বটতলায় বাঁধানো চাতালে একটা কুপি জ্বলছে, পাশে একটা নকুলদানার ডালা। নকুলদানাওয়ালা বোধহয় ডালাটা বৈকুণ্ঠের হেফাজতে রেখে কোথায় গিয়েছে; কিন্তু এ যেভাবে একটু একটু করে মুখে তুলছে তাতে লোকটা ফিরে এসে শুধু ডালাটাই পাবে।। আর খায়ো না বলে ডালার দিকে একটু এগোতে তমিজের মাথা টলে যায় : এ কী? চেরাগ আলি? কুয়াশা ও অন্ধকারে লোকটার কালো মুখ লম্বাটে হয়ে মিশে গেছে আরো ঘন অন্ধকারে, তার বাবরি চুলও হাটের অন্ধকার এই জায়গাটির অংশ ছাড়া আর কিছুই নয়। তমিজের সামনে অন্ধকার দোলে, কয়েকটা দোকান পরে মুকুন্দ সাহার আড়ত, আড়তের মশলার গন্ধ বটতলার কুপির আলো উস্কে দেয়, সেই কালো আলোতে ভর করে বটতলা সরে যায় অনেক দিন আগে এবং এই অন্ধকার লোকটির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে গলা মেলায় কালো ছিপছিপে একটি বালিকা। কালো আলোয় এর হাতের দোতারা দেখা যাচ্ছে না, সেটা কি সে লুকিয়ে রেখেছে তার মস্ত লালকালো তালি দেওয়া আলখাল্লার ভেতরে? তার হাতের সেই লোহার লাঠিটা তবে কোথায়? গান করার ফাঁকে ফাঁকে চেরাগ আলি ফকির হঠাৎ হঠাৎ করে থেমে দম নিচ্ছিলো আর তখন ওই কথাগুলো গাইছিলো ওই কালো মেয়েটি, খোয়াবে কান্দিল বেটা না থাকে উদ্দিশ। গাইতে দিয়ে চেরাগ আলির মুখের হাঁ খুব বড়ো হয়ে গেলে তমিজ হেসে কুটি কুটি হচ্ছিলো, কে যেন তাকে ধমকে দেয়। কে সে? তবে রাগে ও কষ্টে ছলছল চোখ করে মেয়েটি তার দিকে তাকিয়েছিলো, সেটা কিন্তু স্পষ্ট মনে আছে। অনেক বছর উজিয়ে সেই মেয়েটিকে নিয়ে চেরাগ আলি কি ফের প্রথম থেকে হাজির হলো এখানে?
তোর বাপ কুটি রে? বৈকুণ্ঠ গিরি জিগ্যেস করলেও আন্ধারে ওই ছবি চট করে। নিভে যায় না। তবে তার রঙ ফিকে হয়ে আসে। হামি কনু, তমিজের বাপ হাটোত আসেই না আজকাল। তাইও একরকমের ফকিরই হয়া গেছে এখন। মানষে কয়, তমিজের বাপে ঘরত বস্যা খালি টোপ পাড়ে আর রাত হলে নিন্দের মধ্যে পাকুড়তলা যায়া ঘোরে। মানষে তো আসল কথা জানে না। বৈকুণ্ঠ অবিরাম কথা বলে, ক্যারে তমিজ, চিনিস? চেরাগ আলির পরিচয় দেয়, চিনিস না, না? চেরাগ আলি ফকিরের শিষ্য আছিলো, সাগরেদ, সাগরেদ। এটিকার মানুষ লয়। ফকিরের সাথে চেনা আছিলো অনেক আগে, কিন্তু মেলামেশা হছে খিয়ারেত গেলে। লয় ফকির?
লোকটা যে চেরাগ আলি ফকির নয় বোঝার সঙ্গে সঙ্গে চেরাগ আলি এবং ছিপছিপে বালিকা তমিজের সামনে থেকে মুছে যায় এবং ওই সাথে উড়াল দেয় সেই অনেক আগেকার মেঘলা বিকালবেলাটিও। বৈকুণ্ঠ এলোমেলোভাবে তার সম্বন্ধে অনেক কথা বলে। চেরাগ আলি নাকি লোকটিকে বলে দিয়েছে, সে যেন গিরিরডাঙা গ্রামে গিয়ে তার নাতনি আর নাতজামাইয়ের সঙ্গে দেখা করে। তমিজের বাপকে সে অনেক গোপন কথা বলবে, সেসব তত্ত্বকথা, এখানে কি সেই কথা বলা যায়?
তমিজ জিগ্যেস করে, আপনের বাড়ি?
বাড়ি আমার পুবে। তাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বৈকুণ্ঠই তার পরিচয় দেয়। আকালের সময় এই কাছেই, নিজগিরিরডাঙা গ্রামে তার বৌবাচ্চা রেখে সে চলে যায় খিয়ারে। তার হলো গান গাওয়ার নেশা। খিয়ারের মানুষের মধ্যে তার গান খুব চলে, টাউনেও তার গানের চাহিদা খুব। এখন শুধু গানই করে বেড়ায়।
তমিজের সন্দেহ হয়, এই হলো ফুলজানের হারিয়ে-যাওয়া স্বামী। এখন তমিজের সামনে এই অন্ধকারে কুপির আলো থেকে হলদে জ্যোৎস্না ঝরতে শুরু করে। সেই জ্যোৎস্নায় ড়ুবুড়ুবু ধানখেতের পাশে সরু আল, সরু আলের ওপর দাঁড়িয়ে-থাকা জমাট-বাঁধা জ্যোৎস্নাকে ছুঁতে গেলে সে সরে যায় মোষের দিঘির ওদিকে, তমিজ তাকে ধরতে সেদিকে যেতেই সেই জুমাননা জ্যোৎস্না উড়াল দেয় মোষের দিঘির ওপর, দিঘির গোলাপি পানির আভায় তার কালো মুখের ছায়া। কালো ছায়ায় চিবুকের নিচে ঘ্যাগের আবছা আকার নিয়ে ছোট্টো একটি বিন্দুতে ঢুকে পড়ে সে মিশে যায় কুয়াশার খাপের ভেতর। আর আকাশ জুড়ে ওড়ে তমিজেরই দেওয়া রেড ক্রসের র্যাপার। কেরামত আলির গায়ের চাদর কি ওটাই নাকি? তমিজ বারবার তাকে দেখে। এতে লোকটা একটু উসখুস করে। হয়তো অস্বস্তি কাটাতেই সে বলে, তোমার নাম তমিজ? তোমার বাপের সাথে মেলা কথা ছিলো গো। ফকিরের বেটিকও অনেক কথা কওয়ার আছে। কাল পরশু তোমাদের বাড়ি যাবো।
লিচ্চয়। হামার সাথে যাবা। ঘাটা চিনায় লিয়া যামু। বৈকুণ্ঠ তার সঙ্গী হওয়ার প্রস্তাব করেই অনুরোধ করে, ওই গানটা আর একবার গাও তো। তোমার গলাখান বড়ো মিঠা।
এর মধ্যে ১৫/১৬ বছরের একটি ছেলে এসে তার নকুলদানার ডালা তুলে নেয়, বলে, ও বৈকুণ্ঠদা, তুমি ব্যামাক খায়া ফালাছো গো। পয়সা দিবা না?
বৈকুণ্ঠের হাতে তখনো কয়েকটা নকুলদানা। ছেলেটিকে সে ধমক দেয়, আরে ফকির মানুষ তোর নকুলদানা খাছে, তোর ভাগ্য। দে তো তমিজ, চারটা পয়সা দে তো এই ছোঁড়াক।
কেরামত একটা দুয়ানি ছেলেটির হাতে দিলে বৈকুণ্ঠ একটুখানি ক্ষোভ জানায়, আরে, জগদ্বন্ধুর বেটা, তোর বাপ কতো মানষেক বাদাম খিলাছে মাগনে, আর তুই আজ পয়সা লিলু ফকির মানষের কাছ থ্যাকা?
আমরা ফকির নই। কেরামত আলি প্রতিবাদ করে, ফকির হওয়া কি মুখের কথা? আমরা গান বান্দি, শায়েরি করি। গান লিখি, গান ছাপায়া বেচি। আমরা ফকির নই। এই কথা থেকে তার বিনয় বা অহংকার বোঝা কঠিন।
ওই তো হলো। বলে বৈকুণ্ঠ কেরামত আলির হাত ধরে টানে, চলো, ওই ঘরত চলো। ওটি লিত্যি সভা হয়। মেলা মানুষ পাবা। একটা গান করা যাও।
