যুধিষ্ঠির জিভ কাটে, কি যে কন বাবু, উনিরা কতো বড়ো জাত। হামরা এক জাতের মানুষ হই ক্যাংকা করা?
শাল সাহা হলো বড়ো জাতের মানুষ? আর আমরা আর তোরা একই জাতের পয়দা? কী কস? শুনে যুধিষ্ঠির দ্বিতীয়বার জিভ কাটে, কী যে কন? কী যে কন? কিন্তু তার মুখে আর কিছু আসে না। তাকে আর জেরার মধ্যে না ফেলে শরাফত বলে, কয়দিন বাদে আয় বাবা। হামার ধান সব আসুক। যুধিষ্ঠির তমিজের পিছে পিছে চলে গেলে শরাফত আজিজকে আস্তে করে ধমকায়, অতো জগদীশ জগদীশ করো কিসক? ট্যাকাটা হাতোত পালেই যুধিষ্ঠির গণেশ কর্মকারের জমি বায়না দিবি, বোঝো না? কয়টা দিন এটি ঘুরুক, গণেশ লিজেই হামার কাছে হাজির হবি।
ওদিকে বাড়ির খুলিতে ভার নামিয়ে তমিজ কাঁধের বাকটা বেড়ার সঙ্গে ঠেকিয়ে রাখতে না রাখতে ছুটে আসে কুলসুম। নিজেদের ধান ঘরে এলে কী করতে হয় বুঝতে পেরে সে দুই হাতই ঢুকিয়ে দেয় ধানের বস্তার ভেতরে, ধান তোমার কি সোন্দর হছে গো। এই ধানেত বছরের খোরাক হয়াও আরো থাকবি। এই ধানের বরকত আছে। গো।—কুলসুম প্রলাপ বকার মতো অবিরাম বলেই চলে। তমিজ তখন মাটিতে বসে পড়েছে হাঁটু ভেঙে, ডোবার ওপারে দাঁড়িয়ে কার সঙ্গে কথা বলছে যুধিষ্ঠির। কিছুক্ষণ কুলসুমের প্রলাপ শুনে তমিজ বলে, লাও, হছে। ভার আর ছালা আজাড় করা দাও। ধান লিয়া আসি।
বস্তা খালি করে ভারে রেখে কুলসুম এসে দাঁড়ায় তমিজের পাশে। শীতের দুপুরে তার ঘাড় ঘামে ভিজে গেছে। বাক বয়ে বয়ে তার ঘাড়ের ওপরে খানিকটা জায়গা একটু শক্ত, সেখানেও ঘামের বুদবুদ। কুলসুম তার শাড়ির আঁচলে তমিজের ঘাড় মুছতে মুছতে বলে, খুব ঘামিছো গো। খানিকক্ষণ জিরাও।
তমিজের বাপ ঘর থেকে বেরিয়েই বেড়া থেকে বাঁক ও মাটি থেকে ভার তুলে নিয়ে রওয়ানা হয় মণ্ডলবাড়ির দিকে, বলে, তুই জিরায়া লে। হামি না হয় কয় ভার লিয়া আসি।
কুলসুমের শাড়ির আঁচল ফিরে আসে তার নিজের হাতে, তমিজ সটান উঠে দাঁড়ায়। মণ্ডলবাড়িতে তমিজের ধানের পরিমাণ দেখে তার বাপের মেজাজটা আবার বিগড়ে যাবে, মণ্ডলকে কী বলতে ফের কী বলে ফেলবে, তার ঠিক নাই। শরাফত কি আজিজ যদি রেগে যায় তো জমিটা এবার তমিজ পাবে না। না, বাপকে যেতে না দেওয়াই ভালো। পা চালিয়ে ডোবার ওপারে গিয়ে তমিজ বাপকে ধরে ফেলে। বুড়া এতো জোরে জোরে পা ফেলছিলো কি ধানের খুশিতে? না-কি কারো ওপর জেদ করে? তমিজ আরো বেশি জেদ করে, তুমি ইগলান ধান ব্যামাক খুলির মধ্যে মেল্যা দাও। আর একটা গুদ দেওয়া লাগবি। বাকি ধান হামি লিয়া আসিচ্ছি। যুধিষ্ঠির আছে হামার সাথে।
শেষ কয়েক ভারে আসে খড়। যুধিষ্ঠির আর শমশেরও কয়েকবার বাঁক কাঁধে নিয়েছিলো। এই করতে করতে শীতের দুপুর একেবারে শেষ হয়ে আসে। তিন জনে ডোবায় নেমে গোসল করে হি হি করে কাঁপে। অল্প পানিতে ভালো করে গোসল হলো, মাঝখান থেকে হাত পা সব জমে যায় ঠাণ্ডায়। গতরে হিমের কামড়ে কাঁপতেও ওদের মহা আমোদ, ওরা চলে গেলেও আমোদর রেশ থেকেই যায়। এই ছোটো অনিয়মটাকেই ধান তোলার উৎসব গণ্য করে তমিজের বাপ কিছুক্ষণ গুড়ুর গুড়ুর করে হুঁকা টেনে ওটা রেখে দেয় ছেলের পেছনে। তারপর আস্তে আস্তে বলে, ধান তো কিছুই দেয় নাই মণ্ডল। ধান কাটনু, তখন মনে হলো—
গোরু বেচ্যা দিছো, নাঙল হাল কিছুই তো ঘরত থোও নাই। ধান আর পাবা কতো? তমিজ রাগ করে প্রথমে বাপের ওপর, পরে কুলসুমকেও শাসায়, ও ফকিরের বেটি, আগে গোরু কেনা লাগবি, হাল নাঙল ইগলান করার পরে খাওয়া দাওয়া, বুঝিছো?
কী সোন্দর বাসনা গো তোমার ধানের। বুক ভরে ধানের গন্ধ নেয় কুলসুম, তামান ঘর, খুলি, আইঙনা ধানের বাসনাত ভুরভুর করিচ্ছে গো। পাগারের গোন্দ কুটি পলাছে দিশা পায় নাই।
ধানের সৌরভে ডোবার দুর্গন্ধ পালিয়ে গেছে এই তথ্যে কিছুমাত্র বিহ্বল না হয়ে তমিজের বাপ খেকিয়ে ওঠে, খালি বাসনা শুকলেই হবি? এই চাউলের ভাত লিত্যি খাওয়া যায়? এই ধান বেচা আউশ কেনা লাগবি।
এদের কারো কথাই গ্রাহ্য করে না তমিজ, ধান লয়, ধান লয়। ধান কেনা হবি। এই ধান সেদ্ধ করা চাউল বেচ্যা দিয়া আসমু গোকুলের হাটত, বুঝিছো? কিন্তু বাপ কি সত্য কারো গায়েই তার কথাগুলো লাগলো না দেখে তমিজ ফের বলে, খালি খাওয়ার চিন্তা! ফকিরের বেটি, জিভখানা এ্যানা খাটো করো গো, খাটো করো! চাউল হামি এক হাটোত বেচমু, আবার ওই দিনই পাঁচ কোশ উত্তরে দশটিকার গোরুর হাটত যায়া গোরু লিয়া আসমু।
ধানের খুশিতে কুলসুম খিলখিল করে হাসে, তোমার জিভখান এখন থামাও তো বাপু।
তার বাক্য মেনে তমিজ চুপ করে। ওখানে বসেই গোয়ালঘর করার একটা জায়গা খোজে। আকালের আগে যেখানে গোরু থাকতো সেখানে এখন তমিজের ঘর। ওই ঘরের উত্তর পশ্চিমে একটুখানি জায়গায় ছোটো একটা একচালা করে দিলেই দুটো গোরু থাকতে পারে। দুটো গোরু, হাল, লাঙল, জোয়াল, মই,—সবই সে করে ফেলবে সামনের খন্দ তোলার পরেই। তার বাপের খোরাকটা বড়ো বেশি। কুলসুমটাও বেশি। খলবল করে—এই যে পঁচসেরি ধামায় ধান নিয়ে কালাম চাচার টেকিত যাই। আজই তোমাগোরে পিঠা খাওয়ামু। ধান ঘরত তুল্যাই পিঠা খির না হলে ওই ধান বরকত দিবি
গো। বলতে বলতে সে চলে যায় চেঁকির আওয়াজ মুখরিত কালাম মাঝির বাড়ির দিকে। তার খিলখিল হাসির কুচি পড়ে থাকে সারা বাড়ি জুড়ে, সেই আওয়াজে মিশেল ছিলো জোড়া গোরুর মিষ্টি নিশ্বাস। আর ছিলো ধানের পালার চূড়ায় আরো ধান রাখার ঝরঝর ঝরঝর আওয়াজ।-আবদুল কাদেরকে বলে মণ্ডলের কাছ থেকে আরো কিছু ধান নেওয়া যায় না? বিলের পানি বাবদ ধান কেটে নেওয়ার ইচ্ছা শরাফতের তো ছিলোই না। বড়ো বেটার কথায় মেনে নিয়েছে। এখন কাদের যদি বাপকে ভালো করে বোঝায় তো মণ্ডল কি তার কথা শুনবে না? সন্ধ্যা তো হয়েই এসেছে, গোলাবাড়ি গেলে।
