এখন কাদেরকে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে।
ক্যা গো, আজ না হাটবার। যাই দেখি, মাছ টাছ কিছু পাই যদি। তমিজের হাঁকে সাড়া দেবে কে? কুলসুম তো এখন কালাম মাঝির বাড়িতে। তমিজ নিজেই ঘরে ঢুকে মাছের খলুই নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। ফের ঘরে ঢুকে সর্ষের তেলের শিশিটা ঝুলিয়ে নিলো আঙুলের মাথায়।
গোলাবাড়ি হাটের কাছাকাছি পৌঁছুলে বোঝা যায, হাট এখন ভাঙার পথে। সন্ধ্যা নামছে গাঢ় হয়ে। হাটুরেরা সব বাড়ি ফিরে যাচ্ছে; তাদের বেশিরভাগের হাতে একটা ঝোলা কি মাছের খলুই। আরেক হাতে ঝোলানো তেলের শিশি। কারো শিশি দুটো, একটায় সর্ষের তেল, আরেকটায় কেরোসিন। তারা সব মাছের দাম নিয়ে চালের দর। নিয়ে আলাপ করে। সামনে যে হাটুরেকেই পায় তমিজ তাকেই চালের দর জিগ্যেস করে, শুনে বলে, চালের দর মনে হয় এবার আর উঠবি না। নোকসান হবি। গলায় সে। জোতদারদের মতো এক ধরনের হতাশা তৈরির চেষ্টা করে।
কাদেরের দোকানে হ্যাজাক জ্বলছে, তার মানে এখনো মেলা মানুষ আছে। ভেতরটা লোকে ভর্তি। ক্যাশবাকসের পাশে নতুন একটা বড়ো জলচৌকি, একটু উঁচু এই জলচৌকিতে সাজানো আয়না, চিরুনি, কাঁকই, আলতা, সিঁদুর কৌটা, পাউডার। আরো অনেক কিছু আছে, তমিজ ওগুলো চেনে না। জলচৌকির পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে গফুর কলু। এখন বেচাকেনা বন্ধ হয়ে গেছে। তা হলে ওই শালা কলুর বেটা ওখানে। করে কী? সে বোধহয় জিনিসপত্র পাহারা দিচ্ছে। কর শালা চৌকিদারের কামই কর। টাউনে এইসবের দোকান তমিজ কয়েকটা দেখেছে, তবে ওখানে যারা বিক্রিবাটার কাজ করে তারা কি আর কলুর বেটার মতো লুঙি পরে নাকি? ধুতিপরা সেসব মানুষের চেহারা আলাদা। তবে কেরোসিনের সঙ্গে এখানে হালকা মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে, এই গন্ধ টাউনের ওই দোকানগুলোর সামনে দিয়ে যাবার সময় সে পেয়েছে।
ঘরের মানুষগুলির মধ্যে খদ্দের কেউ নাই, এরা সব কাদেরের পাট্টির মানুষ। কয়েকটা ছেলেকে কাদের বোঝাচ্ছে, তোমরা সবাইকে বলবো, মোসলমানের মধ্যে তো চাষাই বেশি। অবস্থা ভালো আর কয় জনের? মোসলমানের দল চাষার স্বার্থ না দেখলে আর কে দেখবে? বুঝিছো? এটা তো ঠিক কথাই যে, হক সাহেব খুব বড়ো নেতা। মোসলমান একদিন একবাক্যে তাকে ইমাম মানিছে, তার কথায় ওঠাবসা করিছে। কিন্তু তিনি তো গেলেন হিন্দু মহাসভার সাথে। যে হিন্দু মোসলমানের হাতে পানি খায় না, মোসলমান দেখলে ঘিননা করে, দেখো না নায়েববাবু বুড়া বুড়া মুরুব্বি মানুষের সাথে। তুই তোকারি করে কথা কয়, সেই হিন্দু জাতের সাথে হাত মেলালে হক সাহেবকে নেতা মানি কীভাবে? ভালো করা বুঝায়া কবা, বুঝিছো?
রানীরপাড়া স্কুলের একটি ছেলে কী জিগ্যেস করলে কাদের কয়েক পলকের জন্যে চুপ করে কী একটা ভেবে নেয়। তারপর দ্বিগুণ উৎসাহে বলতে শুরু করে, আরে গরিবের জন্যেই তো পাকিস্তান দাবি করা হচ্ছে, এটা বোঝাবার পারো না? পাকিস্তানে ধনীরা জাকাত ফান্ডে টাকা না দিলে পুলিস ওই ধনী লোককে এ্যারেস্ট করবে। আইন পাস হবে। গরিব না খেয়ে থাকবে না, জাকাতের টাকায় হক থাকবে গরিবের।
জাকাতের কথা ওঠে কেন বাপু? চাষাক ভিক্ষা দেওয়ার কথা ওঠে কেন? চাষার পাওনাটা দিয়া দিলেই তো মিট্যা যায়। চাষার যা খাটনি, আদ্দেক ফসলে তার পোষায়, তুমিই কও তো বাপু?
পেছনের বেঞ্চ থেকে আলিম মাস্টারকে হঠাৎ কথা বলতে দেখে কাদের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়, আরে মাস্টার সাহেব, আসেন, এখানে আসেন। আপনে চ্যাংড়াপ্যাংড়ার সাথে পেছনে বসিছেন কেন? আলিম মাস্টার সামনে গিয়ে আরেকটি বেঞ্চে বসে বলে, বাবাজি, আমার কথাটার জবাব দিলা না? গরিবের দেশ হলে জাকাতের দরকার কী?
না। মানে, দুই চারটা বড়োলোক যারা আছে তাদের টাকা আদায় করা গরিব মানুষের মধ্যে দেওয়া হবে। পাকিস্তান হলে চাষার হক আদায় করার আইন পাস হবে। জমিদারি প্রথা উঠায়া দেওয়া হবে। তাহলে জমির মালিক হবে কে? আপনি বলেন।
মোসলমান জোতদাররাই তখন জমিদারের কামগুলান করবি। চাষার লাভ কী?
কী যে কন? তেভাগা পাস হলেই চাষার হক কায়েম হয়। কিন্তু মাস্টারের জবাব এখনো দেওয়া হয় নি বুঝতে পেরে কাদের নতুন প্রসঙ্গ তোলে, দাঁড়ান, একটা বই দেই। আপনাকে। দেখেন, প্রাইমারি শিক্ষা ফ্রি করা হবে, কম্পালসারি ফ্রি এড়ুকেশন। তাতে তো লাভ চাষীদের, না কী?
বুঝলাম। কম্পালসারি করো, আর ফ্রি করো, আধিয়ার চাষা কোনোদিন বেটাক ইস্কুলে দিবার পারবি না। চাষার উপযুক্ত হিস্যা দাও, তার অবস্থা ভালো হলে পয়সা খরচ করা ইস্কুলে ভর্তি করা দিবি। এই ন্যায্য হিস্যার কথা তুললে জোতদাররা পুলিস ডাকে, এটা কেমন কথা বাপু?
কাদেরের সন্দেহ হয়, এই আলিম মাস্টার লোকটা কোন পক্ষের মানুষ একটু গম্ভীর হয়ে সে বলে, মাস্টার সাহেব, খিয়ার এলাকায় আধিয়াররা যা করতিছে, তাতে মোসলমানের একতা নষ্ট হচ্ছে না?
কিন্তু জোতদার তো মোসলমান কম নাই। মোসলমান চাষা হিস্যা চাইলে তারা পুলিস ডাকে কিসক?।
এবার কাদের চূড়ান্ত সমাধানের কথার পুনরাবৃত্তি করে, পাকিস্তান হোক, চাষার হিস্যা খোললা আনাই পাওয়া যাবি। এখন গোলমাল করলে সবারই লোকসান।
এই তর্কের যেটুকু তমিজ বুঝেছে তাতেই সে বেশ উত্তেজিত। এইবার কাদেরকে বলে তার বাপের কাছ থেকে মণখানেক ধানও যদি নেওয়া যায়। উত্তেজনায় ওখানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকাও মুশকিল। এদিকে কাদেরের দোকান থেকে ছেলেপিলে কখন যে চলে যাবে তারও ঠিক নাই। বাইরে বেরিয়ে দেখে, কালাম মাঝির দোকানে কুপি জ্বলছে। কালাম কয়েকদিন বাড়িতেই ধান তোলা নিয়ে ব্যস্ত, দোকানে বসেছে লালু, কালাম মাঝির সম্পর্কে ভাস্তে। মাছ তো আজ কেনাই হলো না। লালুর কাছ থেকে সর্ষের তেল আর বুটের ডাল নেওয়া যায়। বুটের ডাল অনেক দিন খাওয়া হয় না। কুলসুম চিতই পিঠা করলে বুটের ডাল দিয়ে খাওয়া যাবে। কিন্তু কালাম মাঝির দোকানে পৌঁছুবার আগেই ডাক দেয় বৈকুণ্ঠ।
