তখন থেকে তমিজের মাথাটা গরম এবং শরীরটা ঠাণ্ডা। এক নটিমাগীর সামনে, বেশ্যার সামনে কেরামত আলি তাকে এমন হেনস্থা করলো? তার ইচ্ছা করছিলো, মেলা থেকে সোজা চলে যায় নিজগিরিরডাঙায় এবং ঐ শালা কেরামতের বৌকে ডেকে নিয়ে শুয়ে পড়ে মোষের দিঘির পুবের ঢালে। কিন্তু শরীর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। শরীরের তাড়ায় নয়, মাথার গরমেই অতিষ্ঠ হয়ে তমিজ একবার মেলা থেকে বলতে গেলে রওয়ানা হয়েই গিয়েছিলো, কিন্তু তখন কাঠপট্টির বড়ো বড়ো খদ্দেরের নৌকায় খাট আর আলনা বেঞ্চি তোলা হচ্ছে, ফুর্তি টুর্তি শেষ, এখন তারা বাড়ি রওয়ানা হবে। তমিজকে তাই মেলাতেই থাকতে হলো। তা শেষ পর্যন্ত ছিলো বলেই তিন আনা কম তিন টাকা রোজগার তো হলো।
এতো রোজগারেও জান ভরে সুখ তার হয় না : এক বেশ্যামাগীর সামনে কেরামত তাকে এমন অপমান করলো। কুসুমনটির ধামার মতো বুক তাকে এতোটুকু উত্তাপ দেয় না; তার হাতপা জাড়ে কাঁপে। কেন?—মেলার শেষে নৌকায় একটা মস্ত খাট তুলে দিতে দিতে সে ঐ খাটের খরিদ্দারের চাপা গালি শোনে, শালা বেন্যার বাচ্চা, আজ তুই কার ঘরোত ঢুকিছিলু জানিস? কেরামতকে লিয়া গেছি গান শোনার জন্যে; তাই তুইও যাবু? কুসুম নটির ঘরত যায়া জান লিয়া বারায়া আসবার পারলু, তোর বাপের বরাত। কুসুমনটির ঘরে তমিজ ঠিক ঠাহর করতে পারে নি, এখন বোঝে, ঐ লোকটা হলো জোড়গাছার মফিজ সরকার। নৌকায় ওঠার সময় সরকারের সঙ্গে ছেলে ছিলো বলে লোকটা তমিজকে আর ঘটালো না। নইলে নিজের হাতেই আচ্ছাসে শিক্ষা দিয়ে দিতো।
তমিজের বাপের গায়ের শীত হঠাৎ করে দারুণ বাড়ে এবং তার প্রবল কাঁপুনি জ্বর ও ঘুম ফুড়ে তাকে খোঁচা দেয় এবং তাইতেই কি-না কে জানে ছটফট করতে করতে সে পাশ ফিরে শোয় এবং মুখ দিয়ে আ আ আওয়াজ করতে থাকে। তমিজ তখন হাত দেয়। বাপের কপালে, তার খসখসে দাড়িওয়ালা গালে এবং জানতে চায়, বাজান। তোমার ক্যাংকা ঠেকিচ্ছে গো? ও বাজান!
এরকম করে বাপকে সে কখনো ডেকেছে কি-না তার নিজের অন্তত জানা নাই। তমিজের বাপকে জিগ্যেস করলেও বেটার এরকম হামলে ডাকার কোনো নজির সে মনে করতে পারবে কি-না সন্দেহ। বেটার এমন অপরিচিত ডাকে সে সাড়া দেয় না। অথবা জ্বর চড়তে থাকায় সে ড়ুবে গিয়েছিলো অতল ঘুমের মধ্যে। বাপের কপাল আর দাড়িওয়ালা মুখ থেকে তমিজ নিজের হাত নিয়ে যায় কাঁথার ভেতরে এবং বাপের তপ্ত শরীরে ঐ হাত বুলিয়ে বুলিয়ে বেশ ওম পায়। বাপের গতরের গা-পোড়ানো তাপ তার একটু আগে পানি-ঘাটা হাত আর মফিজ সরকারের মুখে কলজে-ফুটো-হওয়া বুক থেকে বইতে থাকে সারা শরীর জুড়ে। হয়তো এই তাপেই মুছে যায় কেরামতশুদ্ধ কুসুমনটির ঘর। তমিজ শুয়ে পড়ে বাপের পাশে, তার কথার অনেকটাই তুলে নেয় নিজের শরীরে এবং বাপকে জড়িয়ে ধরে তার জ্বরের আঁচে গা পোহায়।
বাপের তাপের ওমে তমিজ ঘুমিয়েই পড়েছিলো হয়তো। উঠান থেকে ডাকলো কুলসুম, ভাত হছে।
কয়েকবার ডেকেও সাড়া না পেয়ে কুলসুম গজরাতে গজরাতে ঘরে আসে এবং বাপবেটাকে এমন জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকতে দেখে কিছুক্ষণ সেদিকেই তাকিয়ে। থাকে। কাঁথার কাছে মুখ নিয়ে কুলসুম জোরে জোরে নিশ্বাস নিয়ে কী ঠাহর করার চেষ্টা করে। কিসের গন্ধ সে পায় সে-ই জানে, তমিজের বাপের গায়ের তাপে তার নাক জ্বলছিলো কি-না তাই বা বলবে কে? তবে তার গন্ধ নেওয়ার তীব্র টানে ঘুম থেকে তন্দ্রায় উঠে আসে তমিজ। তন্দ্রার ঘোরেই তমিজ শোনে, কুলসুম আপন মনে গজর গজর করছে, এই মানুষটাক বলে ওংকা করা মারে? এই সাদাসিদা আবোর মানুষটাকও বলে খড়ম দিয়া মারে? বুড়া শকুন, মণ্ডলের হাতপাও খস্যা খস্যা পড়বি, বুড়া শকুন কুঠ হয়া মরবি, তামাম গাওত তার কুঠ হবি। শরাফত মণ্ডলের হাতপা জুড়ে কুষ্ঠ ছড়িয়ে ফেলার জন্যে অনির্দিষ্ট ও অপরিচিত কর্তৃপক্ষের কাছে সে বেশ কয়েকবার আবেদন জানায়। শেষে কুষ্ঠের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগ মণ্ডলের শাস্তির জন্যে যথেষ্ট বিবেচিত না হওয়ায় কোনো অপঘাতে সে তার আশু মরণ দাবি করে, তেরাত্তির যাবি না, তোমরা শোনো, এক রাতও লাগবি না, বুড়া আজই মরবি। তার কিসের জোতজমি, তার কিসের বিল, বুড়ার মাথাত ঠাঠা পড়বি। ঠাঠা পড়বি!
পাতলা তন্দ্রার ঘোর কাটতে থাকে তমিজের। কুলসুমের শাপমণ্যি তার কানে বাজে শোলোকের মতো। কুলসুমের অভিশাপে কেরামতের গানের তেজ, কেরামতের গানের ধার। চেরাগ আলির নাতনি, কিন্তু তার কথা তো চেরাগ আলির শোলোকের মতো নয়। . তা আর হবে কী করে? ফকির চেরাগ আলির গান তো তার নিজের বাঁধা শোলোক নয়। সেগুলো কে কবে বেঁধেছিলো, কোন দেও না দানব, কোন ফকির না সন্ন্যাসী, কোন জিন না ফেরেশতা, সেগুলো নাজেল হলো কোখেকে—সে খবর অন্যে পরে কা বাত, চেরাগ আলি নিজেও তো জানতো না। আর কেরামত গান বাঁধে নিজে। তার তেজ বলো আর রস বলো, হিংসা বলো আর দরদ বলো, হেলা করা বলো আর ইজ্জত করা বলো, সুখ বলো আর কষ্ট বলো,–শোলোকের সবই তো তার নিজের কথা। মণ্ডলের জুলুমের বিত্তান্ত কি কেরামতের কানে যায় না?
২৮. তমিজের বাপ, কথা কও না
তমিজের বাপ, কথা কও না? হাজেরানে মজলিশ পুস করে, জবাব দাও।–হাজেরান মজলিশ নামে কাউকে সনাক্ত করতে না পেরে বিচলিত হয়ে কিংবা অপরিচিত এই ব্যক্তির প্রশ্নের জবাব খুঁজতে কিংবা প্রশ্নটিকে ভালো করে বুঝতে কিংবা মাথা থেকে ঘুমের ময়লা কাটাতে চোখজোড়া বড়ো বড়ো করে তমিজের বাপ তাকিয়ে থাকে মাঝিপাড়ার জুম্মঘরের সিলিংবিহীন চালের জংধরা টিনের দিকে।
