ফুলজান বড়ো মালসা আর কলসিভরা পানি আর বদনা নিয়ে এলে ছেলেটিকে কোলে নিয়ে তমিজ বসে মাটিতে। ফুলজান কিছুক্ষণ তার মাথায় পানির ধারা দেওয়ার। পর ছেলেটি চোখ মেলে কাঁদতে শুরু করলে তমিজের ইশারায় ফুলজান তার মাথায় পানি ঢালতেই থাকে। কলসির পানি শেষ হলে তমিজের ইশারাতেই পানি ঢালা সে বন্ধ করে এবং তার মাথা মুছে দেয় আঁচল দিয়ে। তমিজ নিজেই তাকে মাচার বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বেশ ভারী গলায় বলে, জ্বর কমিছে। কালই ডাক্তারের কাছ লিয়া যামু। ব্যায়না মেলা করা লাগবি।
ফুলজানের বেটা বোধহয় এখন একটু আরাম পাচ্ছে, কিংবা খুব দুর্বল হয়ে গেছে। বলেও হতে পারে, কিছুক্ষণ ঘ্যানঘ্যান করে ঘুমিয়ে পড়ে। তমিজ হুকুম ছড়ে, ছেলের জাড় করিচ্ছে, বুঝিস না? তোক একখান এ্যাপার দিছিনু, সেটা কোটে? র্যাপার কথাটির শুদ্ধ বা অশুদ্ধ কোনো রূপের সঙ্গেই পরিচিত না থাকায় কিংবা সেটা হয়তো নবিতন নিয়ে গেছে মামাবাড়িতে সে জন্যেও হতে পারে, বেটার গায়ে সে বিছিয়ে দেয় নবিতনের ফুল-তোলা একটা কাঁথা। কথা জুড়ে ছড়ানো ছোটো ছোটো ফুল তমিজ দেখছে, এমন সময় ড়ুকরে কেঁদে ওঠে ফুলজান, একটা ওষুদ লয়, পানি-পড়া লয়, ছোল হামার এমনি এমনি মরে? কেউ দেখলো না!
কান্দিস কিসক? তমিজ হঠাৎ তাকে ধমক দিয়ে ওঠে, কান্দনের কী হলো? বাপের বাড়িত বান্দি হয়া আছু, বেটার চিকিচ্ছা করবু ক্যাংকা কর্যা? তমিজের এই। সান্ত্বনা-কাম-ধমকে ফুলজান ফোঁপানো ছেড়ে ড়ুকরে কাঁদতে শুরু করে। কাঁদতে কাঁদতে বলে, হামার কপাল মন্দ। হামার নসিব মন্দ। ছেলের বাপ থ্যাকাও নাই। একটা দিন খবর লেয় না মরলো কি বাচলো!
তোর সোয়ামির কথা কোস? সোয়ামি তোর আছেই? আরে তাই তো গান করা বেড়ায়, তুই খপর আখিস না? আজ এই হাট কাল ওই হাট করিচ্চে, এটি আসে নাই?
ফের ফোঁপানিতে ফিরে এসে ফুলজান এবার কান্না থামায়। কেটা কলো? মিছা কথা কও কিসক? ফুলজান কেরামতের খবর জানে এটা অনুমান করতে তমিজের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তবে ফুলজানের এই ছোট্টো ভাণটুকু ভারী মিষ্টি। বেশ আত্মবিশ্বাসী কিসিমের একটা খুচরা হাসি ছেড়ে তমিজ বলে, মিছা কথা কয়া হামার লাভ? আরে কালই তো গোলাবাড়ি হাটোত দেখা, তোমার কথা কয়, ওই বিয়া তো হামার তালাক হয়া গেছে। হামি কনু, বেটাক তো আর তালাক দিবার পারো না। বেটার তোমার কঠিন ব্যারাম, দেখবার যাবা না? তো চুপ করা থাকে। হাটের মধ্যে সোগলির সামানেই কথা হলো!
তমিজের দিকে চোখ বড়ো করে তাকিয়েফুলজান মাথা নিচু করলে ওই চোখ দিয়ে তার পানি পড়ে টপটপ করে। তমিজ তৎপর হয়ে দুই হাতে ফুলজানের চোখের পানি মোছে, মুছেই চলে। চোখের পানি এরকম পড়তেই থাকলে সে আর হাত সরায়। কী করে? হাত ওভাবে রেখেই বলে, সারাটা জেবন তুই বান্দিগিরিই করবু? তোের বিয়া বসা লাগবি না? ফুলজান দ্বিগুণ বেগে কাঁদতে শুরু করলে তমিজ তার গোটা। মাথাটাকেই চেপে ধরে নিজের বুকে, তারপর চুমু খেতে থাকে তার মোনতা গালে ও নোনতা চোখে, এমন কি তার ঘ্যাগ হয়ে বুক পর্যন্ত। চুমুর এমন প্রবল বর্ষণে ফুলজানের শরীর এলিয়ে পড়ে মাচার ওপর তার ছেলের গা ঘেঁষে। তোর বেটা তো হামারও বেটাই হবি, তখন তার দ্যাখশোন হামিই করমু। কাঁপতে কাঁপতে তমিজ বলে এবং নিজের কথায় তার নিজের শরীরের কাঁপুনি আরো বাড়ে। কাঁপুনি ঠেকাতেই তাকে শুয়ে পড়তে হয় ফুলজানকে জড়িয়ে ধরে।
ফুলজান তাকে ঠেকাতে একটু চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত পারে না, সে নিজেও খুব কাঁপছিলো। তার বেটার ঘুম ভেঙে যায়, সে কঁকিয়ে কঁকিয়ে কাঁদে। ফুলজানের সারা শরীর জুড়ে তখন মাঝির বেটার গতরের দাপাদাপি; তার নাক তো বটেই, তার চোখ, কান, মুখ, গলা, ঘ্যাগ, বুক, পেট, উরু, পা ও পায়ের পাতা, পিঠ, পাছা প্রভৃতি অঙ্গে মাঝির বেটার গতরের আঁশটে গন্ধ।
তমিজ উঠে দাঁড়ালেও ফুলজান শুয়ে শুয়েই ছেলেকে টেনে নেয় বুকের ভেতর। তমিজ বলে, তোর বাপোক কই? আজই কই? তমিজ জানে কাজটা একটু কঠিন। অথচ বুড়া পরামাণিক বোঝে না, তাকে জামাই করলে হুরমতুল্লার সব জমিতে সে যে খন্দটা তুলবে বুড়া জীবনে তা স্বপ্নেও দেখে নি।
বাইরে শোনা যায় হুরমতুল্লার কাশির আওয়াজ। কাশতে কাশতেই সে গোরুর পেট এতো বেলা পর্যন্ত খালি কেন তার কৈফিয়ৎ তলব করছিলো মেয়ের কাছে। তমিজ তাড়াতাড়ি উঠানে নামে এবং হুরমতুল্লাকে প্রায় অভ্যর্থনা করতে এগিয়ে যায় শুকনা কলাপাতার পর্দা পর্যন্ত।
ক্যা গো, তুমি আসিছো? হামি বলে কতোক্ষণ ধরা তোমার জন্যে দেরি করিচ্ছি। তমিজের গলা শুকনা, কিন্তু খামাখা উঁচু গলায় কথা বলায় সেখানে খরার দুপুরবেলার গরম হাওয়া বয়।
মণ্ডল ছাড়বার চায় না, দেরি হয়া গেলো। হুরমতুল্লা বলতেই তমিজ জিগ্যেস করে, জমির বন্দোবস্ত লিবার জন্যে মণ্ডলের পাও ধরবার গেছিলা, না?
হামি যামু কিসক? মণ্ডলই হামাক ডাকিছে। মণ্ডল ধরিছে, ওই জমি এবার বর্গা করাই লাগবি। এখন জোতদারে একটা কথা কলে তো আর ফালাবার পারি না। প্রসঙ্গ পাল্টাতে ভেতরের দিকে তাকিয়ে অতিরিক্ত জোরে বলে ওঠে, ক্যা রে ফুলজান মরিছু? এঁড়াটার প্যাট ওঠে নাই কিসক?
বেটা কোলে ফুলজান বেরিয়ে এসে বলে, ছোল হামার মরবার ধরিছিলো। আর কোনো ব্যাখ্যা কি গোরুর প্রতি অবহেলার জন্যে কৈফিয়ৎ দেওয়ার কোনো চেষ্টাই সে করে না।
