তবু কেবল তমিজের কথা শুনেই যুধিষ্ঠির সভায় এসেছিলো। স্বয়ং নায়েববাবুকে খান বাহাদুরের গাড়িতে উঠতে দেখে তার ভয়ও একটু কেটেছে। তেভাগার গানে তো সে রীতিমতো শিহরিত। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তেভাগা হবে মোসলমানদের জন্যে। পাকিস্তান হলে তবে তার খালি লোকসান। জাতও যাবে, তেভাগার ফসলও তার জুটবে না। তবে জগদীশ সাহা সেদিন বললো, পাকিস্তান টাকিস্তান কিছু নয়, সব ভাক্কাবাজি। মহাত্মাজী একটু শক্ত হলে মুসলমানরা কোথায় উড়ে যেতো! মুসলমানদের মধ্যে মাথা আছে নাকি? ছছাটো জাত টাকা করলেই আর মন্ত্রী হলেই ভদ্দরলোক হতে পারে নাকি?
যুধিষ্ঠিরের মাথাটা বড়ো এলোমেলো ঠেকে। তমিজের সঙ্গে তার এতো খাতির কিন্তু তেভাগার আশায় তমিজ যেমন লাফাচ্ছে সে তো তেমন পারছে না। আলিম মাস্টার তার পাশে এসে বলে, আ র দেশে একটা আইন হলে গেলির জন্যেই হবি। জয়পুরে কী হচ্ছে, খবর রাখো? কেরামতের গান ভালো করা বোঝে। বুঝলা? ভালো করা বোঝে।
তা যুধিষ্ঠির হলো কর্মকারের বেটা। বাবুদের পায়ের তলায় পড়ে থাকে। শরাফত মণ্ডলের জমি বর্গা করলো, সেখানেও সুবিধা করতে পারলো না। গানের রহস্য ভেদ করা কী তার মাথায় কুলায়?
২৪. কালাম মাঝির নৌকা
কালাম মাঝির নৌকা ও ছোটো শালাকে নিয়ে যমুনায় গিয়ে তমিজের বাপ সুবিধা করতে পারলো না। যমুনার মানুষ বিলের মাঝিদের মোটে গ্রাহ্য করে না, এমন কি আকালের সময় গিরিরডাঙা থেকে উঠে-যাওয়া মাঝিরাও যমুনার মাঝিদের সঙ্গে কুটুম্বিতা করার আশায় নিজেদের পুরোনো আত্মীয়স্বজনকে একটু এড়িয়েই চলে। সাড়ে পাঁচশো ছয়শো হাত একেকটা বেড়জালে যমুনার যতোটা পারে তারা দখল করেছে। সেখানে কালাম মাঝির ফেলে-দেওয়া ও নিজের ভেঁড়াখোড়া জালের টুকরা টাকরা জোড়া দিয়ে লম্বা-করা বাহাত্তর হাত জাল খাটাবার মতো পানি না জুটলে তমিজের বাপ কী আর করে, জাল গুটিয়ে নৌকা বেয়ে চলে আসে বাঙালি নদীর বৌছোবা দয়ের বাকে। ১৫/২০ হাতি গভীর এই দয়ে নিজের চোখের জল গচ্ছিত রেখে মানাসের শুকনা খাটাল ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সড়ক পর্যন্ত গিয়ে হারিয়েই গিয়েছিলো। অনেক পরে যমুনার উপচেপড়া পানি বয়ে বাঙালি নদী পুব থেকে এসে এ খাটাল ধরে কয়েক মাইল ছুটে বেরিয়ে যায় দক্ষিণের দিকে, আর তার পথভোলা রোগ একটি স্রোত পোড়াদহের মাঠ ছুঁয়ে কাশবনের ভেতর দিয়ে ঢুকে পড়ে কাৎলাহার বিলে।
তমিজের বাপ বাঙালির কোলে মরা মানাসের বৌডোবা দয়ের ধার ঘেঁষে জাল খাটালো। কতোকাল আগে গোরা সেপাইদের হাতে ভবানী সন্ন্যাসী মারা পড়েছিলো এ। দয়ের জায়গাতেই। সবাই জানে সন্ন্যাসীর শোকে মানাস শুকিয়ে গেলো, কিন্তু তার মড়া লুকিয়ে রাখতে ফেলে গেলো তার চোখের জল, দয়ের পানি তাই বারো মাস এমনিই থাকে। যমুনার মাছ, বাঙালির মাছ, এমন কি মানাসের সেই আমলের মাছের। বংশধর তারাও এখানে এসে ভবানীকে পাহারা দিয়ে কিংবা তার খোরাক হয়ে নিজেদের মীনজীবন সার্থক করে। তমিজের বাপের কপালের ফের, সে নৌকা ভেড়ালো ওখানটাতেই। সেই সন্ধ্যায় জাল খাটাবার পর কোমর পানিতে দাড়িয়ে তমিজের বাপ বিড়বিড় করে কী সব শোলোক বলতে লাগলো; তার স্বর ক্রমে নিচু হয়ে আসছিলো দেখে কালাম মাঝির ভাগ্নে বুধা ভয় পায়, তমিজের বাপ কি ঘুমিয়ে পড়লো নাকি? তারপর, বিশ্বাস করা মুশকিল, রাত এক পহরও যায় নি, সন্ধ্যাতারা আসমানের মাঝামাঝিও চড়ে নি, বাঘাড় মাছটা ঠিক মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়া শিশুর মতো মাথা গুঁজে দিলো তমিজের বাপের জালের মধ্যে। এক মণ সোয়া মণ ওজনের সেই বাঘাড় নৌকায় তুলতে দুইজনের জান বেরিয়ে যাবার দশা। ছোটো নৌকা; অতো বড়ো বাঘাড়ের ঝাপটায় একবার এ কাত হয়, একবার ও কাত হয়। অতো বড়ো মাছ পেয়ে বুধা হাত নাড়ে, পা নাড়ে, কোমর দোলায়, মাথা ঝাকায়, তবু তার খুশির দুই আনাও সে খালাশ করতে পারে না। ও নানা, দুই মণ আড়াই মণের কম হবি না গো। এই মাছের বয়েস মনে হয় পাঁচশো বছর? আরো বেশি? ও নানা, এই মাছের দাম হবি কতো? এই মাছ দেখ্যা মেলার ব্যামাক মানুষ টাসকা ম্যারা যাবি? হামি কলাম, দেখো, সারা মেলার মানুষ ভ্যাঙা পড়বি তোমার উপরে। বারবার কথা বলে এবং এতো বড়ো বাঘাড় ধরার খুশিতে এবং এতো বড়ো মাছ নৌকোয় তোলার খাটনিতে বুধার ঘুম পায়। শোলোক পড়তে পড়তে তমিজের বাপ মাছের সর্বাঙ্গে হাত বুলিয়ে দিলে তার দাপাদাপি থামে, কিন্তু বড়োলোকের পা নাচাবার তালে তার লেজ নাড়ানো চলতেই থাকে, তাতে নৌকাটা দুলে দুলে ওঠে। দুলুনিতে বুধার ঘুম নামে চোখ ঝেঁপে।
সারা রাত ধরে নৌকা চলেছে, বুধা কিচ্ছু জানে না। ভোররাতে, তখনো আবছা আন্ধার, কোলাহল শুনে ঘুম ভেঙে গেলে বুধা দেখে, নাও ঠেকে রয়েছে কালাহার বিলের দক্ষিণ কোণে। তীরে কাদার ভেতর উত্তর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তমিজের বাপ। তার মাথার ওপর ঘুরে ঘুরে উড়ছে মণ্ডলবাড়ির শিমুলগাছের সাদা বকের ঝক। নৌকার দিকে তাকালে বুধার চোখে পড়ে, ভেতরটা শূন্য। বাঘাড় মাছ নাই। তমিজের বাপের ধার ঘেঁষে শুকনা ডাঙায় দাঁড়িয়ে রয়েছে শরাফত মণ্ডল। তার এক হাতে লণ্ঠন, অন্য হাতে বোলওয়ালা কাঠের খড়ম। আবদুল আজিজ টর্চ দিয়ে আলো ফেলছে তমিজের বাপের মুখের ওপর, মাঝে মাঝে সেটা চক্কর দিয়ে ঘুরছে বিলের অনেকটা জায়গা জুড়ে।
তার নিয়মের বাইরে শরাফত মণ্ডল একই কথা চোদ্দবার করে বলছে। কী?–না, পোড়াদহ মেলা দেখতে-আসা তার ঝি-জামাই, ভাস্তি-ভাস্তিজামাই, ভাগ্নী-ভাগ্নীজামাই এবং তাদের ছেলেমেয়েতে বাড়ি ভরা বলে তাকে শুতে হয়েছে খানকাঘরে। বিছানা বদল হওয়ায় রাতে সে ভালো করে ঘুমাতে পারে নি। ফজরের আজানের আগেই অজু করতে ঘরের বারান্দায় এলে তার চোখ পড়ে বিলের দিকে। দেখে, এক শালা মাছচোর জাল থেকে মস্ত একটা মাছ তুললো বিল থেকে। মণ্ডল কোন শালা রে? বলে জোরে হাঁক দিতেই অতো বড়ো মাছটা ফেলে দিলো বিলের পানিতে। মণ্ডল তখুনি বুঝেছে, এ শালা তমিজের বাপ ছাড়া আর কেউ নয়। লণ্ঠন নিয়ে কাছে এসে দেখে, ঠিক তাই। অনেক পয়সা খরচ করে, নায়েববাবুকে হাতে পায়ে ধরে এই বিল পত্তন নিয়েছে শরাফত; সে কি পাঁচ ভূতে মাছ মেরে নিয়ে যাবে বরল? সে আর কতো সহ্য করে?
