ভেতরে পাঁচিল ঘেঁষে দুটো গোলঞ্চ, একটা বকুল ও একটা কণকচাঁপা গাছ। প্রতিটি গাছের নিচে দুই থেকে তিনজন লোক দাঁড়িয়ে জটলা করছে। তাদের কেউ কেউ কাদেরের মুখ-চেনা, কিন্তু তারা তাকে আমল না দিয়ে নিজেদের মধ্যে গুজুরগাজুর চালিয়ে যায়। লন পেরিয়ে জোড়া ঝাউগাছের মাঝখানে সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠেও কাদেরের সুবিধা হয় না, সেখানে পেতে রাখা চেয়ার ও বেঞ্চের একটিও খালি নাই। হলঘরের কপাট একটা ভেজানো, আরেকটা প্রায়-খোলা। খোলা কপাটের সামনে দাড়িয়েই কাদের ইসমাইলের হাতের ইশারা টের পায়। ঘরের ভেতরেও বসবার আসন সব ভর্তি। কর্মী গোছের কয়েকজন দাঁড়িয়ে রয়েছে। কাদেরকেও দাঁড়িয়েই থাকতে হয়।
সোফায় বসে অবিরাম কথা বলে চলেছে ডাক্তার শামসুদ্দিন খোন্দকার। জেলা মুসলিম লীগের প্রবীণ নেতা, থার্টি সেভেনে প্রজা পার্টির টিকেটে এম এল এ হয়ে বছর তিনেক পর মুসলিম লীগে জয়েন করে। মানুষটা রাশভারী না হলেও স্বল্পবাক, এ্যাসেম্বলি কিংবা বাইরে কখনো মুখ খোলে না। রোগীদের সঙ্গে প্যাচাল পাড়তে হয় বলে ডাক্তারি ছেড়েছে এম বি পাস করার দুই বছরের মাথায়। এখন রাইস মিল, বাংলা সাবানের কারখানা ও কেরোসিনের ডিলারশিপ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। লীগ অফিসেও তার যোগাযোগ নাই বললেই চলে। রাজনীতি সম্বন্ধে তার চিন্তাভাবনা বা প্রতিক্রিয়া যা প্রকাশ করার সব পেশ করে আসে জেলা মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট খান বাহাদুর সৈয়দ আলি আহমদের দরবারে।
তা সেই মানুষ আজ এসেছে ইসমাইলের বাড়িতে এবং এতোটাই সবাক হয়ে উঠেছে যে, সবাই চুপচাপ তার কথা শোনে। শ্রোতাদের নিরঙ্কুশ মনোযোগে তার বাক্য পায় বাণীর মর্যাদা, সূর্যের চড়া তাপ সহ্য করা যায়। না কী বলেন? কিন্তু তপ্ত বালুতে হাঁটতে গেলে পায়ে ফোস্কা পড়ে। না কী?
শ্রোতাদের মৌনকে সম্মতির লক্ষণ বিবেচনা করে খন্দকার তার বাণীর ব্যাখ্যা শোনায়, বুঝলেন না? সবার দিকে ঘাড় ঘুড়িয়ে শ্রোতাদের বোঝার ক্ষমতা সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে সে বোঝায়, জমিদারের অত্যাচার সহ্য করা যায়। কেন? না, তার আগামাথা আছে, নিয়মকানুন আছে। কিন্তু ছোটলোকরা তো নিয়ম জানে না, আইন মানে না। না কী? এইগুলো হলো বেয়াদব, বেয়াদবের জুলুম গায়ে জ্বলে। জ্বলে না? এখন মুসলিম লীগের ওয়ার্কাররা যদি এদের সঙ্গে থাকে তো পার্টি করতে পারবেন? বলেন, পারবেন? * ইসমাইল তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে, আরে ডাক্তার সাহেব, ওসব হলো তেভাগার এরিয়া। আমাদের ওয়ার্কারদের মধ্যে বর্গা খেটে খায় প্রায় সবাই। এখন অন্য বর্গা চাষীদের তারা অপোজ করে কীভাবে?
এবার ইসমাইলকে উপদেশ দেওয়ার সুযোগ নেয় সাদেক উকিল, ছোঁড়াদের। ডেকে বলে দাও, তোমরা ইসলামের কথা বলো। মাথা গরম না করে পাকিস্তান হাঁসেলের কথা বলো। ইসলাম গরিবদের হক আদায় করে। ইন পাকিস্তান উই উইল ইনট্রোডিউস জাকাত। আল্লা যাকে দৌলত দিয়েছেন সে তার প্রপার্টির টু এ্যান্ড হাফ পার্সেন্ট কন্ট্রিবিউট করবে জাকাত ফান্ডে। ইসলাম ইজ এ ফুল কোড অফ লাইফ। আর কোনো রিলিজিওনে গরিবকে এতো রাইট দেওয়া হয়েছে? আবার কারো প্রপার্টি লুটপাট করাও ইসলাম এ্যাপ্রুভ করে না। কায়েদে আজমের মটোই হলো, লিভ এ্যান্ড লেট লিভ। অর্থাৎ নিজে।
সাদেক উকিলের কথা বলা মানেই বক্তৃতা দেওয়া, তার ইংরেজি বাক্যের বাঙলা অনুবাদ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই শামসুদ্দিন ডাক্তার তার ও কায়েদে আজমের সঙ্গে ঐকমত্য প্রকাশ করে, আমি তো তাই বলি। ওইসব ছোঁড়ারা যা করছে তাতে এলাকার ভদ্রলোকদের পক্ষে আমাদের পার্টিতে থাকা অসম্ভব।
আদমদিঘির মজিদ সরকার বসেছিলো শামসুদ্দিন ডাক্তারের পাশে এবং অনেকটা তার আশ্রয়েও বটে। ইসমাইল তার দিকে মুখ ফিরিয়ে হাসে, দলের ওয়ার্কারদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কি এতোই খারাপ? ওদের ওপর আপনার হোল্ড নেই? অন্তত আপনাকে তো মানবে!
ইসমাইলকে এবার বেশ জুত করে ধরা যাচ্ছে দেখে ডাক্তার পুলকিত হয়, আরে এরা তো সব আপনার রিকুট। বলে পুরো অবস্থাটার বিবরণ দেয় দ্বিতীয়বার। আবদুল কাদের প্রথমবার মিস করেছিলো, কিন্তু অন্যান্য শ্রোতার মনোযোগও তার চেয়ে কিছুমাত্র কম নয়।-জেলার পশ্চিমে অনেকটা এলাকা জুড়ে আধিয়াররা ধান কেটে তুলছে নিজেদের ঘরে। তুলুক। কিন্তু নিজেরাই ধান মেপে এক ভাগ দিতে চায় জোতদারকে আর দুই ভাগ নেবে নিজে। তা এ উৎপাত তো অনেক দিন থেকেই হচ্ছে। টাউনের মানুষ ইসমাইলের তাতে কী? কিন্তু আশঙ্কার কথা হলো এই যে, ওইসব বর্গাচাষীদের অনেকেই মুসলিম লীগের ওয়ার্কার, লীগের লোক বলে তাদের সবাই চেনে। এমন কি আদমদিঘির দুই মাইল পুবে শান্তিগড় বাজারে মুসলিম লীগের সাইনবোর্ড টাঙানো ঘরটিও ওদেরই দখলে।—এরা নিজেরা জোতদারদের পাওনা তো দিচ্ছেই না, এমন কি কম্যুনিস্টদের সঙ্গে ভিড়ে ধান সব নিজ নিজ ঘরে তোলার জন্যে নিরীহ গ্রামবাসীদের উস্কানি দিচ্ছে; ফলে পাকিস্তান ইস্যু মার খাচ্ছে। এলাকার ভদ্রলোকদের সাপোর্ট ছাড়া দল টেকে কী করে?
সাদেক উকিল তার বক্তৃতা সম্পূর্ণ করার আশা ছেড়ে দিয়ে একটু রাগ করেই পড়তে শুরু করে দিয়েছিলো আগের দিনের দৈনিক আজাদ। দার্জিলিং মেলে কাগজটা টাউনে পৌঁছুবার সঙ্গে সঙ্গেই সে নিশ্চয়ই এটা তন্ন তন্ন করে পড়ে ফেলেছে। এই দৈনিকের চিঠিপত্র কলামে স্থানীয় সমস্যা, স্কুল স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা, ইসলামের আলোকে নানা সমস্যার সমাধান প্রভৃতি বিষয়ে তার লেখা ছাপা হয় তিন মাসে অন্তত একবার। সাদেক এখন কাগজের কোন পৃষ্ঠা পড়ছে আড়চোখে তাই দেখে নিয়ে নিশ্চিত হয়ে কথা বলছিলো শামসুদ্দিন ডাক্তার। কিন্তু এবার বাধা আসে অন্যদিক থেকে। মজিদ সরকার কথা বলতে চেষ্টা করছিলো অনেকক্ষণ ধরে, এবার সে ডাক্তারের দীর্ঘ কাশিজনিত বিরতির সুযোগ নেয়, হামাগোরে সর্বস্বান্ত করা দিলো। আরে হামার বর্গাচাষা হামার জমির ধান লিয়া গেলো লিজের ঘরত, আবার শুনি ওই চাষা বলে হামারই পার্টির মানুষ। মানষে হাস্যে, ইগলান কী পার্টি করো গো?–আক্কেলপুর ইস্টিশনত ট্রেন লেট করায়া তমিজুদ্দিন খান সাহেবকে দিয়া লেকচার দেওয়ালাম। গাঁয়ের মধ্যে থাকা মানুষ লিয়া আসিছি। কতো ওয়ার্কারেক চিড়াগুড় খিলালাম। এখন ওই নেমকহারামরাই হামার বর্গাদারেক উস্কানি দেয়। হামাক সর্বস্বান্ত কর্যা ফালালো।
