তমিজ ফুলজানকে অকারণে উঁচু গলায় হুকুম দেয়, কাল ডাক্তারের কাছে যাওয়া লাগবি কলাম। ব্যায়না ব্যায়না মেলা না করলে ডাক্তারের সাথে দেখা হবি না।
নিজের মেয়ে ও তমিজের এরকম ঠাস ঠাস কথায় হুরমতুল্লা একটু ধান্দায় পড়ে। উঠানে হাঁটু ভেঙে বসে সে তমিজকে বলে, তুই না হয় তোর ভিটার সাথেকার জমিটার কথা ক। মণ্ডলের হাতেপায়ে ধরলে ওই জমিটা তোক বর্গা দিবার পারে।
মণ্ডলের পায়েত পড়ার হামার দরকার নাই। মণ্ডল হামাক বস্যা খাওয়াবি?
হুরমতুল্লা নরম হয়ে পড়ে, তা বাপু হালগোরু না থাকলে জমি বর্গা করার ক্যাচাল কম লয়। মণ্ডল কলো, তোক বলে হামার সাথে কামলা খাবার দিবি। আমার তো মানুষ লাগে না। আমার বেটিগুলাই-
এবারে দপ করে জ্বলে ওঠে তমিজ, উগলান ফন্দি ছাড়ো বুড়ার বেটা। গিরস্থের ঘরের বৌ বেটি জমির মধ্যে গতর খাটায় এটা খুব ভালো কথা হলো? বেটিক তুমি আর জমিত খাটাবার পারবা না কয়া দিলাম।
হনহন করে হেঁটে বিলের কাছাকাছি এসে তমিজ ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় উত্তরের দিকে। বিলের সিথান এখান থেকে দূরে নয়, মোষের দিঘি ঘুরে ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে এগোলে কাছেই পড়ে। ওইখানে পাকুড়গাছ থেকে মুনসি গোটা বিল নিয়ে আসে তার হাতের বেড় জালের ভেতর। বিলের গজার মাছগুলোকে ভেড়ার আদল দিলে তামাম রাত ধরে হাবুড়ুবু খেতে খেতে সাঁতার কাটে তারা, ভোর হওয়ার আগে আগে। তাদের নিজেদের সুরত ফিরিয়ে দিলে দিনমান তারা পাহারা দেয় পানির অনেক নিচে। তাদের চোখে চোখে বড়ো হয় রুই কালা, শোল, শিঙিমাগুর, ট্যাংরা পাবদা, খলসে পুঁটি। মুনসি তখন কী করে গো? বিলের শিওরে পাকুড়গছের মগডালে শকুনের চোখের মণি হয়ে ছুঁচলো চোখে সে সুরুজের আকাশ পাড়ি দেওয়া দেখবে, দেখতে দেখতে রোদের মধ্যে রোদ হয়ে বিলের পানিতে শুয়ে ওম দেবে বিলের গজার আর রুই কাৎলা। আর শোল আর শিঙিমাগুর আর কৈ আর পাবদা ট্যাংরা আর খলসে পুঁটির হিম শরীরে। আর? আর কী করবে? হয়রান হয়ে পড়লে পাকুড়গাছের ডালে ঘন পাতার আড়ালে হরিয়াল পাখির ডানার নিচে লোমের ভেতর ছোটো লোম হয়ে পাখির নরম মাংসের ওমে টানা ঘুম দেবে একেবারে সন্ধ্যাবেলা পর্যন্ত।
তা মুনসির কি এখন দিনের পর দিন ধরে ঘুমের আসর চলছে? মণ্ডলের বছর কামলার মতো সে কি মাসকাবারি ঘুমের চুক্তি নিলো নাকি গো? তমিজের একবার জেদ হয়, হেঁটে হেঁটে এখনি সে চলে যায় পাকুড়তলার দিকে। পাকুড়গাছে জোরেসোরে ঝাকুনি দিয়ে মুনসির মরণের ঘুমটা ভাঙিয়ে দেয়। মোষের দিঘি পেরিয়ে সত্যি সত্যি ঝোপঝাড় জঙ্গল পেরিয়ে সে পাকুড়গাছ খুঁজতে লাগলো। এতো গাছ, বড়ো ছোটো এতো গাছ, গাছের ওপারে, জঙ্গলের ওপারে কাশবন। কাশবন পর্যন্ত এসেও সে পাকুড়গাছ আর সনাক্ত করতে পারে না। তখন তার গা শিরশির করে। গা ছমছম করে। নাঃ। সে বেশ হাপসে যায়। কিন্তু তমিজ পাকুড়গাছ চিনতে পারবে না, তা কী করে হয়? সে ফের এদিক ওদিক তাকায়। পাকুড়গাছ তা হলে কোনদিকে?
২২. তোর জন্যে দেরি
তোর জন্যে দেরি করবার পারনু না রে তমিজ। বেল গেছে কুটি, তোর বাড়িত আসার সময় হলো এখন?
কথা বললে বৈকুণ্ঠের মুখের সামনে চিবানো মুড়ির কুয়াশা ওঠে। ধুতির কোঁচড় থেকে হাতের মস্ত মুঠি ভরে সে মুড়ি তোলে, মুখের ভেতরে মুড়ি ফেলতে ফেলতেও কথা বলা তার থামে না, কথা বলতে বলতেই মাটির ওপর কলাপাতায় রাখা গুড়ের টুকরা তুলে নেয় ডান হাতে।
ডোবার উরুপানিতে কোনোমতে একটা ড়ুব দিয়ে তমিজ ভেতরের বারান্দায় কেরামতের পাশে বসে আড়চোখে তাকায় বৈকুণ্ঠের দিকে : কাল অনেক রাত্রি পর্যন্ত মুড়ি ভাজছিলো কুলসুম, শালা গিরির বেটা এসেছে সেগুলোর সদগতি করতে। আবার তার পাশেই কেরামত আলি; তমিজের বাপ তার পাতে থাবা থাবা ভাত তুলে দিচ্ছে হাঁড়ি থেকে। এতো ভাত! এতো মুড়ি!-তার জমির ধানটা তো মনে হয় এরাই শেষ করবে। ওদিকে তমিজের বাপের মুখ তো বন্ধই, পাতের কোণে খলসে মাছের দিকে নজর দিয়েই সানকি সানকি ভাত সে উজাড় করে ফেলবে। এরকম পেটে পেটে ধামা ধামা চাল চালান হয়ে গেলে তমিজের গোরুই বা হয় কোথেকে, আর হালই বা সে কেনে কী করে? রাগটা সে ঝাড়ে কুলসুমের ওপর যখন সে দফায় দফায় তার পাতে ভাত তুলে দেয়, ভাতগুলো সব খেতে খেতেই তমিজ ধমকে ওঠে, কতো ভাত দাও গো? মানষে বলে এতো ভাত খাবার পারে? এতে অবশ্য তমিজের বাপের কি কেরামত আলির ভাত গেলা কিংবা বৈকুণ্ঠের মুড়ি চিবানোের ব্যাঘাত ঘটে না।
খাওয়া দাওয়ার পর বৈকুণ্ঠের জর্দার নেশা-ধরা গন্ধে ছোটো বারান্দাটা আরো চাপা হয়ে আসে। এমন কি ছোটো উঠানটাও উঠে আসে ধানের তুষের গন্ধ নিয়ে। তারপর তমিজের বাপের ঘরটাও এই বারান্দায় আসন পাততে চাইলে তমিজের পা ছুঁয়ে যায় কেরামতের হাটুর সঙ্গে। তমিজের পা শিরশির করে : লোকটা কাল সকালে হুরমতের বাড়ি গিয়ে তার বৌয়ের সঙ্গে কথা বললেই তো তমিজের জলজ্যান্ত মিছা কথাগুলো সব ফাঁস হয়ে পড়বে। তারপর তমিজ ফুলজানের সামনে আর যাবে কী করে?
এবার তুমি একটা গান ধরো বাপু! না হয় ফকিরের গানই করো। বৈকুণ্ঠের কথার শেষ দিকটা বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাসের ভেতর দিয়ে, ফকির নাই! ফকিরের গান আর কুনোদিন শুনবার পারমু না গো! তার দীর্ঘশ্বাসে পানির ঝাপটা; নোনতা হাওয়া বইয়ে দিতে দিতে সে বলে, সারাটা জেবন হামরা ঘুরিছি ফকিরের পাছে পাছে। আর তাই মরলো তোমার হাতের উপরে। ভগবানের লীলা!
