বই তো এখন দেওয়া যাবি না, কুলসুম ভেতর থেকে জবাব দেয়, ঘরের মানুষ আসুক। কেরামত তবু উঠতে চায় না। এখানে আসার পর থেকে চেরাগ আলির কথা এখানে শুনতে শুনতে তার কানে তালা লেগে গেলো। বৈকুণ্ঠ কেরামতের গান খুব শুনতে চায়, কিন্তু তার মন সম্পূর্ণ পড়ে থাকে চেরাগ আলির গানের দিকে। কেরামতের একটা গান শুনে সে হয়তো বুদ হয়ে আছে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর সে গুনগুন করতে শুরু করে অন্য কোনো গান। তার বুদ হওয়াটা তখন সমর্পিত হয় চেরাগ আলির শোলোকে। কেরামতের গানে খুশি আলিম মাস্টার। কিন্তু বলে, ইগলান গান এদিকে এখনো মানুষে লিবি না। এটিকার মানুষ এখনো জোতদারের পিছে লাগে নাই। অথচ জোতদারের লোকদের হাত থেকে ফসল ছিনিয়ে নেবার সময় পাঁচবিবির জয়পুরের আধিয়ার চাষাদের গা গরম হতে তো তারই শোলোক শুনে। ধলাহারে পালামি বর্মণের মায়ের হাতে লাগলো জোতদারের ভাড়াটে পুলিসের গুলি, কনুই থেকে রক্ত রেবুচ্ছে ফিনকি দিয়ে, বুড়ি মাটিতে পড়ে গিয়ে কেরামতকে সামনে দেখে বলে, বাপ, তুই গাহান বন্ধ করিছিস কেনে? গান ক, গাহান ক বাপ। অথচ পুলিসের ভয়ে এদিকে এসে কেরামত তার গানের আর ভক্ত পায় না। এদিকে তার কাছে পয়সাকড়ি নাই। আলিম মাস্টারের সঙ্গে থাকে। মাস্টার তো জায়গির থাকে নিজেই, তাও এক আধিয়ার চাষার বাড়িতে। জমির কাছে চাষার সঙ্গে হাত লাগায় বলেই না তাকে থাকতে দিয়েছে। তার খাতিরে কেরামত এখন পর্যন্ত দুইবেলা দুই মুঠো খেতে পাচ্ছে। এই খাতির টিকবে কতোদিন? নতুন ধান উঠেছে, খেতে দিচ্ছে। কয়েক মাস পর চাষার নিজের ভাত জুটবে
, তখন মাস্টার তার মাসের বেতনও যদি ওই লোকের হাতে তুলে দেয় তো কেরামত সেখানে পাত পাততে পারবে?—তার চেয়ে বৈকুণ্ঠের কথা মতো সে যদি ফকিরের গান গায়, তবে পেটটা চলে। সেসব তো এই এলাকার গান, যে কেউ গাইতে পারে, তাতে দোষের কিছু নাই। বৈকুণ্ঠ বলে ওইসব গান চালু থাকলে ফকিরের আত্মাটা শান্তি পায়। আরে ফকিরের আত্মার শান্তি ফকির নিজেই জোগাড় করুক। আপাতত তার বইটা পেলে কেরামত না হয় উল্টেপাল্টে একটু দেখে।
তাই তো দুই দিন বাড়িত আসবি না। আপনে না হয় মেলা পার করা দিয়া আসেন। ভেতর থেকে কুলসুম এই নির্দেশ ছাড়লে কেরামতকে উঠতেই হয়। তবু যাবার আগে একবার বলে, পিয়াস লাগিছে, পানি খাওয়া যাবি?
মাটির খোরায় পানি এনে কুলসুম রেখে দেয় দরজার বাইরে। তার কালো হাতের একটু ফ্যাকাশে লম্বা আঙুলগুলো দেখে কেরামতের পিপাসা চড়ে তার সর্বাঙ্গ জুড়ে। পানি খেয়ে রাস্তায় নেমে হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে নিজের গান গাইবার পিপাসা বাড়তে থাকলে তার শরীরের পিপাসার আর সীমা পরিসীমা থাকে না। কেরামত এখন করবেটা কী?
ফুলজানের কাছে যেতে তমিজের বেশ দেরিই হয়ে গিয়েছিলো।
বাপের ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে গাওয়া চেরাগ আলির গান শুনে সে ভয় পায় নি, আবার এতে দিওয়ানা বনে যাবার মানুষও সে নয়। চেরাগ আলি হলো কালাহারের মুনসির খাস লোক, জিন্দা হোক মুর্দা হোক অনেক কিছুই সে করতে পারে। গানের পর কাঁথা মুড়ি দিয়ে কুলসুম শুয়ে পড়েছিলো ফোঁপাতে ফোঁপাতে। হাঁড়িতে আর ভাত ছিলো না এক দানা। খালি পেটে ঘুম আসতে দেরি হয় তমিজের, আবার ভোরবেলা ঘরের দরজায় হাঁক ছাড়ে গফুর এ তমিজ, তমিজ। তাড়াতাড়ি হাটোত আয়। কাদের ভাই যাবার কছে রে। মেলা কাম আছে।
হাটে গেলে কাদের তাকে লাগিয়ে দিলো গফুর কলুর সঙ্গে। এ কেমন কথা গো? কলুর হুকুম তামিল করতে হবে তাকে? বলতে গেলে, কলুর বেটাকে এড়াতেই সে কাদেরের পিছে পিছে কাঁধে বাঁক নিয়ে চললো লাঠিডাঙা কাচারিতে। কাচারি থেকে চেয়ার, লাল সালু, সামিয়ানার কাপড় বয়ে নিয়ে এলো গোলাবাড়ি।
পরশু পোড়াদহের মেলা। মেলা উপলক্ষে আশেপাশের মেয়েরা এসে গেছে বাপের বাড়ি, জামাইরা এখনো আসছে। পোড়াদহের চারদিকে গ্রামগুলো মানুষজনে গিজগিজ করছে। ইসমাইল এই সুযোগটা ছাড়তে চায় না। মেলার একদিন আগে গোলাবাড়ি হাটে মুসলিম লীগের সভা। ইসমাইল হোসেন তো বলবেই, শামসুদ্দিন ডাক্তার কথা দিয়েছে খান বাহাদুর সাহেবকে নিয়ে আসার জন্যে সে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করবে, বাকি আল্লার ইচ্ছা। বটতলা ঘেঁষে মঞ্চ তৈরি হবে, মঞ্চের জন্যে তক্তপোষ পাওয়া গেছে মুকুন্দ সাহার কাছ থেকে, চেয়ার দেবে নায়েববাবু।
নায়েববাবু চেয়ার তো দিলোই, খান বাহাদুর আসবে শুনে সামিয়ানাটা পর্যন্ত বরাদ্দ করলো নিজে থেকেই। এমন কি কাদেরকে চেয়ারে বসতে বললো পর্যন্ত, আরে বসো, বসো। খান বাহাদুর সাহেব আমাদের বাবুর বড়ো ছেলের বাল্যবন্ধু, কলকাতায় ওঁদের ওঠাবাসা সব একসঙ্গে। তা তিনি এলে আমাকে তো একবার যেতেই হয় বাপু।
তারপর গলা নামিয়ে নায়েববাবু বলে, তোমার তো পাকিস্তান পাকিস্তান করছে। করো। জমিদারি নাকি থাকবে না। তাও না হয় নিয়েই নিলে। কিন্তু নিজেদের জমিজমা ঠিক রাখতে পারবে তো? নিজের জমির ফসল যদি না পাও তো জমিও যা, জঙ্গলও তাই। জয়পুর পাঁচবিবির ঘটনা তো জানোই। ওইটা ঠেকাতে না পারলে কিন্তু ঝাড়েবংশে শেষ হয়ে যাবে। ওদিকে সব চাষারা জোতদারদের গোলা লুট করলো, কাল জোতদারের মেয়ে বিয়ে করতে চাইবে। কথাটা খেয়াল রেখো বাপু।
কাঁধে বাঁক থাকায় তমিজকে চলতে হয় দুলকি চালে, সে গোলাবাড়ি পৌঁছে যায় বেশ তাড়াতাড়ি। সে অবশ্য চলছিলো অতিরিক্ত জোর কদমে, পা ফেলছিলো চাপ দিয়ে দিয়ে।-এটা কি ফুলজানের বেটাকে টাউনে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে বলে, না-কি জয়পুর পাঁচবিবির চাষাদের ধাক্কায় তা ঠিক করে বলা মুশকিল।
