তমিজ তার বাপের খবর পায় পোড়াদহের মেলায়। কামালপুর, আওলাকান্দি আর আমতলি থেকে ছুতাররা গোরুর গাড়ি করে কাঠের খাট, পালং, তক্তপোষ, আলনা, বেঞ্চি আর পিঁড়ি, জলচৌকি এসব আনতে শুরু করেছে মাঝরাত্রি থেকে। তমিজ তাদের। কামলা খাটবে বলে মেলায় বসে রয়েছে আরো আগে থেকে। সারাটা দিন ছুতারদের সঙ্গে থাকতে পারলে তাদের মাল নামিয়ে আর এইসব মালই খরিদ্দারদের গোরুর গাড়ি। কি নৌকায় উঠিয়ে ভালো কামাই করা যায়। দিনটা কিছুতেই নষ্ট করা যায় না। এখন মেলাতেই কার মুখে বাপের কীর্তির খবর পেয়ে সে এখানে এসেছে একরকম ছুটতে ছুটতে। শরাফত তখন মেলার দিনটা পার হোক, পরে দেখা যাবি বলতে বলতে চলে যাচ্ছে নিজের বাড়ির দিকে। পেছনে তার দুই ছেলে, নাতি, এ আত্মীয় সে আত্মীয়, কুটুম্ব, চাকরবাকর, কামলাপাট মেলা।
কাদায় পায়ের পাতা তখনো গাঁথা, তমিজের বাপ তাকিয়ে রয়েছে উত্তরের দিকে। তমিজ বাপের হাত ধরতেই তার নিজের এবড়োখেবড়া হাতের তালুতে বরফের ছোঁয়া পায়। মানুষের হাত এতো ঠাণ্ডা হয়? তমিজের শরীর কেঁপে ওঠে, বাপ তার বেঁচে আছে তো? সেই হিম হাত ধরে তমিজ বাপকে টেনে তোলে শুকনা ডাঙায়, তমিজের বাপের পা দুটো যেন কাদা থেকে উপড়ে তোলা হলো। ডাঙায় উঠে তমিজের বাপ তার দিকে একবার আর বৈকুণ্ঠের দিকে একবার তাকিয়ে দেখে। তার ঢুলুঢুলু চোখে কাঁচা রক্ত ছলছল করে। তমিজের বাপ হতে থাকল তমিজ বলে, বাজান, বাড়িত চলল।
তমিজের বাপ কোনোদিকে তাকায় না, সে যে কাউকে দেখছে কি কারো কথা শুনছে তা মনে হয় না। বৈকুণ্ঠ তমিজের কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে করে বলে তমিজ, কথা কস না! যাবার দে। হামরা মেলাত যাই। বৈকুণ্ঠের পা টলছে, তার মুখে গাঁজার গন্ধ।
তমিজের একটু তাড়াতাড়ি মেলায় যাওয়া দরকার। দেরি হলেই ছুতাররা অন্য কামলা লাগিয়ে দেবে। বৈকুণ্ঠকে নিয়ে তমিজ উঠে পড়লো কালাম মাঝির নৌকায়। নৌকার ভেতরে বাঘাড় মাছ তার বিশাল শরীরের গন্ধ দাগ ও চিহ্ন রেখে গেছে। বুধা অনেকক্ষণ তো কোনো কথাই বলতে পারে না, তার মুখ ফুটলো কালাহার পার হয়ে নৌকা বাঙালির রোগা স্রোতে ওঠার পর।
দুপুর পার করে দিয়ে বাড়ি ফিরে তমিজের বাপ দরজার চৌকাঠে মাথা রেখে সটান শুয়ে পড়ে ঘরের মেঝেতে।
কুলসুম বলে, ইগলান কী শুনিচ্ছি গো? তুমি বলে বিলের মাছ চুরি করবার গেছিলা? মণ্ডল বলে তোমাক খড়মের বাড়ি মারিছে? মণ্ডল তোমাক বান্দিছিলো? কুটি মারলো গো? মাথাত মারিছে? গাওত বলে পান্টি দিয়া কোন দিছে? ক্যা গো, কথা কও না? কথা কও না কিসক? ও তমিজের বাপ!
তমিজের বাপ তবু সাড়া দেয় না। তার নাক দিয়ে শোঁ শোঁ আওয়াজ বেরোয়। কিছুক্ষণের মধ্যে ওই আওয়াজের তেজ কমে; ওই নাকডাকার মিহি ও মোটা স্বরে সারা ঘরটিকে সে টেনে তোলে নিজের ঘুমের মধ্যে। হেঁটে হেঁটে। ঘুমের মধ্যে তো সে হাঁটেই। কিন্তু এখন এমন হি হি করে কাঁপে কেন? ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তমিজের বাপ হাঁটে, কথা কয়, বিড়িবিড় করে হয়তো শোলোকও বলে। কুলসুমকে জড়িয়ে ধরে সে ঘুমের মধ্যে, আবার তাকে ঠেলে দেয় ঘুমের মধ্যেই। কিন্তু কৈ ঘুমিয়ে পড়লে তমিজের বাপ তো কখনো এমন করে কাঁপে না। সে তো এখন শুধু কাঁপছে। কাঁপতে কাঁপতে তার সারা শরীর একেকবার কুঁকড়ে আসে, একেকবার ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে। তার মাথা গড়িয়ে পড়ে চৌকাঠ থেকে মাটিতে, আবার নিজে নিজেই মাথা উঠে যায় চৌকাঠের ওপর।
২৫. এখন মানুষটাকে নিয়ে কুলসুম করে কী
এখন মানুষটাকে নিয়ে কুলসুম করে কী? পাশে বসে স্বামীর কপালে হাত দিলে কুলসুমের হাতের তালুতে আগুনের ছ্যাক লাগে, জ্বরের দাপাদাপিতে তমিজের বাপের গা যেন পুড়ে যাচ্ছে। মানুষের গায়ে এতো তাপ? এই তাপে কুলসুম এক হাঁড়ি ধান সেদ্ধ করে ফেলতে পারে। তবে ধানের হাঁড়ির বদলে তমিজের বাপের ওপর সে চাপাতে থাকে তমিজের পুরনো পিরান, তার লুঙি, নিজের একটা ছেড়া শাড়ি, ঘরের সবগুলো। কাঁথা এবং এমন কি একটা ছেড়া জাল পর্যন্ত। তমিজের বাপের কাঁপুনি তবু যায় না। ভেতরের উঠান থেকে কুলসুম কয়েক বারে দুই হাত জড়িয়ে খড় এনে বিছিয়ে দেয় তার। ওপর। স্বামীর কাঁপুনি তবু না থামলে সে নিজেই শুয়ে পড়ে ওই শরীরের ওপর। তমিজের বাপ একটা গড়ান দিয়ে তাকে ফেলে দিলে তার আর কিছুই করার থাকে না। তবে দেখতে দেখতে কাঁপুনিটা থামে, কিন্তু জ্বর যেমন ছিলো তেমনি থাকে। মণ্ডলের হাতে মার খেয়ে তমিজের বাপ কি সারাটা সকাল—সারাটা দুপুর ঘুরে ঘুরে দুনিয়ার আগুন, আসমানের আগুন সব চুরি করে জমিয়ে নিয়ে এসেছে নিজের গতরের মধ্যে? তমিজের বাপের শরীরের নানা জায়গায় নাক লাগিয়েও কুলসুম তো কোনো গন্ধ পায় না। এই শরীরের চিরকালের বোটকা গন্ধ আর আঁশটে গন্ধ কি তাপে তাপে লোপ পেয়ে গেলো নাকি? এমন কি একটু ফাঁক-করা মুখে নাক লাগিয়ে জোরে নিশ্বাস টেনেও কুলসুম কোনোরকম গন্ধই তো পায় না। তার ভয় হয়, লোকটার পেট জুড়েও কি তবে আগুন জ্বলছে? নিজের নাক একটু তফাতে নিয়ে তমিজের বাপের সেই হাঁ-করা মুখ দেখতে দেখতে কুলসুমের মাথা ঝিমঝিম করে : এই মাঝারি আকারের হয়ে কেমন পুস-করা পুস-করা ঢং। কী যেন জানার জন্যে মুখটা সে ফাঁক করে রেখেছে। হাঁ-করা মুখে এমন প্রশ্নবোধক দাগ কুলসুম আগেও অনেকবার দেখেছে। কিন্তু এরকম অবাক হয়ে কিছু জিগ্যেস করা ঠোঁটের ফাঁক সে দেখলো কবে? কোনদিন? কোটে গো?
