তমিজের সব ক্ষোভ আর কষ্ট চাপা পড়ে তীব্র উৎকণ্ঠায়, তুমি কি আবার কাৎলাহার বিলত যাচ্ছো মাছ ধরবার? মণ্ডল তোমার ঠ্যাং দুইটাই ভ্যাঙা দিবি না?
বাপের জোড়া ঠ্যাং ভাঙার সম্ভাবনাতেই তমিজের অবসাদ কাটে, মণ্ডলের লাঠিতে বাপটা তার যদি সত্যি সত্যি পড়ে যায় তো সেই এক বাড়িতেই সে নিজেও ছিটকে বেরিয়ে আসতে পারে শরাফতের কবজা থেকে। আবার ওদিকে বেড় জালের ভেতর দিয়ে বাঘাড় মাছের তেজ যেন ঢুকে পড়েছে তমিজের বাপের গতরে, সেই তেজে ছোটে তার মুখ, কাৎলাহার বিল ছাড়া দুনিয়াত আর পানি নাই? দুনিয়ার ব্যামাক পানি কি মণ্ডলের বেটা একলাই দখল করিছে? বাঙালি নাই? যমুনা নাই? পশ্চিমমুখে করতোয়া নাই?
একনাগাড়ে এতো কথা বলে তমিজের বাপের চোখে ঢুলুনি নামে, সেই দুলুনিতেও তেজ তার কমে না, ধান যা লিয়া আসিছু, বেচলে কয়টা মাসের খোরাক হয় রে? তার গর্জন ক্রমে ক্রমে নেমে আসে বিড়বিড় ধ্বনিতে, পোড়াদহ মেলাত যদি একটা বাঘাড় তুলবার পারি তো। বাক্য অসমাপ্ত রেখেই একটু উঁচু গলায় জিগ্যেস করে, মণ্ডল তোক এবার বর্গা তো দিচ্ছে না। কামলাই খাটবু?
মণ্ডলের পেটের খবর বাপ পায় কী করে? বুড়া গত রাত্রে কি বিলের সিথানে গিয়েছিলো? পাকুড়তলা থেকেই কি সে এতো তেজ নিয়ে এসেছে গতর ভরে? তা বুড়ার সাথে মুনসির এতো খায়খাতির তো মুনসিকে দিয়ে সে মণ্ডলের মনটা একটু ফেরাতে পারে না? রাতভর বিলের ধারে ধারে এতো হাঁটাহাঁটি করে তমিজের বাপের ফায়দাটা। হলো কী? বর্গা জমিটা তার বেহাত হয়ে গেলো, বুড়া কি মুনসিকে খবরটা জানাতে পারে না?-শূন্য জমি যে দিনরাত তমিজের জন্যে আহাজারি করছে, মুনসি কি তার কিছুই শুনতে পারে না? জমির নিশ্বাসে কি মুনসি এতোটুকু সাড়া দিতে পারে না? তো সে কিসের মুনসি?
দুপুরবেলা নিজগিরিরডাঙায় মোষের দিঘির পাশের সেই ধান-কাটা জমি গা এলিয়ে দিব্যি উদাম গা পোহায়। পাশে হুরমতুল্লার মরিচখেতের সবুজ ও লাল আভায় এই জমির গা কি একটুও কঁপে? ছটফট করে বরং তমিজ। হুরমতুল্লাকে হাতে পায়ে ধরে মণ্ডলকে বলিয়ে তমিজ কি এবারের মতো, শুধু এবারের মতো হালগোরু ছাড়া জমিটা বর্গা পেতে পারে না?
কিন্তু হুরমতুল্লার বাড়িতে লোকজন কোথায়? শুকনা কলাপাতার পর্দার বাইরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে তমিজ অনেকক্ষণ পর শুনতে পায় শিশুকণ্ঠের কোঁকানি। গলা খাঁকারি দিয়ে সে ভেতরে ঢুকলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ফুলজান। ছেলেটির গলা থেকে ক্ষীণ কোঁকানি বেরিয়ে বাড়িটিতে আরোপ করেছে ধূ ধূ করা মাঠের ছন্দ। হুরমতুল্লাকে তমিজের খুব দরকার,-এই ব্যাপারটি আড়ালে পড়ে যায়। তমিজের বুক ধুক ধুক করে, বাড়িতে আর কেউ নাই?
মাঝির বেটা, ছোল হামার বুঝি আর বাঁচে না গো?
তার এই উৎকণ্ঠায় সাড়া না দিয়ে কিংবা ভালো করে সাড়া দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে তমিজ জিগ্যেস করে, তোমার বাপ কোটে? নবিতন কোটে? মাও?
বাজান গেলো মণ্ডলবাড়িত। বাজান মনে হয় বিল পার হয়ই নাই, ছেলের হামার বমি আরম্ভ হলো। বমি এখন থামিছে, সখন থ্যাকা খালি ক্যামা কোকাচ্ছে। লাকোত বিশ্বাস মনে হয় নাই।
নিশ্বাসবিহীন প্রাণীর পক্ষে কোনো সম্ভব নয়, শিশুটির জীবন সম্বন্ধে তমিজ নিশ্চিন্ত। শূন্য রান্নাঘর ও শূন্য উঠানের দিকে দেখে তমিজ শিশুটিকে ঘাড় ঝুঁকিয়ে দেখে, কপালে হাত দেয়, গালে হাত বুলায় এবং প্রায় ডাক্তারেদের মতো করে বলে, না। ভালো হয়া যাবি। চ্যাংড়াপ্যাংড়ার বমি ওংকা হয়ই। তোমার মাও কোটে? নবিতন বাড়িত নাই?
হামার বড়োমামু আসিছিলো, মায়েক লিয়া গেলো, সাথে গেলো নবিতন আর ফালানি। তার ছেলে সম্বন্ধে তমিজের বিজ্ঞ বিজ্ঞ কথায় ফুলজান হয়তো আশ্বস্ত হয়েছে, নাইওর লিয়া গেলো। দুইদিন বাদে পোড়াদহের মেলা লয়? মামু কয়, তোমার জামাই তো আর আসবি না। ফুলজানের বাপ হামাগোরে বুড়া জামাই, তাই লিবার আসিছি।
পোড়াদহের মেলা উপলক্ষে একজন প্রবীণ জামাইয়ের শ্বশুরবাড়িতে আমন্ত্রিত হবার খবরে তমিজ কিন্তু হাসে না। কিন্তু অস্পষ্ট খুশির ঝিলিক ওঠে ফুলজানের ঠোঁটে, এই আবছা হাসির হালকা টোকায় বিমারি বেটার জন্যে জমে-ওঠা অশ্রু ফুটে ওঠে। গোল বিন্দুতে এবং তমিজ একটু লাই পায়, পোড়াদহের মেলা পাড়ি দিয়া আসবি? তুমি যাও নাই যে?
এই রুগ্ন ছেলেকে নিয়ে ফুলজান যেতে পারে নি, তাকে একা রেখে বাপজানই বা যায় কী করে? এইসব জানাতে জানাতে ফুলজানের অশ্রু বিন্দুটি গড়িয়ে পড়ে গালে, কিন্তু শুকিয়ে যায় না। বাড়িতে ফুলজান আর তার ছেলে ছাড়া আর কেউ নাই, এটা। জানার পর বাড়ির নির্জনতা সম্বন্ধে নিশ্চিত হলে শুরু হয় তমিজের নতুন উদ্বেগ : এই . নির্জনতা কি তাকে কোনো সুযোগ নেওয়ার দায়িত্ব চাপিয়ে দিলো?-এই বাড়িতে তার আবার দায়িত্ব কী? এখন কী করবে তমিজ? হুরমতুল্লা তার জমি হাতিয়ে নিচ্ছে, ফুলজানকে বলে লাভ কী? তা হলে? ফুলজানকে কিছু একটা বলতে তো হবে। কী বলবে?—এই দমবন্ধ দশা থেকে তাকে বাঁচায় ফুলজানের বেটা, হঠাৎ সে বমি করে ফেলে মায়ের কোলেই। তার বমি নিঃশব্দ, যেন তরল কিছু জিনিস মুখ থেকে ফেলে দিলো আলগোছে। তারপর মাথাটা এলিয়ে দিলো মায়ের কোলে, যেন বাঁচার জন্যে। চেষ্টা করার শক্তিই তার নাই।
বেহুঁশ হয়া গেলো? দেখি দেখি! বলতে বলতে ছেলেটিকে নিজের কোলে তুলে .. নেয় তমিজ। ফুলজানের বেটার বেঢপ পেট আরো ফুলে উঠেছে, চোখজোড়া খুঁজে গেলেও দুই চোখের পাতায় একটু ফাঁক রয়েই গেছে, চোখ বন্ধ করার ক্ষমতাও তার লোপ পেয়েছে। তার গালের কালচে হলুদ রঙ আরো গাঢ় হয়েছে, পাটের আঁশের মতো। চুল সব মাথার খুলির সঙ্গে লেপটানো। তমিজ ওই বমির লালা লাগা গালে গাঢ় একটি চুমু খায়। গাল বেশ গরম, তমিজের ঠোঁটে যেন ছ্যাকা লাগে। তার গরম নিশ্বাসে তমিজের মাথার জট কাটে, ফুলজানের বিলাপের জবাবে সে ধকম দিয়ে বলে, ছোলের জ্বর উঠিচ্ছে, মাথাত পানি ঢালা লাগবি, ভাণ্ড দে। বদনা লিয়া আয়।
