বিসমিল্লা বলিয়া শুরু করে কেরামত।
ভারতবাসীর উপরে আল্লা করো রহমত।।
শুন শুনি ব্ৰজনে হিন্দু মোসলমান।
সোনার বাঙলার চাষার দুঙ্কে ফাটিবে পরান।।
শেষ দুই লাইন সে কয়েকবার করে আবৃত্তি করে। লোকজন জমতে থাকে ফের। লীগের কর্মীরা ফিরে এসে সবাইকে বসিয়ে দেয়, বসেন গো, তোমরা বসো। গান হবি। গান শোনেন।
মঞ্চের নিচে দাঁড়িয়ে অভয় দেয় বৈকুণ্ঠ, কেরামত আলি, ফকির আসিছে। হামি দিশা পাচ্ছি, তোমার পাঁজরার মুড়া খাড়া হয়া আছে। তুমি তার গান ধরো। মনে পড়িচ্ছে না? আরে গোল করিও না তোমরা ফকিরে ঘুমায়। শুরু করো তো, ঠাকুরের নাম লিয়া গানটা ধরো। মনে ভুল্যা গেলে ফকির তো আছেই।
কেরামত আলির সেদিকে নজর নাই। মঞ্চের এদিক থেকে ওদিক এবং ওদিক থেকে এদিক সে পায়চারি করে এবং পায়চারি করতে করতেই চাঁদরের ভেতর থেকে চার পৃষ্ঠার রোগা একটি বই বার করে পড়বার প্রস্তুতি নেয়। বই না দেখেই সে গাইতে পারে, বলতে কী বইয়ের সামনে চোখ তার বড়ো একটা থাকে না। কিন্তু বই হাতে রাখলে আত্মবিশ্বাস তার বাড়ে। এ ছাড়া বইয়ের প্রচারও তো দরকার। চোখের সামনে রোগা বইটা ধরে একটু মোটা গলায় সে শুরু করে, একই সঙ্গে চলে তার প্রবল বেগে মাথা ঝাঁকানো,
যাহার হাতে নাঙল। যাহার হাতে নাঙল, ফলায় ফসল অন্ন নাই তার পাতে।
জমির পর্চা লইয়া জোতদার থাকে দুধেভাতে রক্ত করি পানি
র অ ক্ত করি পানি মাটি ছানি ভাদ্রে রোপাই ধান।
চার মাসের মেন্নতে দেহে নাহি থাকে পরান। পৌষে ধান কাটি
পৌষে ধান কাটি, বাঁটাবাঁটি করিল জোতদার।
ভাগে পাইলাম আধা ফসল চলে না সংসার। চাষার মেনুতের দাম,
তার গান শুনতে শুনতে বৈকুণ্ঠের ধার ঘেঁয়ে এসে দাঁড়িয়েছে আলিম মাস্টার। কেরামতের দিকে তাকিয়ে সে চোখের নানারকম ইশারা করে। সেই সব ইশারায় সে কেরামতকে উৎসাহ দেয়, না হুঁশিয়ার করে বোঝা মুশকিল। কেরামত তার দিকে তাকায় না পর্যন্ত। তার নজর সামনের দিকে, শ্রোতাদের ওপর দিয়ে চোখ মেলে সে দেখছে সামনের রাস্তার অন্ধকার।।
সভার লোকজন একে একে বসে পড়ছে। কিছুক্ষণ আগে সাদেক উকিল ও খান। বাহাদুরের বক্তৃতার সামনে অখণ্ড নীরবতা এখন আর নাই। লোকজন এখন গান শুনতে শুনতে মাথা ঝাকাচ্ছে, কেউ কেউ উঠে দাঁড়িয়ে আরেকটু সামনে এগোয়, কেউ কেউ বসে বসেই এগোয়, দুই একজন চেরাগ আলি ফকিরের সঙ্গে কেরামতের তুলনা করে, গানের কথা না জেনেও কেউ কৈউ কেরামতের সঙ্গে গুনগুন করে সুর ভাঁজে। তাদের নিচু স্বরে কথাবার্তা সম্পূর্ণ নতুন গানের কথায় তাদের উৎসাহ ও উত্তেজনা তাদের সুরেলা ও বেসুরো গুনগুন করার ভেতরে ভেতরে সাঁতার কেটে চলে কেরামতের গান :
চাষার মেন্যুতের দাম খালি আকাম জোতদারেরই কাছে।
দুই মাস গেলে চাষা ঘোরে মহাজনের পাছো জোতদার মহাজনে
জো ও তদার মহাজনে মনে মনে উহাদের পিরীত।
চাষার মুখের গেরাস খাওয়া দুইজনেরই রীতা চাষার বড়ো দুষমন
চাষার বড়ো দুষমন এই দুইজন যেমন পাখির দুষমন খাঁচা।
চোরের দুষমন চান্দের পহর পোকের দুষমন প্যাঁচা।। রাবণের দুষমন
রাবণের দুষমন ভাই বিভীষণ রামের অনুচর।
ধর্মেরে করিল বরণ অধর্মেরে পরা দেহের দুষমন
আর দেহের দুষমন ভেদবমন গাছের দুষমন লতা।
চাষার দুষমন জমিদার জোতদার অতি লেয্য কথা বলি জমিদারি
ব অ লি জমিদারি উচ্ছেদ করি এমন আইন চাই।
জোতদার পাবে এক ভাগ ফসল চাষায় দুই ভাগ পাই। তাই তেভাগার ডাক
তা ই তেভাগার ডাক দাও জোরে হাঁক বলো চাষার জয়।
চাষা বিনা জগৎ মিছা ব্ৰজনে কয়। দেখো বর্মণী মায়ে
আহা বর্মণী মায়ে পুলিসের ঘায়ে হইয়াছে জখম।
পায়ে গুলি খাইয়াও বুকের বল তো নাহি কম। সকল চাষীজনে
চাষীমজুরজনে নাহি মানে জোতদারের জুলুম।
চাষীর রক্তে জোতদার বাঁচে সকলের মালুম।।
গানের শ্রোতার সংখ্যা বাড়ে খুব দ্রুত। মোটরগাড়ির পেছনে ছোেটা লোকদের কেউ কেউ রাস্তা থেকেই চলে গিয়েছে নিজের নিজের বাড়ি, তবে বেশিরভাগই ফিরে এসেছে। গান শুরু হলেই। এবং কেরামতের মাথা আঁকাবার সঙ্গে সঙ্গে শ্রোতারা মাথা দোলায়। গফুর কলুর নেতৃত্বে দাঁড়িয়ে থাকা একদল কর্মী ঘাড় নাড়িয়েই চলেছে, গফুর কলু অবশ্য মাঝে মাঝে দেখছে কাদেরকে। শুকনা মুখে কাদের তাকিয়ে থাকে ইসমাইলের দিকে। তবে এই গানে ইসমাইলের প্রতিক্রিয়া বোঝা মুশকিল। গায়কের চেয়ে তার দৃষ্টি বেশি আকর্ষণ করে শ্রোতারা, সে দেখে শ্রোতাদের মুখ আরো কিছুক্ষণ পর কেরামত চলে আসে গানের শেষ জায়গায়,
কেরামতের কথা। কে এ রামতের কথা রাখো গাঁথা সকলের হিরদয়ে।
চাষা যদি একজোট হয় ভাই দুষমন কাপে ভয়ে।।
কেরামত একটু সরে দাঁড়াতেই ইসমাইল সম্বোধন করে শ্রোতাদের, হাজেরানে মজলিশ, ভাইসব, জমিদারদের হাত থেকে, মহাজনদের হাত থেকে, জোতদারদের হাত থেকে মুসলমান প্রজাদের বাঁচাবার জন্যেই ভারতের দশ কোটি মুসলমানের নেতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ আজ পাকিস্তান হাঁসেলের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কবি কেরামত আলি তার গানের মধ্যে দিয়ে মুসলিম লীগের কথাই বলে গেলো। রাতের ঘুম আর দিনের আরাম হারাম করে আমরা —
গান হোক। গান হোক। জনতার দাবির মুখে ইসমাইল একটু বিরতি দিলো। সাদেক উকিল আস্তে চাপ দেয় ইসমাইলের পিঠে, ফিসফিস করে বলে, গান করতে দাও। পাবলিক রাউডি হয়ে গেলে–
