ভেতর থেকে চাপা গোঙানি বারান্দা ও বাড়ির সামনের ছোটো উঠানের নোনা বাতাসকে ভারী করে তুললে তমিজ দরজা দিয়ে উঁকি দেয় ভেতরে। সারা গায়ে কাঁথা জড়িয়ে মাচায় শুয়ে রয়েছে কুলসুম। কান্না চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টায় তার শরীর কুঁকড়ে কুঁকড়ে আসছে।
বারান্দা থেকেই বৈকুণ্ঠ বলে, ও কুলসুম, কান্দিস না, কান্দিস না, খায়া লে। ঠাকুদ্দা কি কারো সারা জেবন থাকে রে দিদি? তার গলা ভারী হয়ে আসে এবং ভারী গলায়, সে এবার দেয় অন্যরকম নির্দেশ, কান্দ, বুক খুল্যা কান্ রে দিদি, পরান ভরা কান্। খবরটা শোনার পর থ্যাকা তো কথাই কলু না। এখন ক্যান্দা বুকটা হালকা কর। কান্দ।
কুলসুম বৈকুণ্ঠের কোনো নির্দেশই মানে না। সে থামেও না, আবার প্রাণ খুলে কাদার কোণো লক্ষণও তার নাই। তমিজের বাপ চুপচাপ হ্রকা টানে। বাইরের উঠানে রোদ পড়ে আসার সাথে ঘরে বারান্দায় শীতশীত করে। ডোবার ওপারে রাস্তায় লোকজন খুব কম। রাস্তার ওপারে ধানশূন্য মাঠ আকাশ পর্যন্ত যেতে যেতে হাপশে গিয়ে ঢুকে পড়েছে শেষ বিকালের খাপের ভেতরে। অকাশও এখন ঝাপসা।
কেরামত আলি আস্তে আস্তে বলে, ফকির কয়, কেরামত, করতোয়ার পুবে ছয় কোশ পথ গেলে গোলাবাড়ি হাট, হাটের দক্ষিণে কোশখানিক হাঁটলেই গিরিরডাঙা গাঁও। হামার লাতনি থাকে, হামাক বড়ো মায়া করিছে গো। কোনোদিন যাও তো হামার খবরটা দিও। একটু থেমে সে ফের বলে, তমিজের বাপের কথা কয়, জামাই সাধাসিধা মানুষ। গাঁয়ের মানুষ কয় আবোর, হাবা। হলে কী হয়, তার মধ্যে জিনিস আছে, ছাইচাপা আগুন। এই বারি দম্পতি সম্বন্ধে চেরাগ আলি ফকিরের শেষ মন্তব্য জানিয়ে কেরামত মাথা নিচু করে বসে থাকে। তার এই সব কথার ঝাপটায় কুলসুমের গোঙানি পায় মিহি কান্নার গড়ন, সে একটানা কেঁদেই চলে। দাদা তো তার বহুদিন। চোখের আড়ালে। সে কতোকাল হয়ে গেলো! তার ছেঁড়াখোঁড়া ওই কী ছাইয়ের বইটার গন্ধ ছাড়া তার আর কিছু ছুঁয়ে দেখার সম্ভাবনাও তো ছিলো না। সেই দাদার মরার খবর শুনে কুলসুমের নাক চোখমুখ একবারে কোচকালো না পর্যন্ত। খবরটা নিয়ে-আসা কেরামত আর কেরামতকে সঙ্গে নিয়ে-আসা বৈকুণ্ঠকে পেট ভরে খাওয়াবার পর ঘরের মাচায় উঠে দাদার বইয়ের গন্ধ বুক ভরে নিতে নিতে নাক ভিজে আসে, তারপর ভেজে তার চোখ। তখন নাকের জলে চোখের জলে ড়ুবে প্রথমে তার গলায় আসে গুনগুন ধ্বনি, বৈকুণ্ঠের কথায় সেই গুঞ্জন এখন টানা কান্নার স্রোত হয়ে বাড়ির বাইরের উঠানের ধারে বসা মানুষগুলোকে ভিজিয়ে দিতে শুরু করেছে। বৈকুণ্ঠ গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের গলা শুকাতে চেষ্টা করে বলে, ফকিরের একটা গান ধরো না বাপু!
মরার আগে ফকির একটা গান কয়দিন খুব করলো। ভালো মনে নাই। কেরামত দোনোমনো করলে বৈকুণ্ঠ মিনতি করে, মনে করা গাও গো। তুমি আরম্ভ করলে হামি : বাকিটা তোমাক মনে করায়া দিমু। ফকিরের ব্যামাক গানই হামি জানি।
চেরাগ আলি ফকিরের শেষ গান মনে করার জন্যে কেরামত আলি ধ্যানে বসার মতো সোজা হয়ে বসে চোখ বন্ধ করে থাকে। তার এই ধ্যান মূর্তিতে আর তিনজনে একেবারে চুপ করে যায় এবং এই নীবরতার সুযোগে কুলসুমের একটানা কান্না চেপে বসে গোটা বাড়িতে, বাড়ির সামনের ডোবা এবং ডোবারও ওপারে রাস্তা, রাস্তা ডিঙিয়ে শেষ বিকালের ধানকাটা জমিও সেই কান্নার কবজা হয়ে একটি অখণ্ড পিণ্ডের আকার নেয়। একটু একটু ভয়ে এবং অনেক অনেক আশায় তমিজের বাপ তাকায় ওপরের দিকে : মুনসির বেড়জাল কি আজ সন্ধ্যা না লাগতেই ছড়ানো শুরু হয়ে গেলো? বিলের গজার মাছগুলো কি ভেড়া হয়ে ভাসতে ভাসতে ডাঙায় উঠে গুটিগুটি পায়ে চলে আসবে এই গিরিরডাঙা গায়ে? কিন্তু তার আগেই কুলসুমের কান্নার স্বর ফুটে ওঠে কেরামত আলির গলায় :
গোল করিও না তোমরা ফকিরে ঘুমায়।
ও ও ও ও গোল করিও না তোমরা ফকিরে ঘুমায়।।
গানের সুরে তাল দিয়ে ঘরের অন্ধকার ভেতর থেকে ওঠে দোতারার টুংটাং। কেরামতের বিরল সুর এতে ছক পায়, ঘাড় ঝাকাতে ঝাকাতে সে গায়, গোল করিও না তোমরা ফকিরে ঘুমায়।
কিন্তু দোতারা বাজাচ্ছে কে? এখানে দোতারা বাজাবে কে মনে হতেই তার গলা শুকিয়ে আসে ভয়ে। বৈকুণ্ঠ তার সঙ্গে গলা মেলাচ্ছিলো, কিন্তু কেরামত থামতেই তার স্বরও থমকে পড়ে। এতে গান কিন্তু থামে না। চেরাগ আলির মোটা গলায় গান শোনা যায় ঘরের ভেতর থেকে। তমিজের বাপ ও বৈকুণ্ঠ মাথা নিচু করে থাকে, বহুকাল পর চেরাগ আলীর গলা শুনে দুজনেই চোখের পানিতে একাগ্রচিত্ত হয়। আর উসখুস করে কেরামত আলি। চেরাগ আলি আসবে কী করে? এরা কি তার মরণের খবরটা অবিশ্বাস করছে? কেরামত নিজেও ধন্দে পড়ে, তা হলে পাঁচবিবির উত্তরে নাজির মণ্ডলের বাড়ির পালানে সে দাফন করে এসেছে কার লাশ? সেই মানুষকে গান গাইতে শুনে কেরামতের চোখে গাঁথা হয়ে যায় পাঁচবিবি স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে গাইতে গাইতে আস্তে করে বসে-পড়া চেরাগ আলি, বসতে বসতে তার গানের লয় ধীর হয়। প্ল্যাটফর্মেই শুয়ে পড়ার ঘণ্টা দুয়েক পর চেরাগ আলি মরলো, কেরামত ঠিক ওই সময়ে গিয়েছিলো ভাত খেতে। কিন্তু চেরাগ আলি মারা গেছে তার হাতের ওপর মাথা রেখে এটা বলতে বলতে এমন হয়েছে যে, কখনো ঘুমের মধ্যে নিজের ডান হাতের তালুতে তার ভার ভার ঠেকে। এটা চেরাগ আলির মাথার ভার ছাড়া আর কী? কিন্তু এখন তার হাত একেবারে খালি। কারণ ঘরের ভেতর মাচায় বসে মোটা গলায় ধীর লয়ে গান করে চলেছে চেরাগ আলি ফকির। ওটা কি চেরাগ আলি? না-কি তার নাতনি কুলসুম? কুলসুম। যদি হবে তো দোতারা বাজায় কে?—এইসব খটকার খোঁচায় খোঁচায় গানের কথা, গানের সুর, লয় ও তাল আরো স্পষ্ট হতে থাকে।
