ওই চারজন পুরুষমানুষের কেউ ঘরের ভেতরে তাকিয়ে এবং কেউ কেউ না তাকিয়েও ঘরের ভেতরে মাচায় চেরাগ আলির গান শুনতে পায় ঠিকই :
গোল করিও না তোমরা ফকিরে ঘুমায়।
গলা ঝাঁঝরা কোম্পানির কামানের গোলায়।
নিন্দের সোয়ারি ফকির ধীরে দাড় বায়।
বাবরি চুলের ছইখানি ওপরে চেরাগদানি
চেরাগে আতশ নাই নাও ড়ুবে যায়।
দেহ জখম কোম্পানির কামানের গোলায়।।
গোল করিও না সাগরেদ ফকিরে ঘুমায়।।
রৌদ্রে ফাটে ঝাঁঝরা গলা তামাম নদীর পানি ঘোলা
আঁজলা ভরা পানি তাহার পিয়াস না মিটায়।
নিন্দের সোয়ারি ফকির ধীরে দাঁড় বায়।
গোল করিও না বান্দা ফকিরে ঘুমায়।।
গানের শেষের দিকে এসে আওয়াজ চলে যায় দূরে। বাড়ির সামনের খুলি পার হয়ে ডোবার কোমর পানিতে অল্প একটু বুদবুদ তুলে বুদবুদের টুপটাপ বোল নিজের শরীরে বরণ করে আওয়াজটি রাস্তা ডিঙিয়ে ওই বোলের সবটাই ঝেড়ে ফেলে শিশির পড়ার ফিসফিসানি মেনে নিয়ে ঢুকে পড়ে সন্ধ্যার খাপের মধ্যে এবং কুয়াশা ঝোলানো কালচে গোলাপি আসমানকে মিশমিশে কালো করে আসমানকে তো বটেই, ওই সঙ্গে নিজেকেও একেবারে আড়াল করে দেয়। বলতে কী, চেরাগ আলি ফকিরের গানের গড়িয়ে চলাতেই গিরিরডাঙায় সেদিন রাত্রি নামলো একটু আগেই।
সেই সঙ্গে ঘুম নামে তমিজের বাপের গতর জুড়ে। চেরাগ আলির গান ডোবার কোমর পানি ডিঙাবার আগেই দরজার চৌকাঠে মাথা রেখে ঘরের মেঝেতে চিৎপটাং হয়ে শুয়ে পড়েছে তমিজের বাপ। ঘুমের মধ্যে তার তমিজের মায়ের আমলের উরুর ঘা এবং কুলসুমের আমলের হাঁটুর ঘা চুলকায়, গানের স্পন্দনে চলতে থাকে তার ঘুমের মধ্যে বাইরে যাবার আয়োজন।
গানের আওয়াজ বাইরের অন্ধকার আকাশে মিশে যাবার পরপরই ঘরের মাচায় কাঁচকাচ শব্দ শুনে তমিজ, বৈকুণ্ঠ ও কেরামত আলি ওদিকে চোখ ফেরায়। গায়ে মাথায় কাঁথা জড়ানো কুলসুম মাচার ওপরেই পাশ ফিরলো। দমক দমক কান্নার রেশ তার আর গানচাপা নাই। তবে তার ঘুমের ভেতর এই কান্নায় চেরাগ আলির গানের রেশ কানে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়।
গোলাবাড়ি ফেরার সময় বৈকুণ্ঠের হাঁটার তালে তালে ফকিরের গানের নেশা ঘন। হতে থাকে। আর কেরামত আলির শিরশির করা গায়ে লাগে চেরাগ আলি ফকিরের চোখের ছটফটে চাউনি। গোলাবাড়ি হাটে বৈকুণ্ঠের সঙ্গে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসবার পর আলিম মাস্টারের জায়গিরবাড়ি পর্যন্ত হাঁটতে হাঁটতে, এমন কি ওখানে পৌঁছেও সেই চাউনি থেকে তার চোখ রেহাই পায় না। কেরামতের ঘুম হয় না। ভোর হতে না হতে সে চলে যায় গোলাবাড়ি হাটে মুকুন্দ সাহার গদিতে।
বটতলায় বৈকুণ্ঠের সঙ্গে চিড়াগুড় খেতে খেতেও কেরামতের ভয় কাটে না। আস্তে আস্তে বলে, ফকির মনে হয় কাল নাতনির ওপর আসর করিছিলো। সে নিশ্চিত, কুলসুম কিছুতেই ওই গলায় গাইতে পারে না। চেরাগ আলির গলা মোটা এবং একটু রুখা, মাঝে মাঝে কর্কশও বটে। কিন্তু শুনলে কিছুক্ষণের মধ্যে সারা শরীর জেগে ওঠে, মানুষ এই গান থেকে সরে যেতে পারে না। কেরামত হাজার চেষ্টা করলেও তার মোলায়েম গলায় ওই স্বর আনতে পারে না। আর কুলসুমের গলা তো রীতিমতো মিষ্টি, তার পক্ষে কি গোল করিও না তোমরা ফকিরে ঘুমায় গাইবার সময় শ্রোতাকে ওইভাবে ধমক দেওয়া সম্ভব?–চেরাগ আলি নির্ঘাৎ কাল ভর করেছিল কুলসুমের ওপর।
কিন্তু কেরামতের ধারণা নস্যাৎ করে দেয় বৈকুণ্ঠ, একটু রাগ করেই সে বলে, ইগলান কী কথা কও? আসর করবি কিসক? মাচার উপরে ফকিরেক হামরা দেখনু না? ফকির না আসলে দোতারা বাজালো কেটা? কেমরামতের চোখ থেকে তবু সন্দেহ যায় না দেখে তার রাগ বাড়ে, রাগের চোটে সে এক গ্রাসে মুখে অনেকটা চিড়া ফেলে এবং শুকনা চিড়া গলায় আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বলে, হামার চোখ এখনো লষ্ট হয় নাই, বুঝলা? তোমাগোরে জাতের যা তা খাওয়ার অভ্যাস, তোমাগোরে লাকান হামরা যা তা খাই না, বুঝলা? হামি বলে লিজের চোখে দেখনু, মাচার উপরে খ্যাতা মুড়ি দিয়া বস্যা মাথা ঝুঁকায়া কুঁকায়া ফকির গান করিচ্ছে। গানের মধ্যে স্বপনের কথা কলো, কিছু বুঝিছো? তোমরা হলা যমুনার মধ্যেকার চরুয়া চাষা, মুনসির বিত্তান্ত তুমি কী বুঝবা?,
না বোঝার কী হলো? ফকির লিজের মরার কথা আগাম কয়া গেছে। নিন্দের সোয়ারি—।
মুখ ভরা চিড়া নিয়ে বৈকুণ্ঠ হাসে, বোঝা অতো সোজা লয়। শোনো ফকিরে লিজের কথা কয় না। তার লিজের কী পরের কী? কালাহার বিলের চারো পাশের ব্যামাক মানুষ জানে, ওই ফকিরের খুঁটি হলো পাকুড়গাছের মুনসি। বুঝিছো?
তুমি ঠিক জানো? কেরামতের এই প্রশ্নে সন্দেহের চেয়ে বরং আত্মসমর্পণের লক্ষণ দেখে বৈকুণ্ঠ মহা উৎসাহে কোঁচড়ের বাকি চিড়ার সদ্ব্যবহার করে, কলপাড়ে গিয়ে টিউবওয়েলের জল খায় আঁজলা আঁজলা এবং মুখে জোড়া পান ঢুকিয়ে জানায়, ইগলান কথা আমি জানি না তো জানে কোন শালা? এরপর সে ব্যাখ্যা করে তার অধিকারের কথা।-আরে সে হলো গিরিবংশের মানুষ, তার রক্তে দশনামার এক নামা গিরির রক্ত টগবগ করে ফুটছে। এই যে দেখো গিরিরডাঙা, নিজগিরিরডাঙা; এই যে গোলাবাড়ির হাট, পোড়াদহের মেলার মাঠ, এসব তো ছিলো তাদেরই রাজত্ব। ভবানী পাঠকের মানুষ তারা, তার হুকুমে যুদ্ধ করেছে কোম্পানির গোরাদের সঙ্গে। কোম্পানির কামানের গোলায় ভবানী পাঠক দেহ রাখলো মানাস নদীর জলে, তার দলের লোকজন সব ছিটকে পড়লো এদিক ওদিক। কেন, কেরামত এতো ঘুরেছে, সে কি মাহীখালির জমিদার বুলন গিরি গোঁসায়ের নাম শোনে নি?—ওই লোকটার ঠাকুর্দার বাপ না-কি তারও ঠাকুর্দা,-কোন শালা তার খবর রাখে,-সে ছিলো ভবানী পাঠকের লাঠিয়াল। ওই শালাকে ঠাকুর ন্যস্ত করেছিলো বৈকুণ্ঠের ঠাকুর্দার ঠাকুর্দার বাপ, না-কি তার বাপের হাতে, তা ওই নেমকহারামটা কোম্পানির কোন ম্যাজিস্টরের হাতে পায়ে ধরে জমিদারি হাতিয়ে নিয়ে গোরাদের চাকর বনে গেলো। আর বৈকুণ্ঠের ঠাকুর্দার ঠাকুর্দা, না-কি তার বাপ, না-কি তারও ঠাকুর্দা—সেই সন্ন্যাসী সরে পড়লো সেরপুরের দক্ষিণে। সেখানে তখন ঘন জঙ্গল, বাসিন্দাদের মধ্যে এক বাঘ আর সিংহ আর জংলি হাতির পাল। জঙ্গল সাফ করে, বাঘ সিংহ মেরে হাতিগুলোকে নিজেদের বশ করে তারা জোত করলো, জমি করলো; আখুন্দিয়া, মীর্জাপুরে তাদের বিঘা বিঘা জমি। বৈকুণ্ঠের ঠাকুর্দার সম্ভাইদের চক্রান্তে তার বাপ গরিব হয়ে গেলো, বাপ মরলে বৈকুণ্ঠ হলো ঘরছাড়া। সে এখন তেলি সাহাদের গদিতে সামান্য চাকরি করে খায়। তারা হলো সন্ন্যাসী, তাদের ক্ষত্রিয় ধর্ম, জাতে সন্ন্যাসী। তার আজ এই হাল!তবে এখানে সে পড়ে আছে কি এমনি এমনি? সে আজ মামলা করে তো তার জ্ঞাতিরা কালই বাপ বাপ করে তার জমি জিরেত সব। তাকে ফিরিয়ে দিয়ে যাবে। এখানে থাকার কারণ আছে। অন্য কারণ আছে।
