সিথানে পড়িয়া থাকে কার্পাসের বালিস। হায়রে চেরাগ আলি গানের কলিটা এখানে ছেড়ে দিলে কুলসুম ধরে, শিতানে পড়িয়া থাকে কার্পাশের বালিশ। পাতলা চুলের নিচে কালো ও গোল মুখ, মুখের দাড়িও তেমন ঘন নয়, একটু এলোমেলো বটে, দাড়িগোঁফের ফাঁকে মোটা ঠোট হাঁ করে একটা মানুষ মাটিতে হাঁটু ভেঙে বসে গান, শোনে। তার মুখ সবসময়ই চেরাগ আলির দিকে। তার হাঁ-করা মুখের ফাঁকে সে যেন ফকিরের গানের ভেতরটা খাবার জন্যে ব্যাকুল।কত আগেকার কথা, এতোদিন আগে উজান যেতে অনেক বল লাগে। এখন কি আর সেই বয়স কুলসুমের আছে? তবে হয়তো তমিজের বাপের গায়ের প্রচণ্ড তাপে কুলসুম শক্তি পায়; তার বাহু থেকে কে জানে হয়তো ডানাই গজায় এবং এক উড়ালে সে পৌঁছে যায় যমুনার ভাঙনের দিনগুলিতে। হেঁড়াখোড়া বইটা দেখে আর মাটিতে চারকোণা চারকোণা রেখা এঁকে এঁকে চেরাগ আলির বাতানো মাদারিপাড়ার ফকিরগুষ্টির মানুষদের সব খোয়াবের ইশারা আর চেরাগ আলির নিজের মহা আত্মবিশ্বাস আর অকাট্য ভবিষ্যদ্বাণী ব্যর্থ করে শালার যমুনা নদী খেয়ে ফেললো গোটা গ্রামটাকেই। আকন্দদের জমিতে মাস দেড়েক মুখ গুঁজে থাকার পর তারা ঢুকে পড়লো দরগাতলার দরগাশরিফে। তা দরগা তো তখন কবজা করেছে ভিন্ন তরিকার খাদেমরা। ফকির যতোই হাম্বিতম্বি করুক, তারই পরদাদারা যে কোম্পানির সঙ্গে লড়াই করেছে দরগাশরিফে ওরস চালাবার নিয়ত নিয়ে, সেখান তারা টিকতে তো পারলো না। নিজের মাদারি তরিকার ইজ্জত রাখতে, না-কি নতুন খাদেমদের হুকুমমাফিক শরিয়ত মোতাবেক নামাজ রোজা করার ভয়ে,-কী শোলোক বলে বেড়াকুড়া খাবার লোভেই কি-না আল্লাই জানে, নাতনিকে নিয়ে সে সোজা রওয়ানা হয় পশ্চিমে। পুব এলাকাতেই সে থাকবে না, করতোয়া পেরিয়ে চলে যাবে সোজা মহাস্থান। সেখানেই ছিলো তাদের ফকিরদের আখড়া। মজনু শাহ তো আসল জেহাদটা চালিয়েছিলো সেখান থেকেই। অতোদূর যাওয়া কি অতোই সোজা? বাঙালি পার হওয়ার পর কয়েকটা গ্রাম পেরোলে দুইদিকে লোকজন কমে আসতে লাগলো। ভাদ্র মাসের দুপুর, ভ্যাপসা রোদে কুলসুম পায়ে আর বল পায় না। জুতমতো গান করার জায়গা না পেয়ে ফকিরও অস্থির হয়ে উঠেছিল। রাস্তায় যে কয়েকজন মানুষ পাওয়া। যায়, সবাই জমিতে হাঁটু পানিতে পাট ধোঁয়ায় ব্যস্ত। এদের কেউ কেউ ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের বড়ো সকড়ের ওপর বড়ো কোনো গাছের তলায় জিরিয়ে নেয়। ফকিরের হাতে দোতারা দেখে এদেরই কেউ বলে, ও ফকিরের বেটা, সামনে যাও, আজ গোলাবাড়ির হাট, মেলা মানুষ পাবা। এই আশ্বাসে দুজনেই পায়ে বল পায়, রাস্তার একটা মোড় পেরুলে একটু দূরে বেশ কিছু মানুষ দেখলে চেরাগ আলি প্রায় দৌড়ুতে শুরু করে।
গোলাবাড়ি হাটের এক পাশে প্রাইমারি স্কুলের সামনে টিউবওয়েল। টিনের থালা মাটিতে রেখে টিউবওয়েলের মোটা নলে মুখ রেখে এক হাতে পাম্প করে কুলসুম অনেকক্ষণ ধরে পানি খায়। টিউবওয়েলের নিচে কাদার সোঁদা গন্ধ বর্ষার তোড়ে অনেকটা পানসে। কিন্তু পানির লোহার গন্ধ ও স্বাদে তার খিদের প্রায় সবটাই মিটে যায়। ও পানি খাচ্ছে, আর এর মধ্যে হাটের মাঝখানে বটতলার মস্ত ইট-গাঁথা চাতালে লোহার লাঠি, দোতারা ও ঝোলাটা রেখে জায়গাটা দখল করে চেরাগ আলিও টিউবওয়েলের কাছে আসে।
বটতলায় লোকজন খুব বেশি নাই। হাট তখন জমে উঠেছে, সবাই হাটে কেনাবেচায় ব্যস্ত। বটতলায় দাড়িয়ে দোতারায় টুংটাং করতে করতে চেরাগ আলি গুনগুন করে, হায় রে শিথানে পড়িয়া থাকে কার্পাশের বালিশ। গানের এই কথাগুলিই সে বারবার বলে, আর মাঝে মাঝে তার সঙ্গে গলা মেলায় কুলসুম। বয়স তখন তার অল্প হলে কী হয়, তখুনি তার বুকের ওপর গামছা তুলে দিতে হয় বারবার। অল্প যে কয়েকজন মানুষ জুটেছে, চেরাগ আলির গানের সঙ্গে তাদের নজর সমানভাবে পড়ে কুলসুমের বুকের দিকে। একটিমাত্র মানুষকেই শুধু দেখা গেলো মাটিতে হাঁটু ভেঙে বসে। হাঁ করে তাকিয়ে রয়েছে চেরাগ আলির দিকে। একেকটা গানের পর চেরাগ আলি নতুন গান শুরু করার জন্যে দোতারায় টুংটাং তুললে কুলসুম তার টিনের থালাটা মেলে ধরে শ্রোতাদের সামনে। যার সামনেই থালা ধরে সে-ই অন্যমনস্ক হয় কিংবা চুপচাপ কেটে পড়ে হাটের ভেতর। কেবল এই মাটিতে বসা পাতলা চুল আর দাড়িওয়ালা লোকটি অন্যমনস্কতার ভাণ করে না, উঠে দাঁড়িয়ে সটকে পড়ে না, আবার পয়সাও সে দেয় না। সে ঠোট ফাঁক করে শুধু চেরাগ আলির রূপই দেখে আর গানই শোনে। কুলসুমের বয়েসি একটি ছেলে এসে লোকটির পাশে দাড়িয়ে বলে, বাজান, চলো। দেরি করলে মরিচের পুল পাওয়া যাবি না। ব্যামাক পুল খালি নেত্যা নেতা যাচ্ছে। মরিচের চারা রোদে নেতিয়ে পড়লে লোকটির কিছু এসে যায় বলে মনে হয় না। সে কেবল চেরাগ আলির দিকেই তাকিয়ে থাকে। হয়তো তার নীরব প্রশ্নের জবাব দিতে, কিংবা লোকজন জমতে দেখে কিংবা আরো লোক আকর্ষণের জন্যে চেরাগ আলি তার মুখের হাঁ মস্ত ফাঁক করে, কখনো বাকা করে, কখনো চোখজোড়া খুঁজে কখনো হাট করে খুলে গেয়েই চলে,
পার্শ্বে বিবি নিন্দে মগন চান্দ কোলে জাগে গগন
খোয়াবে কান্দিল বেটা না রাখে হদিস।
হায়রে একেলা পড়িয়া থাকে শিথানের বালিশ।
মুখ বাঁকাচোরা করে সে গাইছে, এমন সময় ওই ঠোট ফাঁক করে শুনতে-থাকা লোকটির পাশে দাঁড়ানে কালো ছোঁড়াটা খিলখিল করে হাসে, এতোই জোরে হাসে যে, লোকজন তার দিকে একবার করে তাকায়।
