নিলাম? মানে? কিসের নিলাম?
টাউনের থানা রোডে অবস্থিত দি নিউ স্বদেশী ভাণ্ডার নামীয় দোকানের কতগুলি প্যাকিং বাকস মধ্যস্থিত দ্রব্যাদি (সাধারণতঃ তৈল, সাবান, চা, কালী, পাউডার, সিন্দুর, সেন্ট প্রভৃতি) এবং উত্তম বিলাতি ল্যাম্প দি কুবের ব্যাংক লিঃ-এর প্রাপ্য অর্থ আদায় করার নিমিত্ত ব্যাংকের বড়গোলাস্থ মোকামে নিম্নবর্ণিত তারিখ ও সময়ে প্রকাশ্য নিলামে সর্বোচ্চ মূল্যে বিক্রয় হইবে। ক্রয়করনেচ্ছুক সৰ্ব্বসাধারণের উপস্থিতি প্রার্থনীয়।
সাপ্তাহিক প্রজাবাহিনী ইসমাইলের পছন্দ নয়, ভাঙাচোরা কৃষক প্রজা পার্টির পয়সাওয়ালা কিছু লোক এখনো ছেপে চলেছে, এদের টার্গেট মুসলিম লীগ। বুড়োগুলোর ওপর হক সাহেবের ছায়া লেপ্টেই থাকে। কাদেরের বাপ নিশ্চয়ই এটার গ্রাহক। ইসমাইল নিজে এটা নিয়মিতই পড়ে, কিন্তু দলের কর্মীদের হাতে দেখলে ভুরু কেঁচকায়। কাগজটা টেবিলে একটু ঠেলে রেখে ইসমাইল বলে, স্বদেশী ভাণ্ডার মানে অখিলবাবুর দোকান, অখিল কুণ্ডু। বাপ মারা গেলে ছেলেরা ভাগাভাগি করে ফেললো, এটা মনে হয় ছোটো ছেলে প্রতাপের। লক্ষ্মীছাড়াটা দোকান রাখতে পারলো না।
দোকানটা সম্বন্ধে ইসমাইল যথেষ্ট ওয়াকিবহাল দেখে কাদেরের আশা হয়, নিলাম সে-ই ডাকতে পারবে কিন্তু ইসমাইল বলে, তা তুমি এসব জিনিস দিয়ে করবে কী? তুমি কি সেন্ট মাখো নাকি আজকাল? প্যাকেট প্যাকেট তেল সাবান মাখবে কী করে?
কাদের কাচুমাচু হয়ে বলে, তা নয়। ধরেন গোলাবাড়ি হাটে আমার দোকানঘরেই একটা সাইডে এই মালগুলি বিক্রির ব্যবস্থা করলে কেমন হয়?
গ্রামে স্টেশনারি দোকান? কিনবে কে? ইংলিশ ল্যাম্প কেনার মানুষ তোমাদের গ্রামে কোথায়? এর চিমনি খুলতে গেলে ভেঙে ফেলবে, হাতও কেটে ফেলবে।
ল্যাম্প আবদুল কাদের কিনতে চায় নিজের বাড়ির জন্যেই। ইসমাইলের বাড়িতে ঘরে ঘরে এই বাতি জ্বলে। কাচের ডোমের ভেতর আলো হয় কেমন নরম সাদা, একটা জুললে ঘরের চেহারা পাল্টে যায়। টাউনের লোকজন যে জিনভূতকে তেমন আমল দেয় না সে তো এই আলোর জন্যেই। টাইনে সন্ধ্যা লাগতে না লাগতে মিউনিসিপ্যালিটির লোক মই নিয়ে রাস্তার মোড়ে মোড়ে বাতি জ্বালিয়ে যায়। সিনেমা হলের সামনে জ্বলে ডায়নামোর বিদ্যুৎ, দোকানে দোকানে ঝোলে হ্যাজাক বাতি। এই আলো থাকলে জিন-পরি আসে কী করে? সেদিন হুমায়ুনের ঘরে একটা হ্যাজাক জ্বললে ভাবির চোখের সামনে কাফনের কাপড় জড়ানো ওই মানুষটা কি ঢোকার সাহস পায়?
আলতা দিয়ে কী করবে? বিয়ে টিয়ে করার মতলব নাকি?
আবদুল কাদের মেঝের দিকে চোখ রেখে লাজুক হাসি ছাড়লে ইসমাইল তার বিয়ের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে ফের বলে, আর সিঁদুর? তোমাদের বাড়ির মেয়েরা সিদুর পরে নাকি?
কী যে বলেন। আমরা মোহাম্মদি জামাতের মানুষ, বেদাত শেরেকি কাম কি আমরা করবার পারি?
ইসমাইল হো হো করে হাসে। এই অট্টহাসি আবদুল কাদের বাড়িতে চেষ্টা করেও রপ্ত করতে পারে নি। এসব বোধহয় ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া। হাসি থিতিয়ে এলে ইসমাইল বলে, ওইসব মোহাম্মদি আর হানাফির বাহাস তোমাদের আজও গেলো না? মুসলমানদের মধ্যে তোমরা কি কাস্ট সিস্টেম চালু করতে চাও নাকি? এই নিয়ে এখন তার অনেক ঠাট্টা করার কথা, কিন্তু নিলামে আবদুল কাদেরের শৌখিন জিনিসপত্র কেনার হাউসের কথা সে ভোলে না, তা হলে সিঁদুর দিয়ে করবেটা কী? তোমাদের ওই বিলে জিন ভূত একটা কী আছে, তারই পূজা করবে নাকি? ওটা শেরেকি কাজ হলো না? . কালাহার বিল নিয়ে কাদেরই অনেক গল্প করেছে। তার বাপ এটা পত্তন নিয়েছে, এটা তাদের পারিবারিক সম্পত্তি। বিলের উত্তর সিথানে পাকুড়গাছে বসে মুনসি তাদের বিলের ওপর, বিলের দুই ধারের গিরিরডাঙা-নিজগিরিরডাঙার ওপর নজর রাখছে। মুনসির নেকনজরে আছে বলেই তাদের আয় উন্নতি। বালা মুসিবত থেকে বেঁচেও থাকে। তারা মুনসির হুঁশিয়ার চোখের জন্যে। তাদের বাড়ির শিমুলগাছের সাদা বকের ঝকও তো মুনসির পোষা, তারা তার হুকুমে আকাশে ওড়ে, আবার বিল তদন্ত করে ফিরে আসে তারই ইশারায়। মুনসিকে নিয়ে ইসমাইলের এ রকম ঠাট্টামজাক শুনে কাদের প্রথম প্রথম খুব কষ্ট পেতো। আজকাল অস্বস্তি লাগে। আবার কেমন ভয় ভয় করে, ইসমাইলের ওপর মুনসির নিনজর পড়বে না তো?
এই ঠাট্টা করার স্বভাবের জন্যে মুরুব্বি মানুষেরা ইসমাইলের সামনে উসখুস করে, অনেকেই তাকে পছন্দ করে না। আবার গ্রামে গেলে গরিব মানুষের সঙ্গে কি লীগের ওয়ার্কারদের সঙ্গে তার গল্পগুজব অন্যরকম, সেখানে তাকে নিয়ে ঠাট্টাইয়ার্কি করলেও সে মহা খুশি। লোকটার বাকাচোরা কথাবার্তা সহ্য করতে পারলে তার কাছে সাহায্য পাওয়া যায়। পারুক চাই না পারুক, মানুষের জন্যে তদবির করতে ইসমাইল মহা পটু। এই যে মুনসিকে নিয়ে এতো সব খারাপ খারাপ কথা বললো, আবার টিন থেকে সিগ্রেট নিয়ে ধরাতে ধরাতে বলে, কুবের ব্যাংকের ম্যানেজার তো গোপেনবাবু। বাবার বন্ধুর ছেলে। বীরভূমের লোক, আমরা সিউড়িতে থাকতে বাবার সঙ্গে গোপেনদার বাবা নলীনাক্ষ কাকার খুব মেলামেশা ছিলো। চলো তো, গোপেনদাকে বলে দেখি। নিলামের বিট আবার কী? ম্যানেজার যাকে চাইবে তাকেই দিতে পারে।
কিন্তু আবদুল কাদেরকে ইসমাইল সেদিন শামসুদ্দিন ডাক্তারের কাছে শোনা গোপন কথাটি বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে। ব্যাপারটা কী?–একটা লোক সম্বন্ধে কাদেরকে একটু খোজখবর নিতে হবে।
