আবদুল আজিজের চোখ থেকে ঘুম তখন একেবারে কেটে গিয়েছে, বাবাকে সে মনে করিয়ে দেয়, বাপজান, পানির বাবদ তো কিছু ধরা লাগে। ওইটা কিছু কলেন না।।
পানির জন্যে ফের কিছু ধান ধার্য করার কথায় তমিজের গলায় কারবালা ঢুকতে শুরু করে, এক গলা কারবালা নিয়ে সে হাঁসফাস করে। আবদুল আজিজ ব্যাপারটা। ব্যাখ্যা করে এইভাবে।কাল্লাহার বিল থেকে নালা কেটে জমিতে পানি দেওয়া হয়েছিলো, নইলে ওই জমিতে এতো ধান হয় কী করে? তো পানির খরচ ধরতে হবে। বিলের মালিককে দাম ধরে দিলে তার অর্ধেক দেবে জোতদার আর অর্ধেক বর্গাচাষী। বিলের মালিক হিসাবে পানির দাম পাবে শরাফত মণ্ডল, আবার জোতদার হিসাবে সে দেবে এর অর্ধেক, বাকি অর্ধেক দেবে তমিজ।
সবাই অবাক হয়ে আজিজের ব্যাখ্যা শোনে। তাদের বিস্ময় মোচনের দায়িত্বও আজিজের।-মোষের দিঘি থেকে নালা কাটার অনুমতি পেলে নায়েববাবুকে তো কিছু ধরে দিতেই হতো। তোমরা নায়েববাবুকে পয়সা দিতে পারো, আর মুসলমান জোতদারকে ন্যায্য পাওনা দিতে তোমাদের বুক টাটায়। এটা কী?
কিন্তু যুধিষ্ঠির বলে ওঠে, বাবু, জলের দামই যদি ধরেন তো হামার কথাটা বিবেচনা করা লাগে। কেন, তার কথা আসে কেন? – আপনের জমিত হামি লিজে জল দিছি কামারপাড়ার খাল থ্যাকা। খাটনি ষোলো আনা হামার, জলও হামাগোরে কামারপাড়ার খালের। সেটার খরচ ধরলে হামার কিছু পাওনা হয় না বাবু?
আবদুল আজিজের এই পানির ব্যাপারটা ভোলা শরাফত অনুমোদন করতে পারে।। মাঝিদের সামনে কাৎলাহার বিল নিয়ে এতো কথা ওঠাবার দরকার কী? তা এখন তো আর কিছু হটার জো নাই। হালটা ধরতে হয় শরাফতকেই। প্রথমে সামলাতে হবে যুধিষ্ঠিরকে, কামারপাড়ার খাল গেছে ওই জমির পাঁজরা দিয়া। খালের মধ্যে সেঁউতি ড়ুবালু আর জমিত পানি সেঁচলু, লয়? এর মধ্যে খাটনি কিসের? খাল কি তোর একলার? খালের দুই পাশের ছয় আনি সাড়ে ছয় আনি জমি তো হামার। পয়সা ধরার কথা আর কস না, ধরলে তোরই নোকসান।
আজিজ কিন্তু ওই খালের পানি নিয়ে যুধিষ্ঠিরের আর্জি বিবেচনা করার পক্ষে। সরকারি কর্মচারীদের কাছে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। বৃটিশ রাজত্বে সূর্য যেমন অস্ত যায় না, তেমনি সেই সূর্যের কিরণ যাতে সব জায়গায় সমানভাবে পড়ে সেদিকে দৃষ্টি রাখাও বৃটিশ সরক র বাহাদুরের পবিত্র দায়িত্ব। এরকম একটি জুতের উপমা প্রয়োগ করে তৃপ্তি পেয়ে আজিজ যুধিষ্ঠিরকে আশ্বাস দেয়, হিসাবনিকাশ করে। তার যদি প্রাপ্য বেয়োয় তো তাকে কড়ায়গায় বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
কিন্তু আবদুল আজিজের এসব হাকিম কিসিমের কথাবার্তা তমিজের কানে ঢোকে কি-না সন্দেহ। সে বলে, নালা কাটনু তো হামি একলা। একদিন খালি কোদাল ধরিছিলো বুলুর বেটা। হামি কনু, তুই চ্যাংড়া মানুষ, পারবু না। হামি একলাই তো কাটনু। পানির দাম কী কচ্ছেন হামি বুঝিচ্ছি না।
বুলুক তো হামি নিয়োগ করনু। বুলু ওই কয়টা দিন হামার গোরুবাছুর দেখলো না। এখন তুই তাক দিয়া কি করিছু তুই জানিস। বলে আর শরাফত তার বাম্প-শুকিয়ে যাওয়া চোখ মোছে। করকর-করা চোখ নিয়েই সে বলে, তমিজ, তুই বেশি কথা কস। তখন হাতেপায়ে ধরলু, তোক জমি দিলাম। বর্গা করা তোর আরম্ভ হলো। লে, আরো কর। হাল কর, গোরু কর, লিজের হালগোরু লিয়া জমিত নাম। তোেক মানা করিছে কেটা? এংকা ক্যাচাল করিস না বাপু।
হালগোরুর কথায় তমিজ চুপসে যায়, শরাফত হুমকি দিচ্ছে। ওই জমিতে পেঁয়াজ রসুনের আবাদ করার সুযোগ হারাবার ভয়ে সে চুপ করে থাকে।
অর উকিল আজ গরহাজির, কথা না কয়া আসামির আর উপায় আছে? আবদুল আজিজ তমিজের দিকে কাদেরের পক্ষপাতিত্বের ইঙ্গিত করলে তমিজের রাগ হয় কাদেরের ওপর। কাদের আজ বেরিয়ে গেছে খুব ভোরে, সন্ধ্যার আগে ফিরবে না। আজ কি তার টাউনে না গেলেই হতো না।
পানি বাবদ আরো কিছু ধান মণ্ডলের ভাগে সরে গেলে নিজের ধান বস্তায় ভরতে তমিজের হাত আর সরে না। আজিজ এবার মনোযোগ দেবে অন্য বর্গাদারের ধান নিয়ে কেবল এসেছে যে গোরুর গাড়িটি সেই দিকে। আফজাল গাড়িয়াল বস্তা নামাচ্ছে তার গাড়ি থেকে। তমিজের দিকে তাকিয়ে সে জানতে চায়, গাড়ি লাগবি? চলো দিয়া। আসি। তমিজ বলে, এইকোনা ধান। তার আবার গাড়ি লাগবি? তমিজ ভারের ওপর তার ধানের বস্তা সাজায়।
আফজাল গাড়ি থেকে ধান নামানো শেষ করে শিমুলগাছের তলায় বসলে আবদুল ক আজিজ যুধিষ্ঠিরকে বলে, পৌষ মাস গেলো না, তুই আসিছিস ধান কর্জ লিবার। সোমাচারটা কী বাপু?
আপনাগোরে জমি বর্গা করা ধান যা পানু তাত তো দুই মাসের খোরাক হবি না। বাবা কচ্ছে, কয় মণ ধান কর্জ লিয়া আয়, জষ্টি মাসত পদুমশহরে লিশানের মেলার পরে।
হয় লগদ টাকা দিয়া শোধ করমু।
বুঝিছি। আবদুল আজিজের সঙ্গে আর সবাই বোঝে। নিশানের মেলায় লাঙলের ফলা, কোদাল, কুড়াল, কাস্তে, বঁটি এসব খুব ওঠে। অনেক দূরদূরান্ত থেকে চাষীরা আসে। করতোয়ার পুব থেকে যমুনার পশ্চিম পর্যন্ত কর্মকারদের থোক রোজগার হয় ওই মেলাতেই। কিন্তু যুধিষ্ঠিরের কথায় শরাফত আমল দেয় না, যে ধান পাছু তাই আগে খায়া শ্যাষ কর। পরে আসিস।
না বাবু। ধান হামার এখনি দরকার। ধান নেওয়ার কারণ গোপন করতে যুধিষ্ঠির হিমসিম খায়, বাবার হাঁপরের মাল কেনা লাগবি।
খোয়াবনামা মিছা কথা কস কিসক? গণেশ কর্মকারের জমির বায়না দিবু, তোর তো মেলা পয়সার দরকার। ধরা পড়ে গিয়ে যুধিষ্ঠির চুপ করে থাকে। আবদুল আজিজ তাকে পরামর্শ দেয়, জগদীশের কাছে যাস না কিসক? তোর জাতের মানুষ, যায়াই দেখ।
