িয়ে তমিজের বাপ কাদায় নামতেই তার মাথায় পড়ে মাছের নকশা আঁকা লোহার পান্টির এক বাড়ি। বাড়ি মারতে মারতে ফুটো গলায় মুনসি হাঁক দেয়, এই শালা ডাইঙার বাচ্চা, শালা বারোভাতারির পয়দা, জাউরা শালা, মাছ চুরি করবার আসিস? লিত্যি তুই বিলের ধারত ঘুরিস, আমি জানি না, না? টাকা পয়সা খরচ করা লায়েবের হাতোত পাহোত ধরা হামি বিল পত্তন লিলাম, শালা তোক মাছ খিলাবার জন্যে?
লোহার পান্টির বাড়িতে তমিজের বাপের মাথা ঘুরে যায়, মুনসির বেশিরভাগ কথা সে বুঝতেই পারে না। তবে ঝাপসা চোখে তার নজরে পড়ে, মুনসির পাগড়ি খসে পড়েছে, তার মাথায় কিসতি টুপি; তার বুকের শেকল চাপা পড়েছে গরম চাঁদরের নিচে, তার গলার ফুটো মাফলার দিয়ে ঢাকা। এমন কি হাতের লোহার পান্টিটাও বোলওয়ালা খড়মের আদল নিয়েছে। তমিজের বাপের সামনে থেকে মুনসি হাওয়া হয়ে সেখানে রেখে যায় শরাফত মণ্ডলকে। তাইতো, শিমুলগাছের সাদা বকেরা ওপরে ওড়ে, বিলের ধারে শরাফত মণ্ডলকে পিতিষ্ঠা করে মুনসি উড়াল দিয়েছে পাকুড়তলার দিকে। শরাফতের পেছনে টর্চলাইট হাতে তার বড়ো বেটা আবদুল আজিজ। আবদুল কাদের হঠাৎ করে ধরে ফেলে বাপের খড়ম ধরা হাত। আরো কেউ কেউ বোধহয় ছিলো। হরমতুল্লাহ এলো কোত্থেকে? বৈকুণ্ঠের মতো কাকে যেন দেখা গেলো। তার পাশে ওটা কি তমিজ?
এগুলো সবই তমিজের বাপের সামনে বড়ো এলোমেলো ঠেকে। মুনসি একেবারে এখানে এসে তাকে দেখা দিয়ে গেলো, তার লোহার পান্টির বাড়িতে মাথা তার টনটন। করে। তারপর সে কি পাকুড়তলায় গেলো? কিছুই মনে নাই। এতোসব কাণ্ড দেখতে সে কেবলি হাপসে যায়। তার গতরটা বড়ো কাপে। জ্বরের পুরু কম্বলের নিচেও সে ওম পায় না। আরে সে তো সে, উত্তরে পাকুড়তলা থেকে দক্ষিণে সাদা বকে ছাওয়া শিমুলগাছ পর্যন্ত কেবলি কাপে। বিল বলো, ডাঙা বলো, কিছুই থিতু হতে পারে না।
২৭. পোড়াদহের মেলা
পোড়াদহের মেলা থেকে তমিজ বাড়ি ফেরে অনেক রাত করে। অতো রাতে মেলা-ফেরতা মানুষের কলরবে মাঝিপাড়া গমগম করে ওঠে, ঘুমিয়ে-পড়া বৌঝিরা জেগে উঠে পুরুষদের হাত থেকে ঝোলা তুলে নেয়, ছেলেমেয়েরা জিলেপির আর তেলেভাজার গন্ধে ঘুমের মধ্যেই গড়িয়ে পড়ে নতুন কোনো স্বপ্নে। আর তমিজের ঘরে তার সঙ্গে ঢোকে শুধু কালাম মাঝি। তমিজের বাপের ঘরের দরজায় উকি দিয়ে বলে, ও চাচা, ও তমিজের বাপ, কাল জুম্মাঘরত একবার আসো তো বাপু। মণ্ডল তোমার গাওত। হাত দিছে, হামরাই সালিশ করমু। শুনিছো তো, হামার তহসেন হাবিলদার হবি, এই মাসেই প্রমোশন হওয়ার কথা, তাই এবার মেলাত আসবার পারে নাই। তহসেন একটা চিঠি লেখলে আমতলি থ্যাকা দারোগা লিজে অ্যাসা মণ্ডলকে ব্যান্দা লিয়া যাবি। কাল তুমি একবার আসো।
কালাম মাঝি চলে গেলে ঘরটা ঝপ করে নীরব হয়ে যায়। কুলসুম তমিজের দিকে তাকায় না পর্যন্ত। তমিজের বাপের জ্বরো শরীরটা নিয়ে তামামটা দিন যে কীভাবে কাটলো তা এক আল্লা ছাড়া আর কেউ জানে না। জানার দরকারও নাই। আর তমিজ মেলায় ফুর্তি করে ফিরলো এতো রাতে। আর তার আদরের বাহার কতো! –শালপাতার ঠোঙা করে জিলেপি এনেছে, কদমা এনেছে, বেগুনি পেঁয়াজি, কতরকমের তেলে-ভাজা। খলুইতে বড় মাছের ভাগা, মাছে পচনের গন্ধ। আনুক! কুলসুমের কী?
তবে ছোঁড়ার গায়ের জোর বটে। বাপের অতো বড়ো গতরটা সে একাই তুলে ফেললো মাচার ওপর। কুলসুম আড়চোখে তার হাতের ক্ষমতা দেখে। তাও তো কাল থেকে বাড়ির বাইরে, সারাটা দিন মুখে তার কিছু পড়েছে কি-না কে জানে? এই খালি পেটে মানুষটা সারা দিন কী খাটনিটাই না খেটেছে।
ডোবা থেকে তমিজ কলসি ভরে পানি আনে। মেঝেতে বড়ো একটা মালসা রেখে বাপের মাথায় পানি ঢালে, গজর গজর করে, গাও বলে পুড়্যা যায়, এক বদনা পানিও ঢালা হয় নাই। রাগ করে কুলসুম জবার দেবে কী, তমিজের বাপের বিছানায় পানি গড়িয়ে পড়তে দেখে তাকে এগিয়ে আসতে হয় তমিজের হাত থেকে বদনা নিতে। বেটাছেলে কি আর এসব কাম কুলাতে পারে গো? অনেকক্ষণ ধরে পানি ঢালার পর। কুলসুম স্বামীর মাথা মুছে ভেতরের উঠানের দিকে পা বাড়ালে তমিজ তার হাতে তুলে দেয় তেলে-ভাজার ঠোঙা। এই মাঝরাতে এসব খেতে বয়ে গেছে কুলসুমের। ঠোঙাগুলো মাচার এক কোণে ফেলে রেখে সে তুলে নেয় মাছের খলুই। উঠানে বসে সে মাছ ঘোয়, মাছ কোটে আর বাপের পাজরার কাছে বসে তমিজ একটার পর একটা জিলেপি খায়।
তমিজের ঘাড়ে চিনচিন করে ব্যথা, ব্যথাটা খুব একটা কষ্ট দেয় না, বরং একটু মিষ্টি মিষ্টিই লাগে। এই ঘাড়ে আজ কাঠের জিনিস বওয়া হলো মেলা। আম কাঠের, কাঁঠাল কাঠের খাট, তক্তপোষ, আলনা, বেঞ্চি, টুল, চেয়ার, পিড়ি—একেকটা ভারি কী। কামলা তো আরো মেলা ছিলো, তমিজের মতো এতো বইতে পারলো না আর কেউ। মেলা পয়সা কামালো সে। এই টাকাটা রেখে দেবে একদম আলাদা করে। আজ মেলায় কামলা খাটার বুদ্ধিটা পাওয়া গেলো;সামনের দুই মাসে ওদিকে বাগবাড়ি নিশানের মেলা, দক্ষিণে এলাঙ্গির মেলা, তারপর ধরো রয়াদহের ফকিরের মেলা। আর করতোয়ার পশ্চিমে চৈত্র পর্যন্ত তো সপ্তাহে সপ্তাহে কোথাওঁ না কোথাও মেলা একটা লেগেই থাকে। কয়েকটা মেলায় গতর খাটাতে পারলে তার রোজগার খায় কোন শালা? ঐ রোজগারের একটা পয়সাও সে সংসারে ঢালবে না। জোড়া গোরু কিনবে দশটিকার হাট থেকে। একেকটা গোরু মোষের সমান, দশরথের হাঁপর থেকে ফলা গড়িয়ে নিয়ে লাঙলের সঙ্গে গোরু জুতে দিলে এক চাষে মাটি উপড়ে আসবে দেড় হাত নিচে থেকে। এক বিঘা জমিতে আমন তো আমন, আউশও সে যা তুলবে, এই তামাম এলাকার কোনো চাষার বেটা স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবে নি। নিজেদের ভিটার জমিটা সে খাইখালাসি নেবে শরাফতের কাছ থেকে, সেই জমির মাটি কী! মাখনের মতো মাটি, দুটো চাষ দিলেই ধান বাড়ে দুব্বার মতো। কিছু টাকা জমালেই সে জমিটা পায়। টাকা সে জমাতে পারবে না কেন? তার তো আর চাষাদের মতো আলগা ফুটানি নাই, ফুর্তি করে পয়সা ওড়াবার বান্দা সে নয়। এই যে শালা কেরামত আলি, পুবের চরুয়া চাষা, এখন গান করে করে। খুব নাকি পয়সা কামায়। কিসের কামাই? তার কামাইয়ের বরকত কোথায়? আজই তো কতো টাকা ঢেলে এলো নটির ঘরে। এভাবে ওড়ালে পয়সা কামাই করে লাভ কী?
