বটতলায় এসে কেরামত আলি ওপরের দিকে তাকালে বটগাছের পাতার ফাঁকে ফাকে অজস্র লাল ফল চোখে পড়ে। প্রত্যেকটি ফলে চেরাগ আলির মণি-ছেড়া চাউনি। এখানে এসে চেরাগ আলি নাকি প্রথম গান করে এই বটতলায় দাঁড়িয়েই। বটতলা বড়ো পয়মন্ত জায়গা। ফকিরের পসার তো কম হয় নি। ওদিকে গেলে জয়পুর, পাঁচবিবি, আক্কেলপুর, আদমদিঘি, হিলি, পাহাড়পুর, এমন কি শান্তাহার জংশনে পর্যন্ত চেরাগ আলির গান শুনতে মানুষের ভিড় জমে গেছে। মানুষটা অনেক জানতো, কেরামত তাকে নিয়ে ঠাট্টা করতো, কিন্তু কৈ, চেষ্টা করেও তার গলার রুখা স্বরটা তো সে রপ্ত করতে পারলো না। তারপর চেরাগ আলি খোয়বের সব বৃত্তান্ত বলতে পারতো। তারপর কী যে হলো, কেউ জানে না, কেবল বৈকুণ্ঠ একদিন বলেছে, মুনসি নাকি ওকে নিষেধ করায় খোয়বের খোঁড়াখুঁড়ি ছেড়ে সে দেশান্তরি হয়ে গেলো। পাঁচবিবিতে এই মুনসির কথা ফকির তাকে কয়েকবার বলেছে। কেরামত পাত্তা দেয় নি, উগলান কথা থোও বাপু। তোমার মুনসি কও আর জিন কও আর দেও কও, তার সাথে তোমার যতোই খাতির থাকুক, তারা তোমাক শোলোক কয়া দিবি না। তোমার শালোক লেখা লাগবি তোমাক লিজে। হামার গান বান্দি হামি লিজেই।-এইসব ঠাট্টা শুনে চেরাগ আলি কিন্তু জবাব দেয় নি। একদিন কেবল তার শেষ গানটা শুনে বিহ্বল কেরামতের চোখে চোখ রেখে বলেছিলো, এই গান লেখবার পারবা? না হামি পারমু? গান বান্দা এক কথা আর পাওনা শোলোক আরেক জিনিস। সে নিজেই বলেছে তার নাকি খোয়বের বৃত্তান্ত লেখা বইও একটা আছে, সেটা রেখে এসেছে নাতনির কাছে। তা তার নাতজামাইটাকে তো কেরামত দেখলো। ওটা কি মানুষ নাকি? দাদাশ্বশুরের মরার খবর শুনে তার তো কিছুই হলো না, মরা মানুষ এসে ঘরের অন্ধকার কোণে দোতারা বাজিয়ে গান করে আর ওই হাবাটা মেঝেতে শুয়ে ভেঁস ভেঁস করে ঘুমায়। আর সেই মানুষের আছে কি-না গচ্ছিত থাকে চেরাগ আলির খোয়াবের বই। চালাকচতুর বরং ফকিরের নাতনিটা। ঘোমটার আড়ালে তার মুখ যেটুকু দেখা গেলো তাতেই বোঝা যায়, সুন্দরী মেয়ে। তার কালো হাতের আঙুলগুলো কী সুন্দর লম্বা লম্বা। দাদার মৃত্যুসংবাদ শুনে তার যেন কোনো ভাবান্তরই হলো না। তাদের জন্যে পাকশাক করলো, কতো যত্নআত্তিই না করলো। আবার চেরাগ আলিকে নিয়ে কেরামত যাই বললো সবই শুনলো সে দুই কান খাড়া করে। তারপর সবাইকে খিলানদিলান করিয়ে ঘরের অন্ধকার কোণে মাচায় শুয়ে শুরু করলো চাপা কান্না। এমনি কান্না যে মনে হয়, মাচার ওপর থেকে নয়, মাটির অনেক নিচে গাছপালার শেকড়বাকড় যেন পানির অভাবে মরার আগে শেষ কান্না কেঁদে বিদায় নিচ্ছে। এই মেয়েটিকে নিয়ে একটা বড়ো পদ্য লিখতে পারলে কেরামত আলির জীবনের আর অন্য কিছু লেখার দরকার হতো না। ওই বইয়ের রোজগারে তার সারা জীবন চলে যায়। ফকিরের বইটা দেখলে হয় একবার। তমিজের বাপ না জানে লেখা না জানে পড়া। একে জাহেল মানুষ, তাইতে আবার হাবা। আবার সে নাকি ঘুমের মধ্যে হেঁটে হেঁটে চলে যায় কোথায় কোথায়। তাইতেই বৈকুণ্ঠ একেবারে মুগ্ধ। আরে, ঘুমের মধ্যে মানুষ যদি কাজকাম সব সারতে পারবে তো আল্লা এতো বড়ো একটা সুরুজ দিয়েছে কেন আর সেই সুরুজের এতো রোশনাই বা থাকবে কেন?
কিন্তু তমিজের বাপকে ঘরে পাওয়া যায় না। সারারাত্রি কোথায় কোথায় ঘুরে এসে–ভোররাত্রির দিকে সে নাকি একটুখানি ঘুমিয়েছিলো। ঘরের ভেতর থেকে কুলসুম জানায়, ঘুম থেকে উঠে একটু আগে বেড়জাল হাতে সে চলে গেছে পুবের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে গেছে কালাম মাঝির ভাগ্নে। ফিরবে পোড়াদহেল মেলা সেরে।।
কুলসুম কথা বলে ঘরের ভেতর থেকে। কাল মাথায় ঘোমটা দিয়ে হলেও সবাইকে এতো আদর যত্ন করলো, আর তার এতো পর্দা করার দরকার কী? কেরামত তবু দাঁড়িয়ে বলে, তমিজ নাই? তার সাথে কথা আছিলো। এতে একটু কাজ হয়। শরীর সম্পূর্ণ দরজার কপাটের আড়ালে রেখে একটা সিঁড়ি বার করে দিয়ে কুলসুম বলে, বাড়ির খুলিত বসেন। তার বেটা আসবি।
বাইরের উঠানে ঘরের দরজা ঘেঁষে পিঁড়িতে বসে কেরামত জোরে জোরে বলে, ফকির চেরাগ আলি মিয়া তোমার কথা খুব কছে। তোমাক ওই কথাগুলা কওয়া দরকার। মরার আগে উনি কি অসিয়ত করলো, তোমাক কওয়া আমার ফরজ। দাদার শেষ উপদেশ কিংবা বাণী শুনতে কুলসুম তেমন আগ্রহ দেখায় না। কিন্তু কর্তব্য পালনের তাগিদে কেরামতকে বলতেই হয়, ফকির তোমার জন্যে আফশোস করিছে। কছে, একটাই ফরজন্দা আমার। বাপ-মা মরা মেয়ে। এবার দরজার ঠিক ওপাশেই এসে দাঁড়িয়েছে কুলসুম, বুঝতে পেরে কেরামত গলা একটু নামায়, তমিজের বাপ তো মানুষ খুব ভালো, মনটা একেবারে সাদা। কিন্তু তোমার দাদা কছে, আমি জানি না, তোমার দাদাই কছে, তমিজের বাপের বয়েসটা একটু বেশি। বুদ্ধিশুদ্ধিও আল্লা তাক একটু কমই দিছে। লেখাপড়াও তো করে নাই। মাঝির ঘরে লেখাই কী আর পড়াই কী? ওটা তো কোনো দোষের কথা নয়। কিন্তু ফকির চেরাগ আলি মিয়া তার বই নাকি থুয়া গেছে তারই কাছে। তমিজের বাপ কি ওই বই কিছু পড়বার পারে? কুলসুম কিছুই না বললে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কেরামত ফের বলে, বইটা একবার দেখবার চাইছিলাম। ফকির সাহেব বলিছে, কেরামত তুমি বই লেখো, আমার বইয়ের রহস্য তুমি বুঝবা। আমি বই লেখি, হাটে বাজারে মেলায় বই পড়ি, মানুষ খুশি হয়া কেনে, পাইকাররা কিন্যা নেয়। আর ফকিরের বইয়ের শোলোক সব পাওনা গান, আগিলা জমানার শোলোক, কেউ লেখে নাই। তা বইখান একবার দেখলে হয়–।
