কাদেরের ঘরের আলোচনাকে অগ্রাহ্য করে দরজায় দাঁড়িয়ে বৈকুণ্ঠ হাঁক দেয়, ও দাদা, দেখো। কোন মানষেক ধরা লিয়া আসিছি, দেখো। গুরুত্বপূর্ণ কথাবার্তার মাঝখানে এরকম উটকো কথায় কাদের বিরক্ত হয়ে তার দিকে তাকালে সে ফের প্রায় চেঁচিয়েই বলে, দাদা, হামাগারে লিজগিরিরডাঙার জামাই গো। তারপর কেরামতের। দিকে মুখ ফিরিয়ে সে একই স্বরে জানতে চায়, ও, সেই বৌয়ের সাথে তোমার তালাক হয়া গেছে না? তোমাগোরে জাতেত তো আবার মুখের কথাতই তালাক, মুখের কথাই লিকা।
জাত তোলায় লীগের কর্মীদের রাগ করার কথা। কিন্তু কাদের ভায়ের কাছে এই লোকটার সাত খুন মাফ। তবে বিরক্ত হয়েছে সবাই। বৈকুণ্ঠ তার শ্বশুরবাড়ির কথা বলায় কেরামত আলিও ভুরু কোঁচকায়। সে নিজেই এবার সবার কাছে নিজের পরিচয় নিবেদন করে, জে, আমার নাম কেরামত আলি, নিবাস পুবে, যমুনার পশ্চিমে, গায়ের নাম আতামারি!
কে যেন বলে, আতামারি? চরের মানুষ?
জে না। আমরা কায়েমি জায়গার মানুষ ছিলাম। আকালের সময় আমাদের এলাকার মানুষ সব মরলো, দশ আনা মানুষই শ্যাষ হলো। আকালে মানুষ খালো তো। ফাঁকা গাঁওখান গিললো যমুনা। আমাকে চরুয়া বলে হেলা করবেন না। মান্যজনের নিকট এই আমার নিবেদন।
তার হাত জোড় করে কথা বলা দেখে সবাই হাসে। সবচেয়ে বেশি হাসে বৈকুণ্ঠ, কেরামত আলির যাবতীয় কৃতিত্বে সে গর্বিত। বলে, যি সি মানুষ লয়, ফকির চেরাগ আলির সাগরেদ। নামেই চেনা যায়, গুরুর নাম চেরাগ আলি, শিষ্য হলো কেরামত আলি। শিষ্য এখন লিজেই ফকির হয়া দ্যাশ জুড়া গান কর্যা বেড়ায়।
জে না। আমরা ফকির নই। ফকিরি গান করি না। আমরা গান বান্দি, নিজে গান বান্দি, নিজে গান লেখি, হাটে হাটে গান করি, গানের বই বেচি।
কাদের বলে, গান লেখো? বাঃ গানের বই আছে তোমার?
জে। চারখান বই আমার বাজারে চালু। তবে উপস্থিত নাই, বই তো মজুত রাখবার পারি না। পাইকাররা একেক হাটে পঞ্চাশ ষাটখান বই লিয়া যায়। আপনাদের বাপমায়ের দোয়ায় আর তেনার রহমতে বই আমার পড়ে থাকে না।
ভালো ভালো। কাদের এই কবিকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে চায়, ভালো। কাল বিকালে আসো তোমার গান শোনা হবে। ভালো হলে পাকিস্তানের দাবি লিয়া একটা গান লেখায়া নেবো। দেখি ইসমাইল সাহেবকে দিয়ে তোমার গান তেমন হলে নাহয় ছাপাবার বন্দোবস্ত করা যাবে।
আলিমুদ্দিন মাস্টার অনুরোধ করে, এখন একটা গান শোনাও তো দেখি।
আলিম মাস্টারের এই নির্দেশ কাদেরের কাছে অনধিকারচর্চা মনে হলেও তার পক্ষে প্রতিবাদ করাও মুশকিল। লোকটিকে তার পছন্দ হলেও নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে তাকে জোরে হুকুম দিতে হয়, কও। দুই লাইন শুনি।
বৈকুণ্ঠ উৎসাহ দেয়, গাও, ওইটা গাও। হামাক শোনালা না? ওইটা গাও।
কেরামত আলি চাঁদরের নিচে একটা ঝোলায় হাত ঢুকিয়ে পৃষ্ঠা চারেকের রোগা একটা ছাপানো বই বের করে চোখের সামনে মেলে ধরে মাথা ঝাঁকিয়ে বাবরি চুল পেছনে ঠেলে দেয়। তারপর গুণগুণ করে,
বিসমিল্লা বলিয়া শুরু করে কেরামত।
ভারতবাসীর উপরে আল্লা কর রহমত–শুন সব্রজনে।
শুন ব্ৰজনে শুধু মনে হিন্দু মোসলমান।
সোনার বাঙলার চাষীর দুস্কে ফাড়িবে পরাণ রক্ত করি জল
রক্ত করি জল সোনার ফসল চাষা ফলায় মাঠে।
অনাহারে উপর্বাসে জেবন তাহার কাটে।।
চাষার গান? গান থামিয়ে কাদের বলে, বাঃ বাঃ। কাল তুমি একবার আসো। দেখি তোমাক দিয়া ভালো একটা গান লেখানো যায় কি-না। হাই তুলতে তুলতে বলে, রাত হলো। কামের কাম কিছুই হলো না। কর্মীদের বলে, তোমরা কাল সকাল সকাল আসো, সন্ধার আগেই আসো। রাত হলে এর গানও শোনা যাবে। না কি কও হে কবিঃ এসব কথায় কেরামতের গানের প্রতি তার অনুরাগ বা উদাসীনতা কিছুই বোঝা যায় না। কেরামত আলি গাইতে শুরু করতে না করতেই তাকে থামিয়ে দিয়ে আলিম মাস্টারের নির্দেশটি অকার্যকর করার তৃপ্তিতে খালি পেটের দরুন ঢেকুর তুলতে না পেরে সে আরেকবার সশব্দ ও লম্বা হাই তোলে।
গানটি ভালোভাবে গাইতে না পারলেও এরই মধ্যে কেরামতের বাবরি চুলের ওঠানামা সবচেয়ে বেশি মনোযোগ পেয়েছে তমিজের। এক লাইনে কেরামত তার বাবরি চুল মাথার এক ঝাকুনিতে নিয়ে আসে সামনে, চোখমুখ ঢেকে তার মুখ অন্ধকার হয়ে যায় এবং পরের লাইনে এসে আরেকটি ঝাকিতে মেঘ কাটালে হ্যাজাকের আলোয় জ্বলজ্বল করে তার চোখ দুটি। বাবরিতে কী যে আছে যে একেকটা ঝাকির সঙ্গে চুলগুলো একেবারে কুঁসে ফুঁসে ওঠে। মাত্র কয়েকটা কথাই সে গাইলো, তার গান শোনার পিপাসায় তমিজের বুকটা খা খা করতে থাকে। গানের সব কথা সে ধরতে পারে নি। গায়কের চুলের ঢেউ খেলানোর দিকে বেশি মন দেওয়ায় গানের কথার অনেকটাই তার কান পিছলে গেছে। কিন্তু এর মধ্যেই কানের ভেতরে ঢোকা, কথাগুলো তার মাথায় কুটকুট করে কামড়ায়। আরো শুনতে পারলে কামড়ানিটা হয়তো সারতো।
২১. ধান যে তমিজের আরেকটু প্রাপ্য
ধান যে তমিজের আরেকটু প্রাপ্য, অন্তত বিলের পানি ও কামলা বাবদ তার কাছ থেকে বেশিই নেওয়া হয়েছে, আবদুল কাদের এটা মানে।–তোর কথা ন্যায্য। কিন্তু ভাইজান বাগড়া দিবি।
সপ্তাহের ছয়টা দিনই তো ভাইজান বাড়ি থাকে না, কিন্তু কাদের কিছু করতে পারলো না। ভাইজান নাই, আছে ভাবি। আবদুল কাদেরের সমস্যাটা তমিজ বোঝে। আবদুল আজিজের শ্বশুরবাড়ি তো টাউনের কাছে, টাউনবন্দরের মানুষকে তমিজের। চেনা আছে। ভাবিজানের হাতটা একটু খাটো। আবার বড়ো বেটা না থাকলে বর্গাদার কি কামলাপাটকে দেওয়া থোওয়ার ব্যাপারে বেটার বৌয়ের কথা মণ্ডল খুব শোনে। বড়োবিবি তার হাজারটা ব্যাপার নিয়ে রাতদিন যতোই ঘ্যানঘ্যান প্যানপ্যান করুক, শরাফত শেষপর্যন্ত সায় দেয় বেটার বৌয়ের কথায়। এমন কি ছোটোবিবির মিহি গলার তেরছা কথায় মণ্ডল দিনমান যতোই ভিজুক আর নিজে রাত্রিবেলা তকে যতোই ভিজিয়ে দিক, ধানের হিসাবে নিকাশে তার কথার দাম নাই। ছোটোবিবিকে বলেও তমিজের তাই সুবিধা হলো না।
