তো কী আর করে, তমিজ নিজেই একদিন আল্লা ভরসা করে মণ্ডলবাড়ি গিয়ে কাদেরের সামনে শরাফতের কাছে কারুবারু শুরু করে। শরাফত সরাসরি না করে দেয়, কাদের তো লিত্যি তোর কথা কচ্ছে। জাহেল মাঝি, হিসাব বুঝিস না। হিসাব করা দেখলে ধান তোক বেশি দেওয়া হছে। আর কাদের, তুমি একজন শিক্ষিত ছেলে হয়া এই সোজা হিসাবটা বোবঝা না?
তমিজের হয়ে কাদের বাপের সঙ্গে কথা বলেছে মোটে একবার। শরাফত বাড়িয়ে বললো, কাদেরের সম্মানটা এতে বাড়লো তমিজের কাছে, এই অতিরিক্ত সম্মানপ্রাপ্তির জোরে বুক ফুলিয়ে সে বাপকে বলে, বাপজান, পানি বাবদ খরচটা ধরেন কীভাবে? আর কামলার খরচ যা ধরিছেন।
মাগনা কোনো কিছু পাওয়া ভালো লয় বাপু। তুমি পানি সেচবা, পানিটা কার সেটা হিসাব করবা না? বিল কি আমি পয়সা দিয়া ইজারা লেই নাই?
কাদের জবাব না দিলে পানির ব্যাপারটা ফয়সালা হয়ে গেছে ধরে নিয়ে মণ্ডল আসে কামলার প্রসঙ্গে, তোমরাই না মিটিং করা কামলা কিষাণের কথা কও? কোরান হাদিসের কথা, মজুরের গায়ের ঘাম শুকাবার আগে তার পাওনা মিটায়া দাও। এখন। তুমি কামলাক পয়সা দিবার মানা করো কোন বুদ্ধিতে?
না না, বাপজান, কথা তো সেটা নয়। কিন্তু কথাটা যে কী তা বলতেও তার একটু দেরিই হয়। শেষপর্যন্ত অবশ্য বলতে পারে, ধান কাটার সময় তমিজের বাপ যখন আছিলো তখন আর কামলা নেওয়ার দরকার কী? তারপর ধরেন তমিজের বাড়িত যদি ধান ক্যাটা লিয়া আসা যায় তো ওর বাপ আছে, ওর সত্য আছে।
ওই জমির ধান ওরা বাপবেটা কাটলে এক সপ্তাহের কমে পারে না। ধান যেমন পাকিছিলো, অতোদিনে মেলা ধান নষ্ট হতো। বেশি কামলা দেওয়া লাগলো তাই। এ ব্যাপারটিরও ফয়সালা হলো, সুতরাং শরাফত তোলে পরের প্রশ্নটি, আর তমিজের বাড়িত ধান লিয়া গেলে সব ধানই নষ্ট হয়। তমিজের বাপ তো একটা আবোর মানুষ, আবার শয়তানের একশেষ, আর বৌটা ফকিরের বেটি; ধানের অরা বোঝে কী? হুরমতুল্লার বেটি কও, বৌ কও, হুরমতুল্লার লিজের কথাও কওয়া লাগে, সোগলি ফসলের কামই করে। ওই বাড়িত না লিলে এতো ধান বার হয়? কাদেরকে কিছুক্ষণ। কথা বলার সুযোগ দিতে শরাফত চুপ করে, তা সুযোগের সদ্ব্যবহার সে না করলে শরাফত ধীরেসুস্থে জানায়, হাজার হলেও তমিজ হলো মাঝির বেটা। আর কয়েকটা বছর চাষবাসের কাম করুক, তখন লিজেই সব বুঝবি। তা তুমি এই চ্যাংড়াটাক বুঝবার দাও, অর সাথে তোমার লাফ পাড়লে চলে?
লাফ পাড়ার সময়ও কাদেরের নাই। পোড়াদহ মাঠে সন্ন্যাসী মেলার আয়োজন শুরু হয়েছে, সেখানে মানুষ আসছে নানা জায়গা থেকে। ইসমাইল সাহেব আজ টমটমে। শিমুলতলা যাবে, যাবার পথে পোড়দহ মাঠে ঘণ্টাখানেক বসে লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলবে। গোলাবাড়ি থেকে তার সঙ্গে আসবে কাদের। ইসমাইল যাবে শ্বশুরবাড়ি, কিন্তু তার আসল কাজ হলো ওই বাড়ির প্রজা পার্টির সাপোর্টারদের লীগে ভেড়াবার চেষ্টা করা। শিমুলতলার মিয়াবাড়ি হাত করতে না পারলে ওদিকে ছোটোবড়ো কোন ঘর থেকে একটা ভোটও পাওয়া যাবে না।।
আবদুল কাদের চলে গেলে তমিজ একেবারে চুপ মেরে গেলো। শরাফত চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াচ্ছে দেখে তমিজের হঠাৎ ভয় হয়, মণ্ডলের সঙ্গে তার জীবনে আর কথা। বলার সুযোগ হবে না। মণ্ডলের পায়ের কাছে বসে সে হঠাৎ বলে, ওই জমিত হামি পিয়াজ করবার হাউস করছিলাম।
এই খন্দটা হুরমতুল্লা করুক। শরাফত সোজাসুজি বলে, তুই বাপু আগে হালগোরু কর। তার কাজের প্রশংসাও করে শরাফত, সে মেহনত করতে জানে, আল্লা তার পুরস্কারও দেয়। কিন্তু নিজের হালগোরু ছাড়া জমি বর্গা নিলে নানারকম ক্যাচাল হয়, দুই পক্ষেই সন্দেহ করে, তার প্রাপ্য ঠিক পাওয়া গেলো না।–মণ্ডল রাগ করে না, ধমক দেয় না, গালাগালি করে না, মুখও খারাপ করে না। নাতির মৃত্যুর পর সে বরং আরো নরম হয়েছে, নাতির চেহলামের পর কথাবার্তায় সবার সঙ্গে সে খুব বিনীত। কিন্তু তার স্বভাব ও ব্যবহারের বদল হয় আর তমিজের সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়ে, তমিজ–এখন তার দিকে ভালো করে তাকাতেও পারে না।
তবে তমিজের একটা ব্যবস্থা সে করে দেয়, তুই না হয় ওই জমিত বছরকামলা খাট। বিলের ওইপারে তো হুরমতুল্লা হামার মেলা জমি করিচ্ছে, কাম তোর একটা না। একটা হবিই। পিয়াজ রসুনের আবাদ করবার চাস, তো কর। মানা করিচ্ছে কেটা? হুরমতুল্লার সাথে থাকলে কামও শিখবার পারবু।
শরাফত মণ্ডলের এই নতুন বন্দোবস্তের কথা শুনে তমিজ একেবারে বসেই পড়ে, ধ্বসেও পড়ে বলা যায়। শরাফত সেটা আঁচ করে গলার আওয়াজ কমিয়ে গোপন কথা বলার ভঙ্গি করে, তুই থাকিস তো খন্দ উঠলে হুরমতুল্লা টাল্টিবাল্টি করবার পারবি না। আর বেটিটা তো শুনি জমিতই পড়া থাকে, ধামা ধামা পিয়াজ রসুন সরালে ধরবি কেটা?
প্রায় টলতে টলতে বাড়ি ফিরলো তমিজ। বাপের ওপর, কুলসুমের ওপর ঝাল ঝাড়তে পারলে তার টলোমলোটা কমে। কিন্তু কুলসুম তখন ধানভরা মাটির হাঁড়ি তুলে দিয়েছে উনানের ওপর, ধোঁয়ার আড়ালে দেখা যায়, তার চোখমুখে গালে চিবুকে ধানের সুখ সাঁটা রয়েছে মেচেতার দাগের মতো। এক পলক সেই দাগ দেখে নিয়ে তমিজ ঢুকলো বাপের ঘরে। বাপটা তখন বাইরে থেকে ঘরে ঢুকলো একটা বেড় জাল হাতে। তার চোখে ও দাড়িতে খুশির ছটা, উঠানে যেতে যেতে বলে, কালাম দিলো। অর বাপের আমলের জাল। কয়েক জায়গাত সুতা নাই, জোড়া দিলেই এই জালে আরেক জেবন চলবি।।
