জয়পুরের কাছে দিন পনেরো আগে যে দাঙাহাঙামা হলো, তার পরপরই লোকটা পালিয়ে এসেছে। আলি মামুদ খার জমির ধান ভাগাভাগি নিয়ে আধিয়ারদের সঙ্গে জোতদারের লোকদের খুব একচোট হয়ে গেছে। আলি মামুদের ভাগ্নে না ভাস্তে, না-কি ভাগ্নীজামাই না ভাস্তিজামাই, অথবা ভাগ্নে-কাম-জামাই কিংবা ভাস্তে-কাম-জামাই—তার মাথা আধিয়াররা এমন করে ফাটিয়ে দিয়েছে যে লোকটা মরে কি বাঁচে তার ঠিক নাই। আহত লোকটির সঙ্গে আলি মামুদের সম্পর্ক নিয়ে ইসমাইল অনেকক্ষণ ধরে মজা করে। তার ধারণা, জোতদার আর তালুকদার আর জমিদারদের সম্পত্তির ওপর লোভের কোনো সীমা পরিসীমা নাই, সম্পত্তি নিজেদের দখলে রাখার জন্যে এরা বিয়েশাদি দেয় সব নিজেদের মধ্যে। সুতরাং আহত লোকটি যখন আলি মামুদ খার ভাস্তে কিংবা ভাগ্নে, তখন বিয়েও দিয়েছে নিশ্চয়ই নিজের অন্য কোনো ভাস্তি বা ভাগ্নীর সঙ্গেই। এখন চাষাদের হাতে ঠ্যাঙানি খেয়ে লোকটা যদি মরে তো আলি মামুদের ভাস্তে কিংবা ভাগ্নেও যায়, আবার জামাইও যায়। একসঙ্গে দুই দুইজন আত্মীয়ের মৃত্যুশোক বেচারা সামলাবে কী করে? শামসুদ্দিন ডাক্তার কি সাদেক উকিল হাজার ক্লিক করেও তখন তাকে উদ্ধার করতে পারবে? না-কি খান বাহাদুরের কাছে এর প্রতিকার তৈরি হয়েই রয়েছে? তবে, ইসমাইল আবার এটাও বলে যে, সম্পত্তি ঠিক থাকলে কোনো সুখ-দুঃখই এদের ধারে কাছে ঘেঁষতে পারবে না।
তেভাগা যদি একবার হয়েই যায় তো সেই দুঃখে এইসব লোক পটাপট হার্টফেল করবে। এখনি তো টাউনে এলে আর বাড়ি ফিরতে চায় না, আলি আহমদ সাহেবের বাড়িতে ধন্না দিয়ে পড়ে থাকে। এই সাহস নিয়ে এরা করে পলিটিকস?
তেভাগা হলে কাদেরের বাপই কি আর খুশি হবে? আলি মামুদের সুখ-দুঃখ ও বিপদ নিয়ে ইসমাইলের এরকম ঠাট্টায় কাদের সায় দিতে পারে না। আলি মামুদ মানুষটা সুবিধার নয়, সে তো বোঝাই যায়। সেদিন ইসমাইলের বাড়িতে বসে কতো হায় হায় করলো, এদিকে তার ভাড়াটে লোকজন যে আধিয়ারদের সঙ্গে লাগতে গিয়ে বেদম মার খেয়ে ভেগেছে, এটা কিন্তু একবারও বললো না।
তার এলাকার ভালো ভালো ওয়ার্কারদের যে মুসলিম লীগ থেকে বের না করে সে ছাড়বে না। কিন্তু যতোই হোক, মানুষটার এতো বড়ো বিপদ নিয়ে এভাবে কথা ইসমাইল না বললেই পারে।
ইসমাইলকে ঘাটানোও তো কাদেরের পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং আলি মামুদের লোভ আর ভয় নিয়ে তাকে অনেক কথা শুনতে হয়। কথার রঙ চড়াতে চড়াতে ইসমাইল তাকে একই সঙ্গে একটি পাকা শয়তান ও আস্ত ভাড় বানিয়ে ছাড়ে। তারপর বাজারের কাছে এসে রিকশায় উঠে তোলে ওই ফেরারি লোকটির কথা।
ঠিক ফেরারি নয়। তবে হাঙামার সময় তাকে দেখা গেছে আধিয়ারদের সঙ্গে। আলি মামুদ খা থানায় ওর নামও দিয়েছে। শামসুদ্দিন ডাক্তার অবশ্য সবই জানে। সেই লোকের বাড়ি পুবের দিকে বাঙালি নদীরও পুবে, যমুনার ধারে কিংবা যমুনার ভেতরের কোনো চরেও হতে পারে। পশ্চিমে খিয়ার এলাকায় সে ধান কাটতে যায় আকালের সময়। ভবঘুরে বাউণ্ডেলে লোকটা নাকি জয়পুর, পাঁচবিবি, আক্কেলপুরের দিকে তেভাগার নেতাদের পিছে পিছে ঘুরতো আর চাষাদের উস্কানি দিতো। এদিককার থানার পুলিস তাকে ধরার ব্যাপারে তেমন গা করছে না, তবে কেউ যদি ঠিকঠাক খবর পৌঁছে দেয় থানায়, তো তাকে ঠিকই ধরা হবে। শামসুদ্দিন ডাক্তার বললো, বাঙালি নদীর পশ্চিমেই নাকি তাকে কোথায় দেখা গেছে।
আবদুল কাদের অনেক ভেবেও এরকম কোনো লোককে মনে করতে পারে না।
ইসমাইল আরেকটু হদিস দেয়, লোকটা নাকি গান করে। চাষাদের মধ্যে গান। করতো। আলি মামুদ নিজে তাকে গান করতে দেখেছে।
বুড়া মানুষ? এক ফকির ছিলো, চেরাগ আলি। তার বাড়িও পুবের দিকে। যমুনায় তার বাড়িঘর ভেঙে ফেললে আমাদের ওখানে এসে উঠেছিলো। তার নাতনিকে বিয়ে দিয়েছে গিরিরডাঙারই এক মাঝির সঙ্গে। ওই মাঝির ছেলেকে আপনি দেখেছেন। তমিজ, মাঝির আগের পক্ষের ছেলে। তা এ বুড়া ফকির বহুদিন থেকে নিরুদ্দেশ।
আরে না, অল্প বয়েস। আলি মামুদ আমাকে পরশুদিন বললো, একটু খেয়াল রেখো।
খবর পেলে কি পুলিসে ইনফর্ম করবো?
পুলিসে জানাবে? পলাতক চাষা-কাম-গায়ককে নিয়ে ইসমাইল ভবনায় পড়ে। শ্যাওড়াপাড়া সাবগ্রাম থেকে শুরু করে বাঙালি নদী পার হয়ে যমুনার পশ্চিম তীর পর্যন্ত চমৎকার অর্গানাইজ করা গেছে। এদিককার রিপোর্ট পড়ে হাশিম সাহেব সোহরোওয়ার্দি সাহেব খুব খুশি। পুব এলাকায় তেভাগার গোলমাল নাই। এদিকে বড়ো জোতদার কম, প্রচুর জমির মালিক শিমুলতলার তালুকদাররা, তা ওটা হলো ইসমাইলের শ্বশুরবাড়ি। ওদের বিরুদ্ধে যাদের ক্ষোভ আছে তারা সব ইসমাইলের খাস লোক। এদিকে স্কুল অনেক, ছাত্রদের প্রায় সবাই মুসলিম লীগের কাজ করে। যারা রাজশাহী কি কলকাতা কি এই টাউনেই কলেজে পড়াশোনা করে, বাড়ি গিয়ে তারাও পাকিস্তান জিন্দাবাদ করে বেড়ায়। কিন্তু ফেরারি আসামি যদি গ্রামে গ্রামে উস্কানি দিয়ে বেড়ায় তো গোলমাল দানা বাঁধতে কতোক্ষণ? চাষার গো বড়ো ভয়ানক জিনিস। জয়পুর, পাঁচবিবি, আক্কেলপুরের কর্মীদের কতো বলেছে ইসমাইল, একটু সবুর করা, পাকিস্তান হলেই জোতদারদের আঁটো করা হবে। এ্যাসেমব্লিতে জমিদারি উচ্ছেদের বিলের সঙ্গে তেভাগার বিলও তোলা হবে। মিল্লাত পত্রিকায় এরকম কথা লেখাও হয়েছে। বিল একবার এ্যাক্টে পরিণত হলে জোতদাররা বাপ বাপ করে দুই ভাগ ধান তুলে দেবে আধিয়াদের গোলায়। কোনো আধিয়ারকে উচ্ছেদ করা যাবে না।-নাঃ! কে শোনে কার কথা? আরে এসব কথা তো আর পাবলিক মিটিঙে ঘোষণা করা যায় না। জোতদারদের তো হাতে রাখতে হবে অন্তত ইলেকশন পর্যন্ত তো বটেই। তারপর আইনের মধ্যে দিয়ে তেভাগা প্রতিষ্ঠিত হলে চাষীর অধিকার নষ্ট করে কে?-নাঃ! কে শোনে কার কথা? স্কুল কলেজের ছেলেদের দলে টানা গেছে, কিন্তু চাষারা গোলমাল করতেই লাগলো। কথা শুনতে হয় ইসমাইলকে। নেতারা বোঝে না, এইসব ছোঁড়াদের বাবা বাছা বলে ধরে রাখতে না পারলে এরা সব লাল ঝাণ্ডার দিকে চলে যাবে। তবে একটা কথা।—ইসমাইল ওই ফেরারি লোকটি সম্বন্ধে নতুন করে ভাবে। ওকে হাত করে নিতে পারলে কাজ হয়। এরকম একটা মানুষ থাকলে আধিয়ারদের সবসময় সঙ্গে পাওয়া যায়।
