তার আবেদনে ভ্রক্ষেপ না করে ইসমাইল প্রায় ধমক দেয় শ্রোতাদের, খামোশ। আমার কথা শুনুন। খালি গান শুনলে কাজ হবে না। মানুষ কাজও করে, গানও শোনে। রোজগারের জন্যে আপনারা দিনরাত খাটেন, হয়রান হয়ে গান শুনে, গান গেয়ে, গল্প করে ক্লান্তি দূর করেন। দিনরাত ফুর্তি করে বেড়ালে জমিতে ফসল ফলাতে পারবেন?
শেষ প্রশ্নটির জবাব শুনতে সে কয়েক পলক অপেক্ষা করে। কেউ কিছু বলে না, তবে সবাই চুপ করে। ইসমাইল বলে, কাজের ফাঁকে ফাঁকে গান হলে মনটা ভালো। থাকে। এবার জরুরি কথা বলি, পরে আবার গান শুনবেন।
শ্রোতারা এবার একেবারেই চুপ করে যায়। ইসমাইল বেশ ধীরে সুস্থে, কখনো চড়া গলায় আবার কখনো নিচু স্বরে ঘণ্টাখানেক ধরে বক্তৃতা করে। কেরামতের গানের সঙ্গে তার কথার কোথাও কোথাও সামঞ্জস্য আছে বুঝে শ্রোতাদের আগ্রহ বাড়ে। ইসমাইল বলে, মুসলিম লীগ জমিদারদের সংগঠন নয়, বাঙলার মুসলমানদের মধ্যে জমিদার আর কয়জন? যে কয়জন জমিদার জোতদার এই প্রতিষ্ঠানে আছে, দলের আদর্শ মেনে নিয়েই তারা দলে যোগ দিয়েছে। মুসলিম লীগের নীতির সঙ্গে মীরজাফরি করলে মুসলিম লীগ বিনা দ্বিধায় দল থেকে তাদের বহিষ্কার করবে। একটু থেমে শ্রোতাদের নিরঙ্কুশ মনোযোগ তৈরী করে সে জানায়, দরকার হলে আমাদের জেলার নেতা জেলা মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট খান বাহাদুর সৈয়দ আলি আহমদকেও আমরা দল থেকে বহিষ্কার করবো।
এই কথায় শ্রোতারা স্তম্ভিত। মুহূর্তের মধ্যে তাদের বিস্ময় পরিণত হয় উত্তেজনা ও পুলকে এবং সভায় খুব হাততালি পড়তে থাকে। এমন কি, খান বাহাদুরের বিনয়ে একটু আগে অভিভূত হওয়ায় যাদের চোখ ছলছল করছিলো, তারা পর্যন্ত দ্বিতীয়বার ঠাণ্ডা লাগানোর ঝুঁকি নিয়ে কাঁথা থেকে দুই হাত বার করে হাততালি দিতে থাকে।।
সভাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে ইসমাইল ডান হাত তুলে শ্রোতাদের হাততালি বন্ধ করার ইঙ্গিত দেয়। তারপর সম্পূর্ণ নীরবতার মধ্যে বলে, আজ দেশের কোথাও কোথাও কৃষকদের মধ্যে যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে তার সঙ্গত কারণ আছে। এর সমাধান সম্ভব কেবল পাকিস্তানেই, সেখানে কৃষকের পক্ষে আইন তৈরী করতে বাধা দেওয়ার অধিকার কারো থাকবে না। এখন দেখতে হবে, কৃষকরা আজ যাদের নেতৃত্বে সংঘাতে নেমেছে তার কোন জাতির মানুষ। হিন্দু জমিদাররাই তো কৃষকদের শোষণ করে আসছে বৃটিশ শাসনের শুরু থেকে। পলাশির আম্রকুঞ্জে নবাব সিরাজুদ্দৌলার পতনের পর থেকে ব্রিটিশের পায়রাবি করে তারাই তো মুসলমানদের অর্থসম্পদ, মানইজ্জত নিয়ে বাঁচার পাথে বাধা দিয়ে আসছে। মুসলমান কৃষককে সংঘাতের পথে ঠেলে দিয়ে তারা বিভেদ সৃষ্টি করছে মুসলমানদের মধ্যে। এতে স্বার্থ হাসিল হচ্ছে কার? রক্তপাতের পথে না গিয়ে মুসলমান কৃষক যদি পাকিস্তান আন্দোলনে সামিল হয় এবং পাকিস্তান যদি তারা কায়েম করতে পারে, তবে তাদের সমস্যার সমাধান হতে বাধ্য।
নানারকম দৃষ্টান্ত দিয়ে ইসমাইল তার লম্বা বক্তৃতা শেষ করলে কাদেরের নেতৃত্বে একটার পর একটা স্লোগান উঠতে থাকে। এমন কি এই স্লোগানে শরিক হয় কেরামত আলিও।
মঞ্চ থেকে নামতে নামতে সাদেক উকিল ইসমাইলের কানে কানে বলে, মিটিং তো ভালোই হলো। কিন্তু মুসলিম লীগের সভায় তেভাগার গান কেমন শোনায়?
ইসমাইল নিজের সাফল্যে গলা একটু উঁচু করে, আজ তেভাগার গান করলো। কালই আবার এই লোকটাই পাকিস্তানের গান লিখুবে। আপনি এটাও পারবেন না, ওটাও পারবেন না।
কেরামত হেঁটে যাচ্ছিলো আলিম মাস্টারের সঙ্গে, তার পাশে বৈকুণ্ঠ। যুধিষ্ঠির কর্মকার কোত্থেকে এসে তাদের পিছু নেয়। সুযোগ বুঝে আস্তে করে জিগ্যেস করে, গানের মধ্যে তেভাগার কথা কওয়া হলো, তেভাগা কি হবি?
কেরামতের হয়ে জবাব দেয় বৈকুণ্ঠ, গানের রহস্য বোঝা সহজ লয় বাপু। ফকিরে গান করিছে, একোটা গান হামরা কতোবার করা শুনিছি। উগলান গান এটিকার মানুষ জানে কোনদিন থ্যাকা! তো তার রহস্য বোঝে কয়জনা? আর কেরামতের গান, লতুন গান, একবার শুনলা আর বুঝবার পারলা, অতোই সোজা?
কেরামতের গান আবার তমিজের মাথাতেও কাঁটা বিঁধিয়ে দিয়েছে। খিয়ার এলাকায় তেভাগার কাণ্ড তো সে নিজেও দেখে এসেছে। গানের কথা বাদ দাও। গানে কতো কথা থাকে, উগলান সব ধরলে চলে? বলতে বলতে তমিজ কেরামতের দিকে তাকায় আড়চোখে, তাকে একটু ঘায়েল করা গেছে ভেবে খুশিতে তার বুকের বল বাড়ে, খিয়ারেতে হামি লিজে দেখিছি। জোতদার শালা আধিয়ারের ধাবাড় খায়া গোয়ার কাপড় তুল্যা কুটি পালাবি দিশা পায় নাই।
তমিজের কথায় সবাই হাসে। জোতদারের ন্যাংটা হওয়াটা এদের অতিরিক্ত হাসির কারণ হতে পারে; আবার সভায় শোনা ভালো ভালো কথার চাপ থেকে খালাশ পেয়েও সবাই হাসতে পারে। এতো মানুষকে হাসাবার কৃতিত্বে খুশি হয়ে তমিজ কেরামতের ওপর রাগ সবটাই ঝেড়ে ফেলে। তাকেও সে খুশি করতে চায়, তোমার গান আজ খুব জমিছিলো গো। জয়পুরে বর্মণী মায়ের কথা আমিও শুনিছি। কেরামতের গানে তমিজ অভিভূত। সে বারবার তাকায় কাদেরের এক কর্মীর দিকে। ছাত্র কর্মীটি কিন্তু হাসে না, ইসমাইলের বক্তৃতার রেশ ধরে বলে, মারামারির কথা বলে খালি বিভেদ সৃষ্টি। মুসলমানদের মধ্যে ডিভিশন হলে লাভ হবে হিন্দুদের। তেভাগা তো পাকিস্তানে। এমনিতেই হবে।
তা তো হবে। কিন্তু যুধিষ্ঠিরের তাতে লাভ কী? এদের হাতে তেভাগা হলে সে কি আর ফসলের উপযুক্ত ভাগ পাবে? কয়েকদিন আগে নায়েববাবু যুধিষ্ঠিরের বাবাকে বলেছে, মুসলিম লীগের লোকদের সঙ্গে তারা ওঠাবসা করে কোন আক্কেলে? পাকিস্তান হলে মুসলমানদের এঁটোকাটা খেতে হবে, গোরু খাওয়া হবে বাধ্যতামূলক, মুসলমানরা দিনরাত লাথিঝটা মারবে।-একি তারা জানে না? হিন্দু মেয়েদের সতিত্ব থাকবে পাকিস্তানেঃ জাত যদি ঠিক রাখতে হয় তো এদের সঙ্গে ওঠাবসা করা বন্ধ করো।
