শরাফত মণ্ডলের সাটাসাটিতে বুধার ঘুম কেটে যায় এবং ওই সাটাসাটির জন্যেই তার পক্ষে মাথা ঠিক রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তার শুধু আবছা মনে পড়ে, দুইজনে মিলে ধরাধরি করে মাছটা নৌকায় তোলা হয়েছিলো, হাপসে গিয়ে সে শুয়ে পড়ে নৌকার পাটাতনের ওপর। বাঘাড় কি তার পাশে ছিলো, না নৌকার খোলের ভেতর। ওটাকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিলো, সেটা সে মনে করতে পারে না। এখন হঠাৎ দিশাহারা হয়ে বুধা জিগ্যেস করে, বাঘাড় কুটি?
এই শালা কুত্তার বাচ্চা, আরেক চোর। চোরের গোলাম চোর। বান্দো শালাক। বলতে বলতে বুধার মাথায় ও ঘাড়ে শরাফত তার খড়ম-ধরা হাতটা তুলতেই কাদের খোয়াবনামা বাপকে সামলায়, রাখেন। বাড়ি ভরা মানুষ। আজ মেলার দিন। কী করেন?
হাত সামলে শরাফত আগের কথারই পুনরাবৃত্তি করে, তমিজের বাপের বিলের মাছ চুরি করার কথা সে বলে আসছে অনেক দিন থেকেই। তার দুর্ভাগ্য, তার কথায় কেউ কান দেয় না। রোজ রাত করে শালা যে ঘাড়ে একটা জাল নিয়ে এখানে আসে, সে কি এমনি এমনি? পাকা চোর, এতোদিন ধরা পড়ে নি। আজ পোড়াদহের মেলা, পাকুড়গাছ থেকে মুনসি নিজের চোখজোড়া আজ মজুত রেখেছে গোটা বিলের ওপর, এই বিলের কোনো অনিষ্ট করতে গেলে সে শালা আজ ধরা না পড়ে যায় না।
একটু আলো ফুটলে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে হাজির হয় বৈকুণ্ঠ। মাঝরাত থেকে মোষের দিঘির উঁচু পাড়ে তালতলায় দাঁড়িয়ে সে নজর রাখছিলো পাকুড়তলার পশ্চিমে সন্ন্যাসীর ভিটার ওপর। মঙ্গলবার দ্বিপ্রহরের পর বারবেলায় ভবানী ঠাকুর এসে আসন গ্রহণ করবে পোড়াদহ মাঠের বটতলায় তার বিগ্রহের মধ্যে। তখন থেকে সন্ন্যাসীর পূজা। রাত্রি দুই প্রহর কাল পর্যন্ত সন্ন্যাসী পূজার ভোগ নেবে, তারপর কৈলাসধামে। প্রত্যাবর্তন কালে মোষের দিঘির পাশ দিয়ে গিয়ে পাকুড়গাছের দিকে কয়েক পলক নজর দিয়ে ঠিক ব্রাহ্মমূহর্তে পৌঁছে যাবে নিজের ভিটার ওপর। সূর্যঠাকুর পুব আকাশ জুড়ে সিঁদুরের ছোপ লাগানো শুরু করবে আর সন্ন্যাসীও মিলিয়ে যাবে আলোর মধ্যে আলো হয়ে। নিজের শিষ্যসঙ্গীদের বংশধর, অন্তত দশনামীদের কাউকে না দেখলে ঠাকুর কষ্ট পাবে জেনেই তো বৈকুণ্ঠ তার ঠাকুরদার সৎ ভাইদের ছেলেদের প্রতারণা মেনে নিয়ে বিঘা বিঘা জোতজমি জ্যাঠতুতো খুড়তুতো ভাইদের ভোগ করতে দিয়ে নিজে পড়ে রয়েছে এখানে। এই রাতে কি তার ঘুমিয়ে থাকলে চলে? তা বছরের পর বছর এই রাত চলে যায়, সন্ন্যাসীর খাড়া-ধরা ছায়া দেখতে পায় না সে। আজ তার ভাবনা হয়, এসব কিসের লক্ষণ? তার নিজের কোনো দোষ হলো না তো? নিজের কী দোষ ঘটতে পারে খুঁজতে খুঁজতে বৈকুণ্ঠ দেখে, বাঙালির পথহারা রোগা স্রোত ধরে একটা নৌকা উত্তর দিক থেকে ঢুকে পড়লো কাৎলাহার বিলের ভেতর। বৈকুণ্ঠের বুক দুরুদুরু কাঁপে : প্রভু কি তবে এবার নৌবিহারে ফিরে যাচ্ছেন? কিন্তু নৌকা তো যাচ্ছে দক্ষিণে, তবে নিজের ভিটায প্রভু উঠবেন কী করে? —বৈকুণ্ঠ ধন্দে পড়ে। তবে সে হলো গিরির সন্তান, টাসকা মেরে বসে থাকলে তার চলবে? প্রভুর প্রতি দায়িত্বপালনের তাগিদে পাকুড়তলা ঘুরে বিলের পশ্চিম তীর ধরে সে ছুটতে লাগলো দক্ষিণের দিকে। যাবার সময় হুরমতুল্লার ঘরের সামনে একটা হাঁক দিয়ে যায়।
কিন্তু মণ্ডলবাড়ির ঘাটে এসে দেখে ঘটনা তো একেবারে অন্যরকম। তমিজের। বাপের মতো মানুষ কি এটা কখনো করতে পারে? তবে জিমের বাপের আচরণের। রহস্য ভেদ করা এদের মতো যে-সে জাতের মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কোন ইশারায়, কার ইঙ্গিতে তমিজের বাপ এখানে এসেছে তা বলতে পারতো এক চেরাগ আলি ফকির। তা ফকিরই নাই, এখন আর কে কী বলবে?
বৈকুণ্ঠের হাঁকে হুরমতুল্লা এসেছে বটে, কিন্তু মণ্ডলের কথা সে বিশ্বাস করে কী করে? আবার মণ্ডল কি কখনো অন্যায্য কথা বলতে পারে? তমিজের বাপটাও একবারে চুপ, সে যে কী করলো না করলো তাই বা বোঝে কীভাবে? হুরমুতল্লা উসখুস করে, মেলার দিকে তার মেলা করা দরকার এখনি। মেলায় বেচবে বলে কাল তেলিহারা হাট থেকে কেশুরের বিচি আর মুলার বিচি কিনে এনেছে। নবিতন গোটা বিশেক পাটের শিকা বুনে রেখেছে, খুব নকশা করা শিকা। দাম মনে হয় ভালোই উঠবে। অন্তত ভদ্দরলোকরা তো পছন্দ করবেই। সকাল সকাল মেলায় যেতে না পারলে জুতসই জায়গা পাওয়া মুশকিল।
নেহায়েত মেলার দিন। শরাফত মণ্ডলের বাড়িতে নাইওর ভরা। আবার মেলা দেখতে টাউন থেকে কাদেরের দলের ছেলেরা আসবে, নেতাদের কেউ কেউ থাকতে পারে। তাদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। এতোসব ঝামেলা না থাকলে এই শালা তমিজের বাপকে হাতপা বেঁধে গোরুর গাড়িতে চালান করে দিতো আমতলি থানায়। জেলের ঘানি টেনে শালার জীবন কাটতো।
এর মধ্যে ঝামেলায় ফেলে শরাফতের বড়ো ছেলেটা। সূর্য উঠলে টর্চের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেলে তিন ব্যাটারির দামি জিনিসটা রেখে আসতে সে একবার ঘুরে আসে বাড়ির ভেতর থেকে। এবার টর্চের বদলে তার হাতে ধরা তার ছেলের হাত। আজিজ বাপকে একটু তফাতে ডেকে এনে বলে, বাপজান, ওই মানুষটাক না ঘটানোই ভালো। কী কী নাকি জানে।
তমিজের বাপকে শীতে কিংবা ভয়ে কিংবা অন্য কোনো কারণে কাঁপতে দেখে এবং শরাফতের এক পায়ের খড়ম তার হাতে ওঠায় বাবর তার বাবার কোমর জড়িয়ে ধরে। কেঁদে ফেলে। এতো বড়ো ছেলেকে কাঁদতে দেখে শরাফতের রাগ হয়। তার নিজের। ছেলে ও নাতি কি তার ইজ্জতের দিকে একটু দেখবে না? আজিজটা পুরোপুরি বৌয়ের বশ হয়ে গেছে। টর্চলাইট রাখতে বাড়ির ভেতরে গেলে বৌয়ের কাছ থেকে সে বোধহয় হুকুম নিয়ে এসেছে এখন শরাফতকে সে তমিজের বাপের হাজাধরা পা দুটো দুধ দিয়ে ধুয়ে দিতে না বলে! হুমায়ুন মরার আগে বৌটা স্বপ্নে হাবিজাবি কীসব দেখলো, তখন থেকে তমিজের বাপের ভয়ে সবসময় কাতর। দুই বেটা এবং একমাত্র নাতির আচরণে শরাফত ক্ষোভে দুঃখে অপমানে নেতিয়ে পড়ে, তমিজের বাপের ওপর রাগটাকে সে আর শানাতে পারে না।
