গোলাবাড়ি হাটে কাদেরের দোকানের সামনে ভার রেখে কাউকে কিছু না বলেই তমিজ সোজা হাঁটা দেয়। কয়েক পা চলার পরেই আকাশের দিক তাকিয়ে দেখে বেলা উঠেছে অনেক দূর। তবে সময় আছে। ফুলজান তো তৈরী হয়েই থাকবে। কাজের মেয়ে, খামাখা বসে বসে ঝিমায় না। এমন মেয়ের কপালে এতো দুঃখ? কাল তমিজ যা দেখে এসেছে তার বেটার যে আজ কী হলো আল্লা মালুম। মা বেটাকে নিয়ে গোলাবাড়ি পর্যন্ত এসে না হয় টমটম নেবে একটা। সকালে বাড়ি থেকে তমিজ বেরিয়েছে পুরো সাড়ে ছয় টাকা হাতে নিয়ে। টমটম ভাড়া, ওষুধপত্র সব মিটিয়েও পয়সা নিশ্চয়ই বাঁচবে। টাউনে পৌঁছে না হয় রিকশা নেবে একটা। রিকশায় জড়াবার জন্যে ফুলজানকে শাড়িও একটা নিতে বলবে। রিকশা না নিলে দুই আনা পয়সা তার বাচে, কিন্তু বিমারি ছেলেকে কোলে নিয়ে ফুলজানের যদি হাঁটতে কষ্ট হয়? প্রশান্ত কম্পাউনডারের হাতে পায়ে ধরলে পয়সা নাও নিতে পারে। অবশ্য পায়ে পড়লেও অন্তত আধ হাত দূরে থাকতে হবে, ছুঁয়ে ফেললে আবার একটা কাণ্ড বাধিয়ে বসবে। তারপর রোগী দেখানো শেষ হলে ফুলজানকে সিনেমা হলের সামনে থেকে নকুলদানা কি বাদামভাজা কিনে দেওয়া যায়। জীবনে এই প্রথম টাউনে গিয়ে ফুলজান কি একটু বেড়াবার সখ করবে না? খিয়ার এলাকা থেকে ধান কেটে ফেরার পথে টাউনে নেমে ঘুরতে ঘুরতে তমিজ একবার মস্ত একটা বাগানের সামনে দাঁড়িয়েছিলো, টাউনের লোকেরা পার্ক না কী যেন বলে, ভেতরে কতো ফুলে গাছ, বসার জায়গা। ভেতরে ঢোকার সাহস হয় নি। না, ওদিকে না ঢোকাই ভালো। ঢুকতে না দিলে মেয়েছেলের সামনে বেইজ্জতি।
হুরমতুল্লার ভিটায় উঠে তমিজ গলা খাকারি দিলেও কেউ সাড়া দেয় না। অথচ ভেতরে কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। হুরমতুল্লা কি মেয়েকে মরিচের জমি নিড়াতে যেতে বলছে নাকি?–এবার থেকে এসব বন্ধ করা হবে!-না কি ফুলজানের বেটার অসুখ বাড়লো? ডাক্তারের কাছে যাবার সময় হবে তো?-মণ্ডলদের পিছে পিছে ঘুরে তার জেবনটা বরবাদ হয়ে যাবে?
ভয়ে ভয়েই তমিজ কলাপাতার পর্দা তুলে ভেতরের উঠানে ঢোকে। ঘরের কথাবার্তা এবার স্পষ্ট। ফুলজান কার সঙ্গে কথা বলে? ঘরের সামনে দাঁড়িয়েই তমিজ থমকে দাঁড়ায়। ঘরের ভেতরে মাচায় বসে রয়েছে সে নিজে, তার কোলে ফুলজানের বিমারি বেটা এবং পাশে ফুলজান। পলকের ভেতর তমিজ গতকাল থেকে ফিরে আসে আজকে এবং নিজের আসনে দেখতে পায় কেরামত আলিকে। আর সব কালকের মতোই।
তাকে দেখে ফুলজান ঘোমটা টেনে বসে মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে কেরামত আলি অবাক হয়ে তাকায়, তুমি? কী সোমাচার? তারপর তার গলায় আসে শ্বশুরবাড়ির অধিকার, আসো আসো। তোমার বাড়িত গেছিলাম গো। তুমিও নাই, তোমার বাপও বলে গেছে পুবে। মাছ ধরবার গেছে, না?
ঘোমটার ভেতর থেকেই ফুলজান আস্তে করে বলে, মাঝি মানুষ মাছ ধরবার যাবি। না? তারপর ঘরের বাইরে যাবার জন্যে উঠে দাঁড়িয়ে সে কেরামতকে বলে, মাঝির বেটাক সর্যা খাড়া হবার কন।
তমিজ সরে দাঁড়ালে ফুলজান উঠানে যায়, সেখান থেকে রান্নাঘরে।
কোলে শোয়ানো ছেলের কপালে হাত বুলাতে বুলাতে কেরামত বলে, আমার বেটাটার অসুখ খুব বেশি। গাঁয়ের মধ্যে ডাক্তার কোবরাজ তো কিছু নাই। এরা তো চিকিচ্ছা করবার জানে না। খালি হেলা করে। টাউনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো বুদ্ধি দেখি না। এখন করি কী? দুশ্চিন্তায় কপাল তার কুঁচকে যায়, আমি করি কী? গোলাবাড়ি হাটে আজ সভা, সভাত আবার গান গাওয়া লাগবি। এতোগুলা মানুষের আবদার, না-ও করবার পারি না। তার কথাবার্তা ও ভাবসাবে মনে হয় না, বৌবেটার সঙ্গে আজ তার দেখা কয়েক বছর পর। তমিজ তার দিকে সরাসরি তাকাতে পারে না। ফুলজান কী সব বলে দিয়েছে নাকি? কিন্তু তার কথাবার্তা শুনে বোঝা যায়, তার তালাক টালাক নিয়ে তমিজের মিছে কথাগুলো ফুলজান তাকে কিছুই জানায় নি।
তুমিও তো মণ্ডলের জমি বর্গা করলা, না? তাই তো খন্দের ভাগ তোমাক কমই দিছে।
তমিজ কথা বললো এতক্ষণে, কেটা কলো?
সবই জানি। আমার জানা লাগে। ফুলজানের বাপ সাদাসিধা মানুষ, মণ্ডল যা দেয় তাই নেয়। উগলান চলবি না। খিয়ারের খবর তো শুনিছো?
ওইসব খবর শুনতে তমিজের উত্তেজনা হয় ভয়ও লাগে। সে জিগ্যেস করে, পরামাণিক কুটি?
আমার শ্বশুর গেছে তার শ্বশুরবাড়ি। আরে, শ্বশুর গেছে শ্বশুরবাড়ি। শ্বশুরবাড়ির পানশুপারি। দাঁত নাই তাই খাইতে নারি। মুখোত মারো হামানদিস্তার বাড়ি। ছড়াটি বলে কেরামত খুব হাসে। তারপর ব্যাখ্যা করে, পোড়াদহ মেলার সময় বাড়িত জামাই আসিছে, বুঝলা না? শ্বশুর গেছে আমার শাশুড়ি আর শালিক আনতে। আরে শালি না থাকলে মানষে কি আর শ্বশুরবাড়ি আসে? বোঝো না, বৌ হলো ডালভাতের থালি। রসের হাঁড়ি জোয়ান শালি। রসিকতা সম্পন্ন করে সে ফের আনে ফসলের প্রসঙ্গ, তুমি বলে মেলা ধান করিছো? আরে ধান তো করলা, ভাগ পাছো কেমন? আদ্দেকও তো পাও নাই। জয়পুর পাঁচবিবি আক্কেলপুরের চাষারা কিন্তু দুই ভাগ পালে জোতদারের গোলা নিজেরাই সাফ করিচ্ছে। খবর রাখো?
২৩. কোরান ও সুন্নার আদের্শ জীবন যাপন
কোরান ও সুন্নার আদের্শ জীবন যাপন করার লক্ষে পাকিস্তান কায়েমের জেহাদে ঝাপিয়ে পড়ার আহ্বান বাঙলা ভাষায় জানালেও নিজের পেশাগত অভ্যাসের কারণে এবং সৈয়দ আমির আলির স্পিরিট অফ ইসলাম-এর প্রায় অর্ধেকটাই মুখস্থ থাকার ফলে সাদেক উকিলের বেশিরভাগ কথাই বেরিয়ে আসে ইংরেজিতে। ইসলামের বিজয়গাথা প্রচার ও সেই সঙ্গে রাজভাষার ব্যাকরণগত শুদ্ধতা বজায় রাখতে তার মনোযোগ, যত্ন ও নিষ্ঠা একেবারে নিরঙ্কুশ। তবে দুটো হ্যাজাক ছাড়াও মঞ্চ আলো করার একটি প্রধান উপাদান। খান বাহাদুর আলি আহমদের কোনো আমির আলি এখন পর্যন্ত দুর্গাভ্যক্রমে আবির্ভূত না হওয়ার তার মহানুভবতা, ইসলামের জন্যে তার ত্যাগ ও চারিত্রিক বলিষ্ঠতার কথাগুলো। সাদেক আলিকে বলতে হয় বাঙলাতেই। কিছুক্ষণের মধ্যে. সে ফের ইংরেজিতে গড়ালে তার গুণকীর্তনের পাত্র স্থানান্তরিত হচ্ছে জেনে এবং ইংরেজি ভাষায় অভিভূত শ্রোতারা তার কথা কিছুই বুঝতে পাচ্ছে না তা ওয়াকিবহাল থাকায় শামসুদ্দিন ডাক্তার আস্তে করে টান দেয় মীর মোহাম্মদ সাদেক আলির ডোরাকাটা খয়েরি শেরোয়ানির লম্বা ঝুলের প্রান্ত ধরে এবং এই টান দেওয়াটা প্রায় টানাটানিতে দাঁড়ালে টানটান মনোযোগ প্রয়োগ করা থেকে শ্রোতাদের অব্যাহতি দিয়ে ভাষণ সংক্ষিপ্ত করতে সে বাধ্য হয়।
