কেরামতের চোখের মুগ্ধ কৌতূহলে তৃপ্ত বৈকুণ্ঠ তার এখানে বাস করার কারণটি বলবে কি-না তাই নিয়ে ভাবনায় পড়ে। তুমি ভিন জাতের মানুষ, তোমাক কি কওয়া যাবি? কিন্তু না বলে তার এখন আর উপায় নাই। তাই সে জানায়, এই যে পোড়াদহের মেলা, এই মেলা প্রথম চালু করে ভবানী পাঠক, আহা বড়ো সখের মেলা তার। দেহ রাখার পর তিনি প্রস্থান করেছেন কৈলাসে, কিন্তু বছরকার একটি দিন তাকে এখানে দেখা যায়। কে দেখে? যে সে জাতের মানুষ কি আর দেখতে পারবে? এদিকে এখন সব মোসলমান আর সাহা আর কুমার আর কামার আর মাঝি আর কলু, ঠাকুরকে তারা দেখবে কোথেকে? বামুন কায়েতকেও ঠাকুর দর্শন দেবেন না। দেবতা হলে কী হয়, বামুন কায়েতরাও ওই যুদ্ধের সময় দাসখত লিখে দিয়েছিলো গোরাদের পায়ে।-সন্ন্যাসী জাতের মানুষ যদি শুদ্ধ বস্ত্রে, শুদ্ধ চিত্তে মেলার আগের দিনে ব্রাহ্ম-মুহূর্তে মোষের দিঘির উঁচু পাড়ে তালগাছের তলায় দাঁড়ায় তো ঠাকুর তাকে দর্শন দিলেও দিতে পারে। বৈকুণ্ঠের স্বর্গীয় পিতৃদেব তাকে বারবার বলে দিয়েছে, এখানে যদি সে চারদিকে একটু দৃষ্টি রাখে তো তার খাওয়া পরার অভাব হবে না, লোকালয়ে সবার সম্মান সে পাবে এবং পরজন্মে কী পাবে না পাবে তা আর নাই বললো। সেটা জানে শুধু ঠাকুর।
বৈকুণ্ঠের এই ব্যাখ্যায় কেরামতের বিভ্রান্তি কাটে না। ভবানী পাঠকের সঙ্গে চেরাগ আলি ফকিরের মরণোত্তর গান গাওয়ার সম্পর্ক কী? যমুনার পশ্চিম পারে সে বরং দেখেছে মজনু শাহের দাপট। যমুনার-পেটে-যাওয়া মাদারিপাড়ার মানুষজনের ভাবসাব দেখে মনে হতো, ওরা সবাই মজনু শাহের একেকটা পালোয়ান। শালারা খেতে পায়, পাছায় কাপড় নাই, এক ছটাক জমি নাই, এদিকে গলার তেজ ষোলো আনা। লাঠি হাতে করে ভিক্ষা করে, ভিক্ষা না দিলে শাপমণ্যি করে, ভয় দেখায়। চেরাগ আলি তো ওই পালোয়ানদের গুষ্টির মানুষ। কেরামত তার মুখেই শুনেছে, করতোয়ার পুবে পশ্চিমে সবই ছিলো মজনুর দাপটে, গোরারা জবর দখল করিছে।
কথা ঠিক। বৈকুণ্ঠ খানিকটা মেনে নেয়, মুনসি আছিলো ভবানী পাঠকের সেনাপতি। গান শোনো নাই, ভবানী নামিল রণে, পাঠান সেনাপতি সনে, এই সেনাপতিটা কও তো কেটা?
কেরামতের নীরবতায় তার অজ্ঞতা প্রমাণিত হয়েছে ভেবে বৈকুণ্ঠের আত্মবিশ্বাস বাড়ে, পাকুড়গাছের মুনসি হলো ওই সেনাপতি। মজনু শাহের লিজের মানুষ আছিলো তাই। এখনো কালীপূজার আত্রে ভবানী পাঠকের আদেশে মুনসি কাত্রা ভাসায়া দেয় বিলের মধ্যে, ওই কাত্রার মধ্যে কালা পাঁঠা বলি দিবার পারে তো তোমার সর্ব পাপ মোচন হবি। আরে এই খপর তো এটিকার ক্যাচলা ছোলও জানে।
কেরামত জানে, কিন্তু ফকির কতোবার কছে, গানের মধ্যেও কছে, মুনসি আছিলো মজনু শাহের খাস মানুষ।
এতেও বৈকুণ্ঠের আপত্তি নাই, কথা ঠিক। ভবানী পাঠকের কাছে মজনু বার্তা পাঠালো। কী? না-তোমার আছে আলি, হামার আছে কালি; তোমার তাকত আলির হাতত আর হামার শক্তি আছে মা কালির কাছে; ঠিক কি-না?–হামরা একত্তর হই। আলি আর কালি একত্তর হলে কোম্পানি এক ঘড়ি খাড়া হয়া থাকবার পারে?—তা হলে বোঝো। তখন দুইজনের মানুষ আর আলাদা থাকলো না। মুনসি তখন ভবানী সন্ন্যাসীর হুকুম শুনবি না কিসক? দৃষ্টান্ত পর্যন্ত দেয় বৈকুণ্ঠ, না হলে এখনো মুনসি বিলের মধ্যে কাত্যা ভাসায় কিসক?
এই প্রমাণ দাখিলের পর আর কথা বলা নিরর্থক। এর মধ্যে মুকুন্দ সাহাও এসে। পড়েছে দোকানে। কিন্তু বৈকুণ্ঠ তবু বলেই চলে, চেরাগ আলি ফকির থাকলে ইগলান। মীমাংসা হয়া গোলে নি। কাল গানের মধ্যে শুনলা না? স্বপনের বিত্তান্ত কলো ক্যাংকা করা, বুঝছো না?
ফকিরের গতকালের গানে স্বপ্নের বৃত্তান্ত কোথায়?–কেরামতের অজ্ঞতায় বৈকুণ্ঠ ঠোট বাঁকায়, লিজে তুমি গান বান্দো, ইগলান কথা বোঝো না? বাবরি চুলের ছইখানি, তার উপরে চেরাগদানি। মানে লাওয়ের উপরে প্রদীপ আছে, সেটা জ্বলে না। কিসক? আগুন নাই, জ্বলে ক্যাংকা করা? লাও ডোবে, মাঝি ঘোলা জল খায়। কোম্পানির সেপাইয়ের গুলি খায়া মুনসি মরলো, তার আগে আগে উগলান স্বপন দেখিছে। ফকির কছে, মানষে মরার আগে স্বপনে ইশারা পায়।
দোকানের দিকে পা ফেললে কেরামত তার পিছু ছাড়ে না, বলে, চেরাগ আলি মরার আগে মনে হয় লিজেই উগলান স্বপ্ন দেখেছি। তাই ওই গান বান্দিলো।
তোমার বাপু মাথা মোটা! বিরক্ত হয়ে বৈকুণ্ঠ দাঁড়ায়, আরে ফকির তো গান বান্দে নাই, তার গান সব পাওনা শোলোক। ফকির লিজের কথা কবি কিসক? মুনসিক বাদ দিয়া কি লিজের কথা কবার পারে? তোমাগোরে লাকান বেয়াদব আছিলো না তাই। তুমি তাক কয়দিন দেখিছো? হামরা তার পাছে পাছে ঘুরিছি, তার সাথে বস্যা থাকিছি। মানুষে আসিছে, স্বপনের কথা কছে, ফকির তার মঙ্গল অমঙ্গল কয়া দিছে। হামরা। শুনিছি। বলতে বলতে মুকুন্দ সাহার দোকানের বারান্দার নিচে দাঁড়িয়ে সে বলে, এখন মনে হয় তমিজের বাপ কিছু জানে। ফকিরের বইখানও তো দিয়া গেছে তমিজের বাপেক। সেটা কি এমনি এমনি? রহস্য বোঝে না?
দোকানের ভেতর থেকে মুকুন্দ সাহা হাঁক ছাড়ে, বৈকুণ্ঠ, সকালবেলা দোকানে ঢোকার আগে কার সাথে কি খায়া আসলু রে? সাতসকালে বেজাতের মানুষের সঙ্গে খাওয়া দাওয়া করে দোকানে কারো প্রবেশ.সে অনুমোদন করে না।
বৈকুণ্ঠ বলে, আসিচ্ছি বাবু।
