কাদের ফের জিগ্যেস করে, পলাতক মানুষের সন্ধান পেলে সে কী করবে?
আমাকে বলে যেও। চুপ করে বলে যেও। চট করে পুলিসের কাছে না যাওয়াই ভালো।
২০. একে এক দুয়ে দুই
একে এক। দুয়ে দুই, দুই দুই। তিনে তিন, তিন তিন। চারে চার, চার চার।
মণ্ডলবাড়ির বাইরের উঠানে বসে ধান মাপে হামিদ সাকিদার। কয়েক হাত তফাতে। শরাফত মণ্ডল বসে রয়েছে ইজি চেয়ারে। আবদুল আজিজ ঘুমে-কাতর চোখজোড়া জোর করে খুলে রেখে নজর রাখছিলো দাঁড়িপাল্লার কাঁটার দিকে, ঘুম তাড়াতে তাকে মাঝে মাঝে উঠে দাড়াতে হচ্ছিলো কাঠের চেয়ার ছেড়ে। এই ধান তোলার সময়টা তাকে ঘন ঘন বাড়ি আসতেই হয়। কিন্তু এতো ছুটি তাকে দেবে কে? শনিবার বিকালে জয়পুরে ট্রেনে চেপে টাউনে নেমে টমটমে বাড়ি আসে রাত সাড়ে নটা দশটার দিকে। কাল মিনিট তিনেকের জন্যে শান্তহারে কানেকটিং ট্রেন মিস করায় বাড়ি পৌঁছুতে পৌঁছুতে ভোররাত হয়ে গিয়েছিলো, ঘণ্টাখানেকের বেশি ঘুমাতে পারে নি। যাক, এইতো কটা দিন। বর্গাদারদের ওপর সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকা যায় না। বাপজান বুড়া মানুষ, তার ওপর আর কতো চাপ দেবে?
দাঁড়িপাল্লার দিকে শরাফতের অতো নজর নাই, হামিদ সাকিদারের ওপর ভরসা করা যায়। শরাফত বেশিরভাগ সময়েই দেখছিলো শিমুলগাছের মাথার দিকে। বকগুলো ভোরবেলায় চলে গিয়েছিলো বিলের ওপর। ছোটো ছোটো আঁকে তাদের অনেকেই ফিরে এসে বসছে নিজেদের পছন্দসই ডালে। তাদের নজর উঠানের ধানের ওপর।
হাতের ভাপা পিঠায় আনমনে কামড় দিতে দিতে বারবার বিলের দিকে চলে যাচ্ছিলো আজিজের বড়ো ছেলে বাবর। শরাফত তাকে কয়েকবার কাছে ডেকে তার হাত ধরে বসিয়েছিলো ইজি চেয়ারের হাতলে। ছেলেটা বসে না, পিছলে পিছলে সরে পড়ে। এমনিতে শান্ত ছেলে, পড়ুয়া ছেলে, একমাত্র ভাইটা মরে যাবার পর কথাবার্তা তার যেন একেবারেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ধান মাপার দিকে শরাফত মন দিতে পারে না। চোখ দুটো তার ঝাপসা হয়ে আসে। বকের ঝাঁক পালা করে করে ধানের ক্রুপের ওপর দিয়ে ছোট্টো উড়াল দেয়। নিশ্চিন্ত শরাফতের চোখে মৃত নাতির শোকে ও জ্যান্ত নাতির বিষণ্ণতায় বাষ্প জমে ঘন হয়ে।
শিমুলগাছের নিচে বসেছিলো হুরমতুল্লা, আর ছিলো শমশের পরামাণিক, যুধিষ্ঠির কর্মকার। তাদের সবার সামনে মাটির খোরা ভরা দুধপিঠা, তাদের কোঁচড়ে কোঁচড়ে মুড়ি। তমিজ ছিলো হামিদ সাকিদারের গা ঘেঁষে। পিঠা কি মুড়িতে তার মনোযোগ নাই, শরীরের সমস্ত শক্তি দুই চোখে নিযুক্ত করে সে দেখে দাঁড়িপাল্লার ওঠানামা। দেখতে দেখতে ধানের স্থূপ উঁচু হয়ে ওঠে। ২ বিঘা ৭ শতাংশ জমির পাকির ১৮ মণ ১২ সের ধানের দিকে শমশের ও যুধিষ্ঠির তো বটেই, হুরমুতুল্লা পর্যন্ত তাকিয়ে থাকে মুগ্ধ চোখে। দাঁড়িপাল্লায় তমিজের নজর সেঁটে গেছে জিগার আঠার মতো, সেই নজর ছিড়তে গেলে চোখ দিয়ে তার রক্ত বেরুতে পারে। ফুলজানকে এই সাজানো ধান একবার দেখাতে পারলে হতো।–মাঝির বেটা, মাঝির বেটা বলে রাতদিন খোঁটা দিস, কোনো শালা চাষার বেটা এই পরিমাণ জমিতে এতো ধান ফলাতে পারবে? একবার দেখে যা মাগী, চোখ দুইটা দিয়্যা লয়ন ভরা দেখ।
পিঠা কয়টা খায়া সুস্থির মতো ভাগ করো। হামিদ সাকিদারের প্রতি শরাফতের এই নির্দেশ ছিনিয়ে নেয় তমিজের চোখের অর্ধেক জোর। ধানের এমন সোন্দর পালাটা মনে হচ্ছে কুড়াল দিয়ে টুকরা করে ফেলবে। বেশি লয়, আর একটা দিন কি এই ধানের পালাটা আমান রাখা যায় না? ফুলজানটাকে একবার দেখানো যায়। মণ্ডলের নোকসানটা কী? কাল আবদুল কাদেরের সামনে ভাগাভাগিটা করলে তমিজ একটু বল পায়।কিন্তু এতোগুলো মানুষের সামনে তমিজ কথাগুলো বলে কী করে?
হামিদ সাকিদারের পিঠা খাওয়া শেষ হলে শরাফত জারি করে পরবর্তী আদেশ, ভাগ করার আগে হাল, গোরু, লাঙল, মই আর কামলাপাট,জমির কামলা, হুরমতুল্লার বাড়িত কামকাজের মজুরি—ব্যামাক হিসাব করা লাগে।
হিসাব তো শরাফতের সবই মুখস্থ। তবু হাল, গোরু, লাঙল, মই আর কামলাপাটের কোনটা কতো দিন এবং কীভাবে খাটানো হয়েছে মুখে মুখে সে গুনতে থাকে। যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ করে এবং হিসাব মোতাবেক কয়েক মণ প্রথমেই আলাদা করে তার নিজের ভাগে রাখতে বলে। হামিদ সাকিদার ফের পাল্লা ধরলে নিংড়ানো বুকে ও চোপসানো মুখে তমিজ মিনমিন করে, হাল, গোরু ইগলানের হিসাব আর এ্যানা কম কর্যা ধরলে হয়। আর—
শরাফত সঙ্গে সঙ্গে মেনে নেয়, তাই সই। তুই আমার লয়া আধিয়ার, খন্দ করলু ভালো। হামিদ, এটি থাকা পাঁচ সের ধান অর ভাগোত দাও। দাও না বাপু, হামি কচ্ছি, দাও।
তমিজ তবু উসখুস করে। তার কালো মুখ লাল হতে হতে বেগুনির ওদিকে আর যেতে পারে না, এই কয়টা ধান দিলে হামাক আর কি দেওয়া হলো কন? আর। কামলাপাটের হিসাব ধরেনঃ কামলা তো আপনে লিজেই নিলেন। না হলে হামরা বাপবেটায় কয় দিনে ব্যামাক ধানই তুল্যা ফেলবার পারি না?
একটা খড় ধরে টানতে টানতে তমিজ আড়চোখে যুধিষ্ঠিরকে দেখে। তার চোখে কোনো ইশারা ছিলো কি-না বোঝা যায় না, থাকলেও কামারের বেটা তাকিয়ে ছিলো অন্যদিকে। তমিজের দিকে এখন শরাফতের চোখ, সেই চোখে খানিক আগের বাষ্পের লেশমাত্র নাই। চোখের তুলনায় গলা অনেক নরম করে সে বলে, লেয্য যা পাস তার চায়া তো অনেক বেশি দিলাম। হিসাব করা দেখিস?
