খান বাহাদুরের দুর্বলতার কোনোরকম প্রকাশ ডাক্তার শামসুদ্দিন খোন্দকারের। নিজের অপদস্থ হওয়ার সামিল। সে তাই বিরক্ত হয়ে বলে, আরে আলতাফ মিয়া, অতো ভয় পান কেন? দুশ্চিন্তা তো খান বাহাদুর করেন না, দুশ্চিন্তায় মরেন আপনারা। অতো ঘাবড়ান কেন? দেখেন না, সপ্তাহখানেকের মধ্যে নাজিমুদ্দিন সাহেব আসবেন বালুরঘাট। আমাদের খান বাহাদুর সাহেবও যাবেন। ঢাকা ফেরার পথে খান বাহাদুর যদি নাজিমুদ্দিন সাহেবকে এদিকে এনে জয়পুর কি শান্তাহারে একটা মিটিং করাতে পারেন তো তাতেই কাজ হবে। ভালো একটা মিটিং হলে এইসব ছোঁড়াদের পিটিয়ে গ্রামছাড়া করা যাবে।
আরে রাখেন! ইসমাইল তাকে কিংবা নাজিমুদ্দিন কিংবা দুজনকেই উড়িয়ে দিতে পাশের টেবিলে জোরে চাপড় মারে। টেবিলের ওপর কাপ পিরিচ ঝনঝন করে বাজলে তার প্রভাব পড়ে ইসমাইলের গলায়, ওইসব ছেলেদের হোস্টাইল করে রেখে নাজিমুদ্দিন শান্তাহারে নামতে পারবে? জয়পুর দিয়ে পাস করতে পারে কি-না দেখেন। ইন ফ্যাক্ট, দে আর আওয়ার বেস্ট ওয়ার্কার্স ইন দি হোল ডিস্ট্রিক্ট।
আলতাফ মণ্ডল উঠে দাঁড়াবার ভঙ্গি করে, তাহলে আর কী? আপনারা ওই চ্যাংড়াপ্যাংড়াক লিয়াই থাকেন। হামরা আর থাকি ক্যাংকা করা?
ডাক্তার তার হাত ধরে বসিয়ে দেয়, আরে, পলিটিক্স করেন, এতো রাগ করলে চলে? বসেন।
ভালো করে বসেও আলতাফ মণ্ডলের রাগ আর পড়ে না, হামরা কি আর পলিটিক্স করি? পাড়াগাঁয়ের মানুষ, পলিটিক্সের হামরা বুঝি কী? আপনারা পাকিস্তানের কথা কন, পাকিস্তান হলে এসলামের ইজ্জত হয়, মোসলমানের মাথাটা উঁচা হয়। এসলামের খেদমত করলে আল্লা খুশি হয়, লিজের জানটাও শান্তি পায়। তাই কৃষক প্রজা বাদ দিয়া নাম লেখালাম মুসলিম লীগের খাতৃত। হায় আল্লা, এখন দেখি, আল্লারসুল মানে না, নামাজরোজার তো ধারই ধারে না, এইসব মানুষের পিছে ছোটে যিগলান চ্যাংড়া আপনারা লীগের চাবি দিয়া থুছেন সেইগুলার হাতে। ঠিক আছে, লীগ পাট্টি তারাই করুক।
আলতাফ মণ্ডলের কথার ঝঝে সবাই একটু নড়েচড়ে বসলে আলি মামুদ খা খুব খুশি হয়, আবার মণ্ডলের এক নাগাড়ে এতো কথা বলার শক্তিতে তার হিংসাও একটু হয়। সে বলে, লাল লিশানের পাট্টির চ্যাংড়াপ্যাংড়া লিয়া আপনার লীগের ফায়দা হবি না। গণেশতলাভহামার মামুগোরে জমি বর্গা করে এক চাষা, তার বেটা, বুধা করা কয়, এক্কেরে হালুয়া চাষা, উঁই একজোট হছে ওই তেভাগার হুজুগেত। শালা হালুয়া চাষার বেটা, আল্লারসুল তো মানেই না। সেটা আল্লাই বিচার করবি, ছোঁড়া লিজের আখেরাত লিজেই খোয়ায়, হামার কী?—কথা সেটা লয়। কথাটা কী তাই বলতে গলার স্বর একটু নামায় সে, আপনারা বিশ্বাস করবেন না। হামার মামু লিজে কছে। মামু হামার হাজি মানুষ, নামাজ কাজা করে না। মিছা কথার মানুষ লয়। সত্যবাদী মামার সরবরাহকৃত তথ্যটি জানাতে তার গলা নামে আরো নিচে, ফিসফিস করে বলে, বুধা শালা কাছিমের মাংসও খায়! হারামখোর শালা! তারপর তার গলায় ফের জোর আসে, ইগলান মানষেক ইমাম মানিচ্ছে আপনার মুসলিম লীগের চ্যাংড়াপ্যাংড়া।
এদের সোজা এক্সপেল করে দেওয়া হবে। কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে ডাক্তার শামসুদ্দিন খোন্দকার, এসব তো আর ছেলেখেলা নয়। সামনে ইলেকশন, আধিয়ার চাষার হাতে ভোট কটা আছে? ছয় আনা ট্যাক্স দেয় কয়জন?
ইসমাইল বলে, কিন্তু মুসলিম লীগের প্রোগ্রামে তো চাষীদের দাবিই বেশি। বিনা খেসারতে জমিদারি উচ্ছেদ—
কিন্তু আমাদের মজিদ সরকার, আলফাত মণ্ডল, আলি মামুদ খা এঁরা কি কেউ জমিদার? না মহাজন? জমিদারদের খাজনা দিতে এদের জান বেরিয়ে যাচ্ছে। এড়ুকেশন সেস ধরেছে জমিদারের ওপর, জমিদার এই টাকা জোগাড় করবে কোত্থেকে?
প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারের জন্যে ধার্য এড়ুকেশন সেসের চাপে জমিদাররা একেবারে হেলে পড়েছে, সেই হাহাকার এরা একটু আগে শুনে এসেছে খান বাহাদুর সৈয়দ আলি আহমদের অসহায় কঠে। খান বাহাদুরের এমন সংকটে এরাও খুব দুঃখিত। তবে দুঃখের আর একটি কারণ হলো এই যে, ওই খাজনা তো জমিদার আদায় করবে প্রজাদের ঘাড় ভেঙে। চাষারাই কী কেবল প্রজা? বড়ো প্রজা তো জোতদার। ইসমাইল কি ওই বেয়াদব ছোঁড়াদের বোঝাতে পারে না যে, জোতদাররাও কেমন জুলুমের শিকার?
খান বাহাদুরের ওখানে নিজের বেদনার জন্যে চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাসটি মজিদ সরকার ছাড়ে এখানে, আমাদের উপরে জুলুম দুই দিক দিয়া। জমিদার লিত্যি খাজনা ধরে। ফ্লাউট কমিশন রেপোট দিলো, কই কিছু তো হয় না। জমিদারি উচ্ছেদ তো হামরাও চাই। আবার দেখেন লিচের দিকের বিপদ, জমির ফসল লিয়া যাচ্ছে আধিয়াররা। হামরা এখন করি কী? উদিন কবির তরফদার সাহেব কলেন, কৃষক প্রজা পার্টি কৃষকের দিকে দেখে, প্রজার দিকেও দেখে। বড়ো প্রজা কারা?-আপনারাই কন।
সাদেক উকিল ভয় পায়, এরা আবার নতুন করে কৃষক প্রজার সঙ্গে না ভেড়ে, আরে ওটা একটা পার্টি হলো? হক সাহেব আউট, পার্টিও শেষ। ইনডিয়ান মুসলমানের পার্টি একটাই। অল ইনডিয়া মুসলিম লীগ।
তা তো বটেই। ইসমাইল সুযোগ নেয়, মুসলমানদের মধ্যে মেজরিটি তো চাষাই। লীগের দাবির বেশিরভাগই তো চাষাদের জন্যে।–কম্পালসারি ফ্রি প্রাইমারি এড়ুকেশন হলে স্কুলে যেতে পারবে তো তাদের ছেলেমেয়েরাই। হাটে এগ্রিকালচারাল প্রোডাক্টস বিক্রির সময় টোল বন্ধ করার দাবি। সবই তো তাদের জন্যেই। তাদের ছেলেরা পার্টির ওয়ার্কার তো হবেই।
