বৃষ্টি ধরে আসছে। এতোক্ষণে আটকাপড়া লোকজন এখন কলরব করতে করতে হাট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। আন্ধকারে, ও গেদুর বাপ, বাজান, বাজান, রইস মামু, কেষ্টদা, ও কেষ্টদা রমেশ, জ্যাঠো, জ্যাঠো গো প্রভৃতি আহ্বান পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে চেরাগ আলি ও কুলসুম হঠাৎ করে যততটা তাড়াতাড়ি সম্ভব গপগপ করে খাওয়াটা সেরে ফেলে। তমিজের বাপ এসে ওঠে দোকানের বারান্দায়। দোকানদার তাকে দেখে বেশ খুশি, আরে হামি কই, তুমি বলে বাড়ি গেছে। পানি আসার আগেই তমিজেক দেখলাম ঘাটা ধরিছে। তুমি যাও নাই যে? সে কেন যায় নি তার কারণ না শুনেই তার দিকে একটা থলে এগিয়ে দিয়ে দোকানদার বলে, ইস্কুলের সামনে মোষ জবো করিছিলো, একটা ভাগ লিছি, সোয়া দুই সের গোশতো, গোশতোটা হামার ঘরত দিয়া কয়ো, আজ জাল দিয়া রাখবি, কাল ব্যায়না পাক করা লাগবি। আর হামি আজ আর বাড়িত যামু না। আফসার আজ আসবার পারবি না। বাদলার রাত, দোকান খালি রাখা যাবি না।
চটের থলে নিয়ে তমিজের বাপ বসে পড়লো মাদুরের ধার ঘেঁষে। হ্যারিকেনের আলো তার কালো মুখের ওপর যেন হালকা হলদে ধুলো মাখিয়ে দিয়েছে। হাই তুলতে তুলতে কুলসুম লোকটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, তার ঘুম পাচ্ছে, সে তাকিয়েই থাকে। কিন্তু এখানে শোয়া যাবে কি-না কে জানো?—তার চোখ এখন কিছুই দেখতে পাচ্ছে না, সে শুধু তাকিয়েই থাকে।-তমিজের বাপের বিকালবেলা ওই। ঝিমাননা চোখ অমনি রয়েছে, ঠোঁটজোড়া তার একইরকম ফাঁক-করা। তার চোখ আর তার ঠোঁটে একইরকম প্রশ্নবোধক চিহ্নের দাগ কাটা। হ্যারিকেনের আলোয় চোখের দুটো মণি থেকে আর ঠোঁটের ভেতরকার দাঁত ও জিভ থেকে সব রঙ যেন মুছে গেছে। মিনমিন করে লোকটা যখন বলে, আর গান হবি না? তখন ঝিমুতে ঝিমুতে কুলসুম দারুণ চমকে ওঠে, মানুষটা কথা বলতে পারে? তার চমকানিটা ভয়ে গড়াবার আগেই দোকানদারের ধমক শোনা যায়, তুমি পাগলা হছো চাচাঃ ফকিরের বাড়িত যাওয়া লাগবি না? কততখানি ঘাটা তা জানো? না কি তোমার বাড়িত আজ জেয়াফত দিচ্ছো? তমিজের বাপকে এইভাবে বকার ভঙ্গিতেই ফকিরের প্রতি দোকানদারের প্রশ্রয় বোঝা যায়। চেরাগ আলি মোটা ও একটু ঘ্যাসঘেষে গলাটা যতোটা পারে তরল করে, বাবা, হামাগোরে বাড়িঘর কিছু নাই। গায়ের কাছে দরগাশরিফ, হামাগোরে পরদাদার পরদাদারা ওই দরগাশরিফ হেফাজত করিছে, এখন ভিনো তরিকার মানুষ দখল করা ওটি হামাগোরে থাকবার দেয় না। হামার লাতনিক দেখায়া কয়, মেয়ামানুষ যখন তখন নাপাক হয়, ওটি থাকা হবি না। হামাগোরে থাকার জায়গা নাই বাপু। দোকানদার একটু নরম হয়েছে বুঝে সে বলেই চলে, এংকা ঘুরঘুটা আন্ধার, পানি পড়িচ্ছে, একটা বেটি ছেলেক লিয়া হামি ক্যাংকা করা ঘাটা ধরি বাবা?
হঠাৎ করে গলির ওপাশ থেকে লাফ দিয়ে এসে হাজির হয় বৈকুণ্ঠ। দোকানের চৌকাঠে পা দিয়ে হাত বাড়িয়ে গুড়ের মটকা থেকে একটু গুড় তুলে নিয়ে চেটে চেটে খায় আর বলে, আহারের পর মিষ্টিমুখ, ভুরিভোজের পরম সুখ। খাবার পর মিঠা না হলে চলে না। ধুতির খুঁটে পরিপাটি করে আঙুল মুছে মাদুরে বসে ফকিরের দোতারা হাতে নিয়ে সে টুংটাং করে। বড়োজোর দুই মিনিট, দোতারা বাজানো খান্ত দিয়ে বৈকুণ্ঠ হুকুম ছাড়ে, ফকির এটিই কাৎ হও। থাকো, কিন্তু গান শোনান লাগবি। এরপর দোকানদারকে বলে, কালাম মাঝি, ও মাঝিকাকা, চিড়ামুড়ি যা হয় ফকিরের বেটাক খিলাও। লাতনিক লিয়া কি উপাস করবি নাকি?
তোর অতোই দরদ তো কিন্যা লিয়া খিলা না। মানা করছে কেটা?
তোমার এক জাতের মানুষ, তোমরা খিলালে তিরিও লিয়া খাবি? হামরা দিলে কী খাবি?
দোকানদার কালাম মাঝির প্রতিক্রিয়ার তোয়াক্কা না করেই এবার সে চেরাগ আলিকে অনুরোধ করে, ফকির, ওই গানটা ধরো তো গো। ওই যে শিথানে পড়িয়া থাকে। আহা কি গান গো। আগে কতো শুনিছি।
তমিজের বাপ কিন্তু একেবারেই চুপচাপ। একইরকম ঘুমঘুম চোখে সে তাকিয়ে থাকে চেরাগ আলির দিকে, তার চোখ দেখে কুলসুমের গা ছমছম করে, লোকটা কি চোখ খুলে ঘুমায়, সে কি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দাদার মুখ দেখছে? কিন্তু ঘুমের জন্যে কুলসুমের ভয় দানা বাঁধতে পারে না, মাদুরের অন্যপ্রান্তে বসে মানুষটা কি তার চোখের ঘুম মাখিয়ে দিচ্ছে কুলসুমের চোখে? চেরাগ আলি গাইতে শুরু করলে কালাম মাঝি বলে, ও তমিজের বাপ, শুনলা, তুমি টোপ পাড়ো কিসক? বাড়িত যাও। লোকটা তবু বসেই থাকে। তার স্থির চোখ চেরাগের দিকে এমনভাবে সাঁটা যে ঘুমঘুম চোখে কুলসুমের মনে হয়, লোকটা যেন তার দাদাকে স্বপ্নে দেখছে। মানুষটা কেমন মানুষ গো?—এভোলা মানুষের সামনে বসে থেকে দিব্যি খোয়াব দেখে?–না-কি খোয়াব দেখছে কুলসুম নিজেই? তাই হবে।–নইলে দাদার গলায় লোহার শিকল ঝোলে কী করে? লোহার শিকল তো সে ছেড়েছে কয়েক বছর আগেই, দরগাশরিফের নতুন খাদেমদের হুকুমে। আর মাথায় কালো পাগড়ি আসে কোত্থেকে? কিন্তু কুলসুম স্বপ্নই যদি দেখবে তো দোকানদারের এই বৈকুণ্ঠ, এটি গান শুনিস? সাহা আসুক, তোক এক চোট দ্যাখাবি।—এই কথা স্পষ্ট শোনে কী করে? বৈকুণ্ঠ পরোয়া করে না, বাদ দাও কাকা। বাবুর বলে মরিচ লষ্ট হচ্ছে আধ মণের উপরে বাড়িত গেছে, এই জলের মধ্যে আর আসিচ্ছে। তবে সব ছাপিয়ে ওঠে চেরাগ আলির গান, সেটা কি স্বপ্নের ভেতরে?
