ভোরবেলা কাৎলাহার পেরিয়ে নিজগিরিরডাঙার হুরমতুল্লার বাড়িতে গিয়ে দিনভর কাজ করবে কুলসুম,—এতে তমিজের বাপের তেমন সায় ছিলো না। কুলসুম বলেই ফেললো, ইগলা আলগা ফুটানিই তোমার সব্বোনাশ করলো! তবে ধান ঝাড়ার চেয়ে কুলসুম মরিয়া হয়ে উঠেছে ফুলজানের নামে এটা ওটা শুনতে শুনতে। কুলসুম রাগে জ্বলে! মা গো মা, মাগীমানুষ বলে এতো দজ্জাল হয়? এমন না হলে স্বামীটা কি তার এমনি এমনি ভাগে? এখন আবার লেগেছে পরের ছেলে তমিজের পেছনে। স্বামীকে বেশি কথা বলার সুযোগ না দিয়ে কুলসুম ভোররাতে বেরিয়ে যায় তমিজের সঙ্গে।
তমিজের বাপ তখন মাচায় শুয়ে চোখ মেলে তাকিয়েছিলো বাইরের দিকে। তার বেটা আগে এবং পিছে বৌ চলতে চলতে ডোবার ওপারে গিয়ে হাঁটতে লাগলো পাশাপাশি। তমিজের বাপ পাশ ফিরে শুয়ে ফের ঘুমিয়ে পড়ে।
কিন্তু কুলসুমের রাগারাগি বলো, ঝগড়াঝাটি আর মুখ ঝামটা দেওয়া বলো, সবই তার বাড়ির ভেতর। হুরমতুল্লার ভিটায় পা দিয়েই সে একরকম চুপ হয়ে যায়। ফুলজানের দিকে আড়চোখে তাকায়, যেন জীবনে এই পয়লা দেখছে তাকে।
সেদিন তমিজ আর কুলসুমের পৌঁছুবার পরপরই শুরু হলো গোরু দিয়ে ধানের আঁটি মাড়াই। কাঠের তক্তায় পিটিয়ে ধান ঝরানো আঁটিগুলো উঠানের পাশে গাদা করে রাখা ছিলো। ফুলজান আর হুরমতুল্লা আগেই কয়েকটা আঁটি খুলে বিছিয়ে রেখেছিলো উঠানে। গলায় গলায় বাঁধা ও মুখে ঠুলি পরানো জোড়া গোরুর পেছনে পান্টি হাতে ঘুরতে লাগলো তমিজ। উঠানের অন্যদিকে ধানের স্থূপ থেকে কুলায় ধান নিতে নিতে। ফুলজান চাঁচায়, ও নবিতন, কাঁড়ালটা লিয়া মাঝির বেটার পিছে না! নবিতন বারান্দায় বসেছিলো কাঁথা সেলাই করতে। বেশ মন দিয়ে নকশা তুলছিলো, বোনের ডাকে সাড়া না দিয়ে নকশাই তুলে চললো। এই মেয়েটিকে তমিজ প্রায় সবসময়ই কথা সেলাই করতে দেখে, ধানের কাজে তার উৎসাহ নাই। ফুলজান আরেকবার চিৎকার করলে জোড়া গোরু ও তমিজের পিছে পিছে কড়াল হতে নামলো সে। কাঁড়ালের আঁকশি দিয়ে ছড়িয়ে দিতে লাগলো ভাঙা আঁটিগুলো। পেটাবার পর এই কয়েকদিনে। আঁটির ধানগুলো লাল হয়ে এসেছে, এই ধানের চালও লাল হবে, ভাতে স্বাদ নাই। তমিজ বেশ বুক চিতিয়ে এগোয়, তার কোবানো আঁটিতে ঘুলানা ধান থাকে না, তার কয়েকটা বাড়িতেই আঁটির ধান সব ঝরে পড়ে।
ঘুলানা ধান তো তোমার হলোই না গো। ব্যামাক ধানই বার কর্যা লিছো? নবিতন তাকে সাবাশি দিতে এই কথা বলতে না বলতে ফুলজান বলে ওঠে, হাভাতা মাঝির বেটা, ধান কি আঁটিত কিছুই থোয়া লাগে না?
আঁটি পেটানোর পটুত্বও তার ফুলজান স্বীকার করে না, এটাকে সে বিবেচনা করে হাভাতেপনা বলে। তমিজকে এভাবে হেয় করাটা কুলসুমের গায়ে একটু লাগে, একটু নিচু গলাতেই সে বলে, ঘুলানা ধানের চাউল হামরা খাই না বাপু!
কিসক? ভিক্ষা করা বেড়াছো, তখন মানষে ঘুলানা চাউল দিলে ফিক্যা মারিছো? ফুলজান কথাটা বলে কুলসুমকে, কিন্তু তাকে এই কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় তমিজের রাগ হয় কুলসুমের ওপর। গোরুর পিঠে আলগোছে পান্টির বাড়ি মেরে সে বলে, ভিক্ষা হামরা করি নাই। ফকিরের বেটিক লিকা করা হামার বাপ ঘরজামাই হয়া যায় নাই। ঘুলানা চাউল হামাগোরে খাওয়া লাগে না।
তমিজের কথায় ফুলজান বোধহয় আরাম পেয়েছে, নইলে এর পিঠে তার কিছু না কিছু বলার কথা। কুলসুম তো এখন অনেক কথাই বলতে পারতো।-তমিজের বাপের সংসারে ঘুলানা চালের ভাত তাকে কম খেতে হয় নি। তমিজের কথায় দুঃখ পাওয়ার চেয়ে সে অসহায় বোধ করে বেশি। বিচলিত হয়ে ফুলজানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ধান ঝাড়ার কুলাটা সে ধরে দক্ষিণ দিকে। তাই দেখে ফুলজান হাসে খিলখিল করে, তার ঘ্যাগের ভেতর দিয়ে আসতে আসতে খিলখিল স্বরটি লুপ্ত হয় এবং শোনা যায় ঘর্ঘর শব্দ। শীতের বাতাস তো বইছে সবই উত্তর থেকে, সেই বাতাসে কুলার চিটাধান কি খড়কুটো উড়ে পড়ে নিচে, কুলায় রয়ে যায় ভালো ধানগুলো। ফুলজানের মুখোমুখি দাঁড়াবার ফলেই কুলসুম কুলা ধরে উল্টোদিকে। তা এতে ফুলজানের এত হাসির কী হলো? ফুলজানের এই তুচ্ছ-করা হাসির প্রতিবাদে, না কুলসুমের অযোগ্যতায় বিরক্ত হয়ে, ঠিক বোঝা মুশকিল তমিজ দুটো গোরুর পিঠেই পান্টির বাড়ি লাগায় কষে। এই বাড়ির জন্যে একেবারেই অপ্রস্তুত গোরু দুটো হঠাৎ একটু দৌড় দিলে তমিজ হুমড়ি খেতে খেতে সামলে নেয়। তার এই দশায় হেসে ফেলে নবিতন, তার হাসিতে নির্ভেজাল খিলখিল বোল। ফুলজান কিন্তু এবার হাসে না, জিভ দিয়ে চ চ্চ আওয়াজ করে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে, হায়রে, চাষা হাওয়ার হাউস! মাঝি বলে হাউস করিছে চাষা হবি!
একটু আগে ফুলজানের ঘর্ঘরে হাসিতৈ কিন্তু কুলসুমের আনাড়িপনার জন্যে একটু প্রশ্রয়ও ছিলো। বিদ্রুপ কিংবা প্রশ্রয় কোনোটাতেই কুলসুম স্বস্তি পায় না। নিজের ভুলটা বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গেই সে কুলা ধরেছিলো উত্তরদিকে, উত্তরের হাওয়াকে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনেও তার অস্বস্তি কাটে না।।
জোড়া গোরুর পিছে পিছে মলন দিতে দিতে তমিজ কিন্তু সবই দেখে। কুলসুমের কালো ও লম্বা আঙুলওয়ালা হাতের হালকা নাচন ধানের ওপরকার চিটাধান ও খড়কুটো উড়িয়ে ফেলে দিচ্ছে মাটিতে, সেখানে হলুদ ও হালকা কালচে হলুদ ছোটো স্থূপ তৈরী হচ্ছে তার স্তনের মতো। ফুলজানের কুলায় মোটা মোটা গাবদা গোবদা হাতের হালকা পিটুনিতে কিন্তু কাজ এগোয় অনেক তাড়াতাড়ি। কিন্তু ঘেগি মাগী আজ এমন ছটফট করে কেন? কিছুক্ষণ পরেই সে ছোটোবোনকে বলে, ধর তো নবিতন। কুলাটা তার হাতে তুলে দিয়ে সে হাতিয়ে নেয় তার কাঁড়াল এবং একটু জোর কদমে অনুসরণ করতে থাকে তমিজকে। ফলে তমিজকেও কদম বাড়াতে হয় এবং তার প্রভাব পড়ে গোরুজোড়ার ওপর। গোরুর টানে ও ফুলজানের ঠেলায় তমিজের বুক ও পিঠ শিরশির করে। গোরু সে ঠিকই সামলে নেয়, কিন্তু বুকটা টিপটিপ ও পিঠটা শিরশির করতেই থাকে।-বাঁশের কড়াল দিয়ে ফুলজান তার পিঠে একটা খোঁচা না মারে! কাঁড়ালের আঁকশিতে সে আবার তমিজের গলায় আটকে একটা হ্যাচকা টান না দেয়! আহা, ফুলজান একটা হালকা খোঁচা যদি দেয়! তমিজের পিঠের কি আর সেই কপাল হবে?
