তিন হাজার বিঘা জমির মালিকের সর্বস্বান্ত হওয়ার সম্ভাবনায় সবাই খুব চিন্তিত। তাদের সমবেত দীর্ঘশ্বাস পড়ে, এই দীর্ঘশ্বাস ইসমাইলের প্রতি প্রতিবাদ প্রকাশও বটে। কারণ ওই এলাকায় ওইসব ছোটলোকদের লীগে ঢোকার সুযোগ করে দিয়েছে ইসমাইল। ইসমাইল হোসেন আসলে পুব এলাকার মানুষ। তাও আবার দুই তিন পুরুষ টাউনের বাসিন্দা। কিছুদিন আগে পর্যন্ত সে ছিলো কলকাতায়। জেলার কোথায় কী হাল সে তার জানেটা কী? তখনি তাকে ইশারা দেওয়া হয়েছিলো, দল করতে গিয়ে যে সে মানুষের কাছে যাওয়াটা পরে দলের জন্যে বিপজ্জনক হতে পারে। ইচ্ছেও তো তাই।
ইসমাইল কোণঠাসা হয়েছে বুঝতে পেরে ডাক্তারের উত্তেজনায় মেশে উল্লাস, কিন্তু নিজেকে সংযত রেখে সে ছোটো ছেলেকে বোঝাবার ভঙ্গিতে ইসমাইলকে বলে, মজিদ সরকার, আলি মামুদ খাঁ, আলতাফ মণ্ডল, আবুল হোসেন, মোহাম্মদ হোসেন পাইকার এরা আজকের বড়োলোক নয়, একেকটা থানা জুড়ে এদের প্রতিপত্তি। এদের মতামত নিয়ে ওইসব এলাকার পুলিস যায় চোর ডাকাত ধরতে। এদের সম্পত্তিতে গতর খাটিয়ে সমস্ত এলাকার মানুষের রেজে আসে। এমন কি পুব এলাকার চাষারা ধান কাটার সময় রোজগার করতে যায় এদের জমিতেই। এখন এইসব মাথা মাথা মানুষের মাজা ভেঙে দিলে ওখানে মুসলিম লীগ করবে কে? ওইসব বেয়াদব ছোটোলোকদের কাছে লীগকে বন্ধক দিলে পাকিস্তান টাকিস্তান সব ফাঁকি।
ইসমাইল এর মধ্যে নিজেকে অনেকটা সামলে নিয়েছে, আরে রাখেন। জয়পুর, আদমদিঘি, পাঁচবিবি, আক্কেলপুরে ফর্টি ওয়ানে আমরা গিয়েছি না? আবুল হাশেম সাহেব এসেছিলেন, মনে আছে ডাক্তার সাহেব?
কিন্তু ডাক্তার শামসুদ্দিন খোন্দকারের স্মরণশক্তির পরীক্ষা না নিয়েই সে বলে চলে, ওদিকে কোনো জোতদারের কোঅপারেশন পাওয়া গেলো না। শ্যামা-হক ক্যাবিনেট, বড়োলোকরা অন্যদিকে ঝুঁকতে ভয় পায়। আরে ভাই, কোথাও মিটিং করা যায় না। পাঁচবিবিতে নাসের মণ্ডল খুব পাওয়ারফুল লোক, তিনি আছেন কম্যুনিস্টদের সঙ্গে। তিন বছর আগের কথা বলতে বলতে ইসমাইল চাঙা হয়ে ওঠে, শেষকালে নাটোরের উকিল কিরণ বাবুর সঙ্গে দেখা হলে তিনি বললেন, কিরণ মৈত্র, পুরনো কংগ্রেসি, বললেন, নাসির মণ্ডলকে ভালো করে ধরো, তাঁকে হাত করতে পারলে তোমাদের মিটিং হবে। তো গেলাম। বুড়ো কি রাজি হয়?
এই গল্প ডাক্তার ও সাদেক উকিলের জন্যে অস্বস্তিকর, নাসির মণ্ডল এদের কাউকেই এ পর্যন্ত তার এলাকায় ঢুকতে দেয় নি। সাদেক উকিল অস্বস্তি কাটাতে বলে, আরে আপনার নাসির মণ্ডলকে তো আমি এক হাত নিলাম একবার শান্তহারে। বললাম, আপনারা লড়াই করেন আল্লার বিরুদ্ধে, আমরা জেহাদ করি আল্লার হুকুমত কায়েম করতে। ইসলাম ইজ এ ফুল কোড–। এবারেও তার ভাষণ অসমাপ্ত থাকে ইসমাইলের কথার তোড়ে, আঃ! শোনেন না। আমি গিয়ে বুড়োকে বললাম, মণ্ডল সাহেব, আপনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েও যদি কম্যুনিস্টদের শেলটার দিতে পারেন তো আমরা কী দোষ করলাম? আমাদের মিটিং প্রিজাইড করবেন আপনি। আমাদের বিরুদ্ধে যা ইচ্ছা তাই বলবেন। কিন্তু আমাদের নেতাকেও বলতে দিতে হবে। বুড়ো তখন রাজি। নিজের লোকজন নিয়ে মিটিং অর্গানাইজ করালেন। হাশেম সাহেব পাক্কা দেড় ঘণ্টা বক্তৃতা করলেন। দারুণ রেসপন্স পাওয়া গেলো। আমরা তো চাষীদের কথাই বললাম। কয়েকটা ইয়াং ছেলে, চাষী ঘরের ছেলে, আমাদের সঙ্গে জয়েন করলো। ওদের দিয়ে লোকাল কমিটি ফর্ম করে রাত্রে নাসির মণ্ডলের বাড়িতে ভুরিভোজন সেরে দার্জিলিং মেলে নামলাম শান্তাহার।
বুঝলাম। কিন্তু ছেলেগুলো কি আসলে আমাদের ইডিওলজিতে সাদেকের কথায় ফের বাধা দেয় ইসমাইল, তার গল্প এখনো শেষ হয় নি, শোনেন না! শান্তাহারে নেমে দেখি কিরণবাবু। আমাদের মিটিঙের খবর শুনে মহা খুশি। শান্তাহার রেলওয়ে এন্টারটেনমেন্ট রুমে আমাদের লাঞ্চ করালেন। এতে খুশি কেন? তাহলে এবার তারা কংগ্রেসের মিটিং করতে পারবেন। করুন। আমাদের কী? হিন্দুরা যতো খুশি কংগ্রেস করুক। মুসলমান ছেলেরা তো আমাদের সঙ্গেই চলে এলো। ওই মিটিংটা না হলে ঘোড়াগুলোকে কম্যুনিস্ট পার্টি থেকে সরানো যেতো?
সরিয়ে লাভ কী হলো? ইসমাইল হোসেনের কৃতিত্বকে নস্যাৎ করার উদ্যোগ নেয় সাদেক উকিল, ওদের মাইন্ড তো চেঞ্জ করতে পারলেন না। পাকিস্তানের ইডিওলজি কি ওরা মেনে নিয়েছে?
মাঝখান থেকে মুসলমান ভদ্রলোকেদের বিপদে ফেললেন। মুসলিম লীগের মেম্বার হয়ে মুসলমানদের মধ্যে ডিভিশন তৈরি করতে উঠে পড়ে লেগেছে। ডাক্তারের অভিযাগের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করে চণ্ডিহারের আলতাফ মণ্ডল, কিসের মোসলমান? ওঠাবসা সব সাঁওতালগোরে সাথে। সাঁওতালরা আগে কী সুন্দর বর্গা করিচ্ছিলো, ওরা জমিত হাত দিলেই ফসল, ভাগাভাগির সময় কোনো ক্যাচাল নাই। আপনের এই ছেড়াগুলার পাল্লাত পড়া ওরাও এখন ধান তোলে নিজের ঘরত। সাঁওতাল মোসলমান আধিয়াররা একজোট, আপনের কিসের পাকিস্তান? উপায়ন্তর না দেখ্যা হামরা ডাক্তার সায়েব আর উকিল সায়েবেক ধরা আজ গেলাম খান বাহাদুর সাহেবের দরবারে। তা সাহেব কলেন,।
প্রসঙ্গটি তোলা ডাক্তারের পছন্দ হয় নি। আলতাফ মণ্ডলকে সে থামিয়ে দেয়, আরে তিনি হলেন শরিফ মানুষ। বেন্নার ঘরের বেতমিজ ছোকরাদের সঙ্গে তিনি কথা বলবেন নাকি?
কিন্তু ছোটোঘরের বেতমিজ ছোরাদের ঠেকাতে না পারলে আলতাফ মণ্ডলের ধানপান, জোতজমি; মানইজ্জত সব রসাতলে যায়। বাঁচার জন্যে খড়কুটো ধরতেও সে ব্যগ্র, তা খান বাহাদুর সাহেব মনে হলো খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়েছেন। কলেন, ওরা সব ইসমাইলের লোক। ইসমাইলকে বলেন, ওদের ঠাণ্ডা করুক।
