কিন্তু ইসমাইল সাহেব, আপনার পার্টির প্রোগ্রাম ইমপ্লিমেন্ট করতে হলে ইলেকশনে আসতে হবে না? শামসুদ্দিন ডাক্তারের আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে, গ্রামের মুরুব্বিদের সর্বনাশ করে আপনি ভোট পাবেন না। হিন্দু ক্যানডিডেট সব আসবে কংগ্রেস থেকে, ওদের ইউনিটি আছে। মুসলিম কনষ্টিটিউয়েনসিতে জোতদাররা আমাদের সাপোর্ট নাও দিতে পারে, আমাদের ওয়ার্কাররা ওদের জমি লুট করবে আর ওরা আমাদের পক্ষে থাকবে, এটা আশা করেন কীভাবে? কংগ্রেস, কৃষক প্রজা পার্টি মুসলিম ক্যানডিডেট দেবে। দেবে না? মুসলমান ভোট ভাগ হয়ে গেলে কে আসবে। শিওর করে বলতে পারেন? গ্রামে ভোট অর্গানাইজ করবে কারা? কারা করবে?—গ্রামের মুরুব্বিরাই তো, না কী?
ইসমাইল একটু গম্ভীর হয়ে পড়লে সাদেক উকিল বলে, জোতদারদের ধান লুট করা কি মুসলিম লীগের প্রোগ্রামের মধ্যে আছে নাকি? ইসলামে কি এসব লুটপাট জায়েজ করা হয়েছে?
ইসমাইল চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। তাদের দলের ভালো ভালো কর্মীদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছে কম্যুনিস্ট পার্টি,এটা তো ঠিক হচ্ছে না। আর ইলেকশনে গ্রামের মাতব্বররা বড়ো ফ্যাক্টর। ছাত্রজীবনে মেয়র ইলেকশনে কাজ করতে গিয়ে দেখা গেছে, কলকাতার শিক্ষিত মানুষও ভোট দেয় দল বেঁধে। তাদের মুরুব্বি আছে, সমাজ আছে, সমাজের ভেতর উপ-সমাজ আছে। ইলেকশন করতে গেলে এসব খেয়াল করতে হয়। এখানে ভোটার হলো পাড়াগাঁয়ের মানুষ। তাদের মধ্যে আবার ছয় আনা ট্যাকস দেয় যারা ভোট দেবে কেবল তারাই। বিয়েশাদি, আকিকা, মুর্দার দাফন, চেহলাম, ভোট এসব তারা করে সমাজ মেনে।
কম্যুনিস্টদের সঙ্গে কাজ করছিলো এরকম কিছু ছেলে লীগে আসায় তার খুব ভালো লাগছিলো। জেলার পশ্চিমে কয়েকটা জায়গায় তেভাগার বেশ জোর, এই ছেলেগুলোকে ধরে রাখতে না পারলে এরা সবাই তো কম্যুনিস্ট হয়ে যাবে। এই বুড়োগুলো এটা বোঝে না কেন? আবার সে নিজে কম্যুনিস্ট না হয়েও যদি গরিব মুসলমানদের কিছু হেলপ করতে পারে কম্যুনিস্টদের সাহায্যে, তাতে তো বরং তার দলেরই লাভ। ওর ছেলেবেলার বন্ধু অজয় আর ওর বোন প্রতিমা তো তার রেডক্রসের দুধ বিলি করতে। মেলা সাহায্য করলো। ফেমিনের সময় ইসমাইল কতো লোককে দাফন করেছে, তখন এইসব বুড়ো ছিলো কোথায়? বীরেন, সমীর, সুকুমার এরাই তো সঙ্গে সঙ্গে থাকতো। গোলাবাড়িতে মুসলিম লীগের সাইনবোর্ড লটকানো কাদেরের দোকান থেকে রেডক্রসের রিলিফের মাল দিলো, এই নিয়ে কংগ্রেসের লোকজন তো ওপরে নালিশও করেছিলো। রেডক্রসের বৃটিশ সাহেব এই ব্যাপারে ইনকুয়ারি করতে এলে অজয়ই তো ইসমাইলের পক্ষে মেলা যুক্তি খাড়া করিয়ে সাহেবকে বুঝিয়ে দিলো। সবই ভালো—কিন্তু তার দলের ছেলেদের দিয়ে ওরা যদি মুসলমানদের মধ্যে ডিভিশন তৈরী করে তো পাকিস্তান দূরের কথা, মুসলিম লীগ টিকিয়ে রাখাই মুশকিল হবে।
ইসমাইলের এই নীরব অস্বস্তিকর ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে চলে সাদেক উকিলের সরব সিদ্ধান্ত, আপনারা ভাববেন না। আপনাদের ওদিকে মিটিং অর্গানাইজ করেন। ইসলামিক ইডিওলজি ভালো করে বোঝাতে হবে। তাহলেই ওসব লুটপাতের ভুত ঝাড়ানো যাবে। তার ছাড়া ছাড়া কথাগুলোই ইসমাইলকে বেশ ভাবনায় ফেলেছে দেখে নিজের সাফল্যে তৃপ্ত হয়ে সে বেশ লম্বা ডায়ালগ ছাড়ে, লেট আস আর্নেস্টলি হোপ এ্যান্ড ট্রাস্ট দ্যাট দি মোস্ট নোবল টিচিং এ্যানড একজাম্পলস অফ আওয়ার হোলি প্রফেট উইল বি ফলোড বাই অল দি মুসলমানস, দ্যাট ইজ ল্যান্ড টিলার্স এ্যান্ড শেয়ারক্রপার্স, জোতদারস এ্যান্ড লাভলর্ডস, পুওর এ্যান্ড রিচ, এড়ুকেটেড এ্যান্ড ইললিটারেট নট ওনলি অফ দি এরিয়া উই আর টকিং এ্যাবাউট বাট গ্রুআউট দি লেংথ এ্যান্ড ব্রেডথ অফ ইনডিয়া। ব্রাদার্স, নেভার ফরগেট দ্যাট ইসলাম ইজ এ ফুল কোড অফ লাইফ। ইট গিভস আস এভরিথিং উই নিড। ইট অফারস আস দি উইপন টু ফাইট ফর পাকিস্তান হুইচ রিমেইনস আওয়ার গোল টিল উই এ্যাচিভ ইট।
ইসমাইল হোসেন যথেষ্ট কোণঠাসা হয়েছে বিবেচনা করে শামসুদ্দিন ডাক্তার ব্যাপারটা এখানেই খান্ত করতে চায়। ইসমাইলটা চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলে বেশি। খান বাহাদুরের সামনে প্রায়ই বেয়াদব হয়ে পড়ে, মুসলিম লীগকে নবাব নাইটদের পকেট থেকে বের করে আনতে হবে বলে তড়পায়। খান বাহাদুরের সামনে তাকে এমনি ঘায়েল করতে পারলে কাজের মতো কাজ হতো একটা! এতো খানদানি লোকটাকে ইসমাইল কম বেইজ্জত করে না। আগে মুসলিম লীগের অফিস ছিলো খান বাহাদুরের বাড়িতে, এই ইসমাইল এখানে এসে জোর করেই ঝাউতলায় অফিস ভাড়া করলো, লোহার প্যাচানো সিঁড়ি দিয়ে দোতলার সেই খুপরি ঘরে উঠতে খান বাহাদুর হাঁপিয়ে যায়। ফর্সা টকটকে মানুষ, লাল হয়ে যায়। একদিন তার সামনে একে একটু শিক্ষা দিতে হবে। আজ এই পর্যন্তই থাক। একে ঘায়েল অবস্থায় দেখে যাওয়াই ভালো। সাদেক উকিলের লম্বা ইংরেজি ডায়ালগে গেঁয়ো জোতদারগুলো আর ওয়ার্কাররা একেবারে মুগ্ধ হয়ে রয়েছে। ইসমাইলকে ইংরেজি বলার সুযোগ দিলে এই মুগ্ধতা স্থানান্তরিত হতে পারে। ঝুঁকি নেওয়ার দরকার কী?
সবাই উঠে দাঁড়ালে শামসুদ্দিন ডাক্তার ইসমাইলকে একটু তফাতে ডেকে নিয়ে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে কী যেন বলে।
১৯. ডাক্তার শামসুদ্দিন খোন্দকার
ডাক্তার শামসুদ্দিন খোন্দকারের ওই গোপন কথাটি ইসমাইল আবদুল কাদেরকে জানায় সপ্তাহখানেক পর। উত্তরবঙ্গের প্রজাসাধারণের একমাত্র মুখপত্র সাপ্তাহিক প্রজাবাহিনীতে দি কুবের ব্যাংক লিঃ-এর একটি নিলামের বিজ্ঞাপন দেখে সেদিন টাউনে যাচ্ছিলো আবদুল কাদের, হোসেন মঞ্জিলে ঢুকলো ইসমাইলের সঙ্গে একটু পরামর্শ করতে। খাকি প্যান্ট, ছাই রঙের কোট পরে ও সোলার হ্যাট হাতে ইসমাইল বেরুচ্ছিলো, কাদেরকে দেখে বাড়ির ভেতরের দিকে মুখ করে দুই কাপ চায়ের জন্যে হাঁক দিয়ে বারান্দায় বসলো চেয়ার টেনে।
