এবারে হাজেরানে মজলিশের সামনে দাড়ায় খান বাহাদুর সৈয়দ আহমদ আলি। কয়েক পুরুষের জমিদারি, পিতামহের মন্ত্রিত্ব ও এক পুরুষ গ্যাপ দিয়ে নিজের উপমন্ত্রিত্ব এবং তিন পুরুষ ধরে বিয়ে করা ও না-করা ইংরেজ ও এ্যাংলো ইনডিয়ান মেমসায়েবদের সঙ্গে প্রেম ও যৌন সঙ্গম প্রভৃতি কারণে খাটি সায়েবদের সাহচর্যের ফলে খান বাহাদুরের গলার ভেতর থেকে বেরুতে বেরুতে বাঙলা ভাষা অনেকটাই দুমড়ে যায়। বাকা বাঙলা, ভাঙা উর্দু ও সায়েবদের চেয়েও সায়েবি ইংরেজির মিশেলে মুসলমান কৃষকের ওপর হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের জুলুমের কথা বলতে বলতে তার গলা ভারাক্রান্ত হয়, আট মিনিটের বেশি বলা তার পক্ষে আর সম্ভব হয় না। এ ছাড়াও দলের একটি কাজে তাকে এক্ষুনি টাউনে যেতে হবে। সুতরাং দুঃখিত হয়ে খান বাহাদুর সভাস্থল ত্যাগ করার এজাজত চায় দুই হাত জোড় করে। হ্যাজাকের আলোয় ধবধবে ফর্সা হাতজোড়া তার। লালচে দেখায় এবং হাতের রঙ ও বিনয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধতা চড়ে যায় চরম পর্যায়ে। করজোড়ে তার মাফ চাওয়ায় অভিভূত কোনো কোনো বুড়া শ্রোতা বুকে ঠাণ্ডা লাগানোর ঝুঁকি নিয়েও গায়ের কথা টেনে নিজেদের ছানি-পড়বো-পড়বো চোখের কোণ মোছে।
নায়েবাবু দাঁড়িয়েছিলো মঞ্চের পেছনে। জমিদারবাবুর বুড়ো ছেলে আজ পদার্পণ করেছে লাঠিডাঙা কাচারিতে, খান বাহাদুরের সঙ্গে টাউনে যাবে বলে সেখানে অপেক্ষা করছে। নায়েবাবুর ইশারা পেয়ে খান বাহাদুর তাকে নিজের গাড়িতে উঠতে পাল্টা ইশারা দেয়।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গত কয়েক বছরে গোলাবাড়ি হাটের ওপর দিয়ে মোটরগাড়ি গিয়েছে অন্তত পাঁচবার। কিন্তু মোটরগাড়ির দীর্ঘকালীন অবস্থান এখানে এই প্রথম বলে স্থানীয় লোকজন ও মেলা উপলক্ষে আসা অন্য এলাকার জামাইরা তাদের ছেলেপুলে নিয়ে বেশ উত্তেজিত। খান বাহাদুরের সঙ্গে নায়েবাবু ও শামসুদ্দিন ডাক্তার ওঠার পর ফোর্ড গাড়ির চাকা গড়াতে না গড়াতে শ্রোতাদের উত্তেজনা নেমে আসে নিজনিজ পায়ে এবং তাদের প্রায় অর্ধেকই ছুটতে থাকে গাড়ির পেছনে। বাকি অর্ধেক কি তার একটু বেশি শ্রোতা তাকিয়ে থাকে ধাবমান গাড়ির দিকে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই অদৃশ্য-হওয়া গাড়ির শক্তি, সৌন্দর্য ও গতি নিয়ে তারা জরুরি আলোচনায় নিয়োজিত হয়। মঞ্চ থেকে ইসমাইল হোসেন চোঙায় মুখ লাগিয়ে চিৎকার করে, হাজেরানে মজলিশ, ভাইসব, ভাইসব, আপনারা বসে পড়ন, এখানে বসে পড়ুন। সভার কাজ আবার শুরু হচ্ছে, ছোটাছুটি করবেন না ভাইসব। বসে পড়ুন।
কিন্তু শ্রোতাদের আগ্রহ মোটরগাড়ির লুপ্ত আওয়াজের রেশের দিকে, ইসমাইলের আবেদনে তারা কান দেয় না। ইসমাইলের হুকুমে আবদুল কাদের প্রাণপণে নারায়ে তকবির, লড়কে লেঙে, পাকিস্তান ও কায়েদে আজম বলে স্লোগান তুললেও এর জবাবে যথাক্রমে আল্লাহ আকবর, পাকিস্তান, জিন্দাবাদ ও জিন্দাবাদ সাড়া দিতে হয় বলতে গেলে তাকে একাই, কারণ কর্মীদের সবাই আপাতত ফোর্ড গাড়ির পেছনে মাটির রাস্তার ধুলা, ধোঁয়া ও কুয়াশায় হারিয়ে গেছে।
ইসমাইল কাদেরকেই বলে, এসব কী? কোনো ডিসিপ্লিন নাই। যাও তোমার ওয়ার্কারদের নিয়ে এসো। সেই কবি কোথায়? ওকে নিয়ে এসো। গান হলে পারিক ফিরে আসবে। যাও।
কিন্তু পাকিস্তান নিয়ে কেরামত আলি এখন পর্যন্ত গান লিখতে পারে নি বলে এবং আলিম মাস্টারের সঙ্গে এর মাখামাখিতে বিরক্ত হয়ে কাদের আজ বিকালেই সভায় তার গান গাইবার আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এখন ইসমাইলের হুকুমে সে বিব্রত হয়, আমতা আমতা করে বলে, কিন্তু কেরামত আলির গানে তো পাকিস্তানের কথা নাই। এতোবার বললাম! এখনো লেখে নাই।
আঃ! যা বলি শোনা। গান হলেই চলবে।
ইসমাইলের তাগাদায় আবুদল কাদের খুঁজতে বেরিয়ে কেরামতকে পায় মুকুন্দ সাহার দোকানের সামনে। আলিম মাস্টার আর বৈকুণ্ঠের সঙ্গে দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে খুব গপ্পো মারছে। প্রায় টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এসে কাদের তাকে উঠিয়ে দিলো মঞ্চের ওপর। সঙ্গে সঙ্গে ইসমাইল বলে, ভাইসব, আপনারা বসে পড়ুন। এবার গান হবে। হাজেরানে। মজলিশের সামনে পাকিস্তানের গান শোনাবে কাদেরের কানের কাছে মুখ নিয়ে কবির নাম জানতে চাইলে কাদের ফিসফিস করে বলে, কিন্তু পাকিস্তানের গান তো লেখে নাই। ইসমাইল ধমক দেয়, আঃ! নামটা বললা না। নাম জেনে নিয়ে সে ঘোষণা করে, কবি কেরামত আলি।
ঘোষণা শুনে কেরামত একটার পর একটা টোক গেলে। জয়পুর, পাঁচবিবি, আক্কেলপুর, আমদদিঘি, হিলি, এমন কি রেলওয়ে জংশন শান্তাহারে পর্যন্ত সে গান গেয়ে। গেয়ে গানের বই বিক্রি করেছে ডজন ডজন। কিন্তু সাদেক উকিলের অতি শুদ্ধ ইংরেজি এবং খান বাহাদুরের বাঁকাচোরা বাঙলা, ভাঙা উর্দু ও সায়েবদের চেয়েও সায়েবি ইংরেজি এবং সর্বোপরি মোটরগাড়ির আওয়াজে এই সভা গমগম করছে। তার উত্তাপে কালো কালো ঘামের ফোঁটা বেরোয় কেরামতের মুখ ফুড়ে। সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, সামনে কাউকে দেখতে পায় কি-না সন্দেহ।
তবে মঞ্চের ঠিক নিচে তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে বৈকুণ্ঠ গিরি। কেরামতকে অভয় দিয়ে সে বলে, তুমি একবার ধরো না! ফকির ওই যে তমিজের বাপের ঘরোত গান করা গেলা, ওইটাই ধরো। কেরামত তবু চুপচাপ থাকলে বৈকুণ্ঠ তাকে আশ্বাস দেয়, তুমি ধরো তো! ফকিরই তোমাক দিয়া কওয়াবি!
কেরামত এতে আরো ঘাবড়ে যায়। ভয়ে ভয়ে সে তাকায় পেছনে। পেছনে বটতলা ও বটগাছও বটে। ফকিরের ভরসায় নয়, বরং ফকির এসে ফের তার ওপর ভর না করে এই ভয়েই কেরামত শুরু করে,
