পার্শ্বে বিবি নিন্দ পাড়ে, চান্দ জাগে বাঁশ ঝাড়ে। আবার এর মধ্যেই নদীতে চেরাগ আলির শয়ে শয়ে বিঘা জমি খাওয়ার মিছে কথাগুলো শুনতে একঘেয়ে লাগে। কিন্তু তাতে চেরাগ আলির মাথা দোলানো ও তমিজের বাপের খোয়াব-সাটা চোখ দেখায় ব্যাঘাত ঘটে না। এর মধ্যে কখন যে বৈকুণ্ঠ বলে, ও কাকা, তুমি না তোমার বাড়িত একটা মানুষ রাখার কথা কহিলা গো। অসিমুদ্দি মাঝি বলে তোমার বাঁশঝাড় লিয়া খুব ক্যাচাল করিচ্ছে। তা ফকিরকে জায়গা দাও না। তোমার বাঁশঝাড় দেখাও হবি আবার পরান ভরা গান শুনবার পারবা। বাঁশঝাড়ের শোঁ শো ঝাপটায় বৈকুণ্ঠের কথা হারিয়ে যায়। কুলসুমের বন্ধ চোখের পাতার নিচে চোখের মণিতে তখন একটা বাঁশঝাড়। বাঁশঝাড়ের ওপর সাদা চাঁদ। বাঁশঝাড়ের সবচেয়ে উঁচা বাঁশটার ওপর বসে চাঁদ একটু নড়াচড়া করে। পার্শ্বে বিবি নিন্দ পাড়ে, চাঁদ জাগে বাঁশঝাড়ে। তারপর, বাঁশ জাগে বাঁশঝাড়ে, একটা একটা ডিম পাড়ে। ঘুমের মধ্যে কুলসুমের এতোবার শোনা আর এতোবার গাওয়া গান এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। টিনের থালে পয়সা গুনে না মিললে মাথায় যে অস্থির চুলকানি শুরু হয়, প্রায় এই অস্বস্তিতে কুলসুম আঁ আঁ আওয়াজ করে। গান করতে করতে চেরাগ আলি ফকির তার মাথায় আস্তে করে হাত রাখলে সে নিরাপদ ঘুমের মধ্যে ঢলে পড়ে। কিন্তু ফের দেখে, হয়তো গান শুনতে শুনতেই দেখে, বাঁশঝাড়ে ডিম-পাড়া চাঁদের তলে ডিমের ভাঙা কুসুমে হলুদবরণ মাটিতে বুক চিতিয়ে হেঁটে চলেছে কালো পাগড়ি মাথায় এক দাড়িওয়ালা মানুষ, তার হাতে লোহার লাঠি, গলায় শিকল। বাঁশঝাড় পেরোলে মানুষটার সামনে ধূ ধূ বালির চর। সেখানে দাড়িয়ে রয়েছে উঁচালম্বা সাদা ধবধবে একটা ঘোড়া। ঘোড়ার সারাটা গা জুড়ে খালি তীর বেধানো। তীরের মুখে মুখে ঘামের বড়ো বড়ো ফোঁটার মতো রক্তের বিন্দু। লোকটা ঘোড়ার ওপর চড়ে বসতেই ঘোড়া ওই লোকটাকে নিয়ে তার গা ভরা তীর নিয়ে ছুটতে লাগলো। কুলসুম ফের গোঁ গোঁ করে। হায়, হায়, সামনেই যমুনা। যমুনার ভাঙনের আওয়াজ পাওয়া যায়। চেরাগ আলির দোতারায় সেই আওয়াজ থরথর করে কাঁপে। এই তীরঘেঁধা ঘোড়া মানুষটাকে নিয়ে এক্ষুনি পানিতে পড়ে কোথায় তলিয়ে যাবে, তার কোনো দিশা পাওয়া যাবে না। চেরাগ আলি ফের তার মাথায় ভালো করে হাত বুলিয়ে দিলে কুলসুম ড়ুবে যায় ঘুমের গভীর কাদার ভেতরে। কিন্তু এখন? তার মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে ঘুম পাড়াবে কে? কুলসুমের খোয়াব এখন টাঙানো হয়ে গেছে তমিজের বাপের মুখের সুড়ঙের ভেতরে। বাঁশঝাড়ের চিহ্ন পর্যন্ত নাই, অথচ তমিজের বাপের নাক ডাকায় শোনা যায় যমুনার ভাঙনের আওয়াজ। কুলসুমের শরীর কেমন শিরশির। করে, তমিজের বাপের ঠোঁটের ফাঁক থেকে নজর সরিয়ে সে উঠে বসে এবং তার ডান হাতটি রাখে তমিজের বাপের কপালে। এখনো অনেক জ্বর। এদিকে কুলসুমের শরীরের রক্তস্রোত শিরা উপশিরায় বইতে বইতে তার হাতের তালু পেরোবার সময় সুড়সুড়ি দেয় তমিজের বাপের কপালে। তপ্ত কপালে সে তখন শোলোকের স্পন্দন ঠাহর করে। ঘোরের ভেতর তমিজের বাপ শোনে,
মজনু হুঙ্কারে যতো মাদারি ফকির।
আন্ধার পাগড়িতে ঢাকো নিজ নিজ শিরা।।
সিনা টান রাখো আর আঁখির ভিতর।
সুরমা করিয়া মাখো সুরুজের করা।।
২৬. কুলসুমের হাতের তালুর স্পন্দনে
কুলসুমের হাতের তালুর স্পন্দনে চেরাগ আলির গলায় মুনসির শোলোকের ডাকে তমিজের বাপ চোখ মেলে। চোখ মেলতেই তার চোখ ফের খুঁজে যায়। নয়নের মাঝখানে সে দেখে, বাঙালি নদীর বোগা স্রোত ধরে তার নৌকা চলেছে পোড়াদহের দিকে। স্রোত রোগা হলে কী হয়, দেড় মণ ওজনের বাঘাড় মাছ আর দুই-দুইজন পুরুষমানুষশুদ্ধ নৌকাটিকে নিজের শরীরের ওপর নাচায় শালী নটিমাগীর মতো। স্রোতের দুলুনিতে ঘুম আরো গাঢ় হয়। নৌকায় একা জাগে তমিজের বাপ, আর জাগে। বৌডোবা দয়ের বাঘাড়। কী মস্ত বড়ো বাঘাড় গো! দুই মণের কম নয়। তমিজের বাপের দাদা বাঘাড় মাঝি নাকি তিন মণ বাঘাড় ধরেছিলো? তা হোক, দাদা তার একটু ওপরেই থাক। এই বাঘাড় কি দাদার মাছের নাতি? না-কি তারও বেটা? তা সেদিক থেকে বাঘাড় মাছটার সঙ্গে তমিজের বাপের একটা আত্মীয়তা তো আছেই। তমিজের এ বাপ ভালো করে মাছটার শরীর দেখে। তারার আলোয় তার গায়ের চখরখরা দাগ ঝাপসা হলদেটে দেখায়। বয়সের ছোপলাগা ছাই রঙের বাঘাড় মাছটার একটা চোখ স্থির হয়ে ছিলো তারার দিকে। তা বয়সের চাপেই হোক আর আত্মীয়তা থেকেই হোক, তমিজের বাপের কর্তৃত্ব সে মেনে নিয়েছিলো। কী জানি, বাঘাড় কেন এমন চুপচাপ হয়ে গেলো কে জানে? নৌকা বাওয়াই কি আর তমিজের বাপের নিজের কবজায় ছিলো? মনে হয় না।-পোড়াদহ মাঠের বটগাছের পাশ দিয়ে নৌকা যে কখন পার হয়ে গেলো সে বুঝতে পারলো না। পোড়াদহ মেলার বটতলায় তো তখন ঠাকুরের পূজা চলছে ধুমসে। সন্ন্যাসী ঠাকুরের পায়ের নিচে মানতের জোড়া জোড়া পায়রা বাঁধা অবস্থায় পড়তে শুরু করেছে, কতো দূর থেকে জটামাথা সন্ন্যাসীরা দলে দলে এসে বসে গেছে গাঁজার কলকে। হাতে। এসব কিছুই তার চোখে পড়লো না? কেন? নৌকার পাটাতনের এক কোণে চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমায় বুধা আর গোটা পাটাতন জুড়ে শুয়ে শুয়ে বাঘাড় কী ফন্দিই আঁটে যে, পোড়াদহ মেলার ঘাট তমিজের বাপের নজরেই পড়লো না? ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা প্রায় পোয়া ক্রোশ গেছে এই স্রোতের পাশে। সেই রাস্তা ধরে যমুনার পাঙাস, রুই, কাতল, আড় আর ছোটো বাঘাড়ের গোরুর গাড়ি রাতভর চলেছে ক্যাচকাঁচ করে; তমিজের বাপ দিশা পায় নি। গোরুর গাড়ির ক্যাচক্যাচ কাতরানি সুরে সুরে বাজিয়ে তুলছিলো ফকিরেরই কোনো শোলোক এবং তমিজের বাপ, বলা তো যায় না, বেসুরো ও হেঁড়ে গলায় নিজেও গলা ধরেছিলো তার সঙ্গে। বুধা শুনতে পেরেছিলো কি-না কে জানে, কিন্তু বাঘাড় মাছ নিশ্চয়ই সাড়া দিয়েছিলো। নইলে তার লেজ নাড়ানো পর্যন্ত থেমে গেলো কেন? আবার এমনো তো হতে পারে, বাঘাড়টাই তার ঠাণ্ডা রক্তের হিম ছুঁয়ে দিয়েছিলো তমিজের বাপের শরীরে আর তাইতে সে সব ভুলে এক নাগাড়ে খালি নৌকা বেয়েই গেলো, দুই পাশের কিছুই তার নজরে পড়লো না।
