কিন্তু ফুলজান নিয়োজিত কেবল খড়ের আঁটিগুলো আলগা করে দেওয়ার কাজে। এখানেও সে কতো তাড়াতাড়ি কাম করে। কঁড়ালের আঁকশি বিঁধে দেয় আঁটির একেবারে নিচে, তারপর কড়ালের পেছনটায় এমন জোরে মোচড় দেয় যে আঁটি একেবারে আলগা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এর ওপর দিয়ে গোরু হেঁটে আরাম পায়, খড়ও মোলায়েম হয়। ওদিকে কুলা ঝেড়েই চলেছে কুলসুম; তার আঙুল নড়ে খুঁড়িয়ে, এতেক্ষণ ধরে ঝেড়েও তার চিটাধান ও খড়কুটোর পরিমাণ ফুলজানের স্তুপের চেয়ে কতো ছোটো।
ফুলজানের হাতের কাম কত পাকা! তার বাপের বৌটা যদি ওরকম হতো! এরকম একজন কেউ পাশে থাকলে তমিজ বিঘার পর বিঘা জমি চাষ করতে পারে একা। ধান ঝাড়ার এরকম কেউ থাকে তো তমিজের লাঙলের ফলা ঢুকে যাবে মাটির অনেকটা নিচে, সেখান থেকে এমনকি পানিও তুলে আনতে পারে সে। তখন জমিতে পানি সেচার জন্যে আর মণ্ডলের হাতে পায়ে ধরতে হয় না।
সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার আগে তমিজ আবছা আন্ধারে দেখে তার ধানের স্তুপ। আল্লায় দিলে কতো ধান তার হয়েছে। এই ধান কাল যাবে মণ্ডলবাড়ি। ভাগাভাগির পর তার নিজের ভাগ নিয়ে তমিজ কালই ওঠাবে তার উঠানে। এতো ধান কি কুলসুম সেদ্ধ করতে পারবে? কালাম মাঝির বাড়িতে সে ধান সেদ্ধ করেছে তখন তো তার বিয়েই হয়। নি, ছোটো ছিলো। কালাম মাঝি বৌঝিদের সাথে সাথে থাকতো, কুলসুম হাত লাগিয়েছে মাত্র। এখন এতো ধান সেদ্ধ করে শুকিয়ে ঘরে তোলা কি আর সাধ্যে কুলাবে? এখন কী আর করা যায়? ফুলজান কি তার বাড়ি উজিয়ে গিয়ে তার ধান সেদ্ধ করে শুকিয়ে দিয়ে আসবে নাকি?
কুলসুমের সামনে ফুলজানের কথা এভাবে ভাবতেও তমিজের এমন বাধো বাধো ঠেকে কেন? কুলসুমকে তার এতো পরোয়া করার দরকারটা কী? এর ভয়ে কি ফুলজানের বেটার ব্যারামের খবরটাও নিতে পারবে না? মরিয়া হয়ে একটু উঁচু গলাতেই ফুলজানকে জিগ্যেস করে, বেটা তোমার ক্যাংকা আছে গো? এই কয়টা দিন যাক, চলো একদিন টাউনেত যাই। দেরি করা ভালো লয়।
টাউনেত গেলে তোমার পাছ ধরা লাগবি কিসক? বেটাক লিয়া হামি হামার বাপের সাথে যাবার পারি না? ফুলজানের জবাবে তমিজ কষ্ট করে হাসতে চেষ্টা করে, লাভ হয় না। মাঝখান থেকে তার চোয়াল ও ঠোট ব্যথা করে।
তখন সন্ধ্যা, সন্ধ্যার কুয়াশা কালচে লাল হয় বারান্দায় রাখা কুপির আলোয়। তমিজের সঙ্গে কথা বলেতে বলতেই ফুলজানের ঘরের ভেতরে গিয়ে তার ছেলেকে নিয়ে আসে, কোলের ওপর রুগ্ন ছেলেটিকে সে নিয়ে এসেছে একটি নতুন র্যাপারে জড়িয়ে। কুপির আলো পড়েছে ফুলজানের বেটার গায়ের কাপড়টিতে। এই কালচে লাল আলোতেও কাপড়টা চিনতে তমিজের একটুও দেরি হয় না। সঙ্গে সঙ্গে সে তাকায় কুলসমের দিকে, কুলসুমও ওই কাপড়টাই দেখছে খুব খুটিয়ে খুটিয়ে। তমিজের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই মুখ ফিরিয়ে নিলো।
সারাটা রাস্তা কুলসুম রেডক্রসের সেই ব্যাপারের কথা তুললো না। সেই চাঁদনি রাতে তমিজ ওই যে ফুলজানের গায়ে র্যাপার চড়িয়ে দিয়ে এসেছিলো, এরপর কুলসুম না হোক একশোবার ওটার কথা বলেছে। তমিজ একেকবার একেক জবাব দিয়েছে। আচ্ছা, সত্যি কথাটা বলতে তার অসুবিধাটা কী ছিলো? তমিজের গা চড়চড় করে : সে কি তার বাপের বৌয়ের খায় না পরে? তাকে তার এতো ভয় করার কী হলো? ফুলজানকে রাপার দিয়েছে, ঠিক করেছে। তাকে কি কুলসুমের মুখ চেয়ে চলতে হবে? তাকে সংসার করতে হবে না? দুই চার বিঘা জমি করতে হবে না? তার দিকে দেখে কে? বাপ তো তার হিসাবের বাইরে। রাত নাই, দিন নাই আবোরের লাকান খালি টোপ পাড়ে আর নিন্দ পাড়ে। নিন্দের মধ্যে কীসব খোয়াব দেখে আর এদিক ওদিক হাঁটে।-কুলসুম কি স্বামীকে কখনো এভাবে ঝিমাতে আর ঘুমাতে আর হাঁটতে না করেছে কখনো?
ঘুমের পাঁকের মধ্যে পড়েই তো বাপ তার খোয়াব দেখে আর কামকাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। স্বামীর এই খাসলত তো কুলসুমই বরং উস্কে উস্কে দেয়। আর কোনো মেয়েমানুষ কি স্বামী ঘুমের ভেতর কী বিড়বিড় করে তাই শুনতে তার মুখের কাছে কান পেতে থাকে? বাপের এই খাসলতেই সংসারটা তাদের ছারেখারে গেলো। এখন হিসাব করো তো, এই খাসলত সে পেলো কোথায়? চেরাগ আলি ফকিরের পোঁদে পোঁদে ঘুরেই তো তার এই দশা। খোয়াব দেখার কী ভয়ানক নেশা ফকির তার মধ্যে সেঁধিয়ে দিলো যে ঘর সংসার ভুলে মানুষটা তাতেই বুদ হয়ে থাকে এই বুড়া বয়সেও! যে মানুষ বড়ো হওয়া পর্যন্ত ঘুরঘুর করলো মণ্ডলদের বাড়িতে, যাদের এঁটোকাটা খেয়ে যার শরীর পুরুষ্টু হলো, সে-ই কিনা ওই বাড়ির নাম পর্যন্ত শুনতে পারে না। ফকির তাকে কী এলেম যে দিয়ে গেলো। শরাফত মণ্ডলের এতো কষ্ট করে, এতো তদবির করে, নায়েববাবুর পেছনে এতো খরচা করে ইজারা নেওয়া বিল, সেই বিলের ধারে ধারে আন্ধারে মান্দারে তমিজের বাপ যদি ঘুরে বেড়ায় তো মণ্ডল তাকে সন্দেহ করবে না কেন? চেরাগ আলি তার নাতনিটাকে গছিয়ে দিয়ে গেলো বাপের ঘাড়ে, কী মন্তর পড়ে দিয়ে গেছে কে জানে? না-কি ফকিরের মন্ত্রে কুলসুমই তাকে এমন করে রেখেছে? তা ছাড়া আবার কী? ঘরের দুষমন এই মেয়েমানুষটাকে তোয়াক্কা করলে কি তমিজের চলে?
১৮. ইসমাইল হোসেনের বাড়িতে
ইসমাইল হোসেনের বাড়িতে সেদিন মেলা মানুষ। দুই দিকে পাথরের ওপর গথিক অক্ষরে যথাক্রমে হোসেন মঞ্জিল ও এম. টি হোসেন খোদাই-করা দুই পিলারের মাঝখানে কাঠের ফ্রেমে বাঁধা টিনের গেট হাট করে খোলা। দুই পাশের কামিনী গাছ দুটো পড়ে গেছে গেটের দুই পাল্লার আড়ালে।
