কুটি যাই? বিষ্টির মধ্যে কুটি যাই বাবু?
আরে বিষ্টি তো নামলো ক্যাবল। কামের সময় তোক পাওয়া যায় না। আন্ধার ঘুটঘুট করে, বাতি জ্বালাস না?
ত্যাল নাই বাবু।
হেরকিন লিয়া ত্যাল লিয়া আয়। যা।
বৈকুণ্ঠ সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়, পয়সা নাই বাবু।
টিমটিমে কুপির আলোয় কালো মোটা একটা লোক, বেশি মোটা বলে দৈর্ঘ অনুসারে তাকে বেটে মনে হয়, ঘরের কোণ থেকে দরজার কাছে এসে ফের একটুখানি ভতরে গিয়ে একটি গদিতে বসে ক্যাশবাক্স খুলে গুনে গুনে খুচরা পয়সা বার করে। বৈকুণ্ঠের হাতে পয়সা দেওয়ার সময় সে ফের গোনে। তারপর যে স্বরে হাঁকডাক করছিলো তা অপরিবির্তিত রেখেই বলে, মাঝির দোকানের আগের সাড়ে পাঁচ আনা। পয়সা শোধ করা বাকি পয়সার ক্যারাসিন ত্যাল আর একটা দিয়াশলাই লিয়া আয়। চেরাগ আলির দিকে নাকমুখ কুঁচকে তাকিয়ে বিরক্ত গলায় সে বলে, এখন ভিক্ষা : দেওয়া হয় না। যাও। আড়চোখে দরজা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে-থাকা চেরাগ আলি ও কুলসুমের দিকে তাকিয়ে ফের ভেতরে কার উদ্দেশ্যে আক্ষেপ করে, গোবিন্দবাবু জল যা হচ্ছে, বাড়িত চালের উপরে মরিচ শুকাবার দিয়া আসিছি, বুদ্ধি করা না তোলে তো সব লষ্ট।
বড়ো একটা হ্যারিকেন হাতে ঝুলিয়ে ঘর থেকে বেরুতে বেরুতে বৈকুণ্ঠ চেরাগ আলিকে ধমক দেয়, এখন দোকানে সন্ধ্যা, দেওয়া হবি, তোমার এটি থাকা চলবি
তার হাতের ইশারা পেয়ে বৈকুণ্ঠের পিছে পিছে বৃষ্টির মধ্যেই চেরাগ আলি চলে মুদির দোকানের দিকে, চেরাগ আলির আলখেল্লার কুল ধরে থাকে কুলসুম। এর মধ্যেই তার প্যাগনা শুরু হয় আবার, ও দাদা, জিলাপি খামু না? ও দাদা।
মাঝারি আকারের দোকান, তবে সামনে একটু বারান্দা মতো আছে। বারান্দার এক। ধারে একটা সেলায়ের মেশিন, মেশিনের পাশে মাদুর পাতা। বাঁ হাতের তর্জনিতে : বৈকুণ্ঠ তাদের মাদুর দেখিয়ে দিয়ে দোকানদারকে বলে, ও মাঝিকাকা, এই ফকির • আপনার এটি একটু বসুক। গান শুনবার পারবেন। হামাগোর আড়তেত এখন সন্ধ্যা দেওয়ার সময় বেজাতের মানুষ দেখলে বাবু কোদ্দ করবি।
ঘরের ভেতর হ্যারিকেন জ্বালাচ্ছিলো কালো ঢ্যাঙা একটা মানুষ, বৈকুণ্ঠের আবেদনে সাড়া না দিয়ে বলে, ত্যাল লুিব? খাড়া। ওটি খাক। বেজাতের মানষেক হামরাও ঘরোত ঢুকবার দেই না।
বৈকুণ্ঠ তার কথা গায়ে না মেখে বলে, ও কাকা, আজ কয় বস্তা তুললা গো? তথ্যটি না শুনেই চেরাগ আলিকে সে বলে, তোমার গলাটা খুব গমগমা গো। তোমার ওই সিথানে পড়িয়া থাকে গানটা আগে পোড়াদহের মেলাত খুব শুনিচ্ছিলাম। বসো, এটি বসো। ওই গান আজ শোনমো।
এর মধ্যে বৈকুণ্ঠের হ্যারিকেনে তেল ভরা হয়ে যায়, কেষ্টর হাত থেকে পয়সা গুনে নিয়ে দোকানদার বলে, কালকার সাড়ে পাঁচ আনা পয়সা আছিলো।
লিও। কাল লিও। বাবু কলো, মাঝিক কোস, পয়সা কয়টা আজ দিবার পারলাম রে।
হ্যারিকেন জ্বলে উঠলে দোকান ঘরটা ঝকঝক করে। মাঝারি দোকানটা মালপত্রে ঠাসা। একটা জলচৌকি জুড়ে কয়েকটা চালের বস্তা, ২/৩টা ডালের বস্তা, মৌমাছিতে ঢাকা গুড়ের মটকা, নুনের বারকোষ, মুড়ির টিন, চিড়ার টিন, নারকেল তেলের বড়ো বোতল এবং মেঝেতে রাখা কেরোসিন তেলের টিন। গাঢ় একটি গন্ধ ঘরে অদৃশ্য মশারির মতো ঝোলানো, ঘরের ভেতর নিশ্বাস নিলে নাকে তো বটেই, চোখেমুখে মাথায় সেই গন্ধ কুলসুমের মাথায় ঠেকে নিরেট বস্তুর মতো। কুলসুমকে এমন কি নিশ্বাসও নিতে হয় না, ঘন সেই গন্ধ তার মাথায় ঢুকে পড়ে ক্ষুধাতৃষ্ণাকে প্রথম দফায় নিকেশ করে দেয় এবং পলকের ভেতর পেটের মধ্যে তাই আবার জ্বালিয়ে তোলে দাউ দাউ করে। মাদুরে বসবে বি-না চেরাগ আলি ঠিক বুঝতে পারে না, বৈকুণ্ঠের বাবুর ক্রোধ আবার এই দোকানদারের শরীরেও ঢুকলো কি-না এই ভাবনায় বসতে তার হয়তো বাধোবাধো ঠেকছিলো। এমন সময় কুলসুম হাত বাড়ায়, জিলাপি দাও।
ঢ্যাঙা কালো দোকানদার বারান্দায় পা দিয়ে কারো দিকে না তাকিয়ে বলে, ধরো তো। চেরাগ আলি তার সঙ্গে সেলাই মেশিনের একটা দিক ধরলে দুইজনে মিলে সেটাকে ঢোকায় দোকানঘরের ভেতরে; ওটার জন্যে কেরোসিনের টিন দুটো আগেই তক্তপোষের পেছনে রাখা হয়েছিলো। এখন বারান্দার খালি জায়গার দিকে দোকানদার ইশারা করতেই চেরাগ বসে পড়ে। দোকানদার ধীরে সুস্থে দাঁড়িপাল্লায় এক পোয়া চিড়া ওজন করে কলাপাতায় সেই চিড়ে জড়িয়ে কুলসুমের দিকে এগিয়ে দেয়, বলে খা। ফের ঘুরে ঢুকে ওজন না করেই একটু আখের গুড় এনে চেরাগের হাতে দিয়ে বলে, গুড় দিয়া খাও। তারপর ঘরে তক্তপোষে নিজের আসনে আয়েশ করে বসে জিগ্যেস করে, ফকিরের বেটার বাড়ি কোটে গো?
চিঁড়া গুড় ও জিলেপির ভোজ খেতে খেতে চেরাগ আলি দোকানদারের এই নিরাসক্ত কৌতূহলের সুযোগ নেয়, টোক গিলতে গিলতে সে বলে, আমরা বাপু নদীভাঙা মানুষ। হামাগোরে আবার বাড়ি কিসের বাপ? এই লাতনিটা আছে, বাপ মরা, মা লিকা বসিছে যমুনার চরের মধ্যে, এখন এটাক হামার সাথে সাথে রাখি।
লোকটা বিরক্ত হয়, লদী ভাঙিছে তো কী? বাড়ি আছিলো না তো লদী ভাঙলো কি? বাড়ি নাই, তোমার মাও কি তোমার জর্ম দিছে ঘাটার মধ্যে?
চেরাগ আলি তার গ্রামের নাম বলে, সর্বনাশা নদীর করাল গ্রাসের বিস্তারিত বিবরণ দিতে শুরু করে, এমন সময় কাউকে আসতে দেখে দোকানদার কলরব করে ওঠে, আরে তমিজের বাপ চাচা, তুমি বাড়িত যাও নাই? শোনো শোনো কাম আছে গো আসো।
