এই সময় বাপকে কাস্তে হাতে আসতে দেখে তমিজ উঠে দাড়ালো। না গো, বুড়া দেরি করে নি। বাপ বেটায় এখনি জমিতে নামা যায়।
কিন্তু দুজনে জমিতে নামার আগেই এসে হাজির হলো হুরমতুল্লা ও তার পেছনে আরো তিন জন কামলা। এরা সূব নিজগিরিরডাঙার পুবপাড়ার মানুষ।
নামো, নামো। হুরমতুল্লা এসেই তাগাদা দেয়, কামেত নামো গো। বেলা ডোবার আগেই ব্যামাক আঁটি হামার বাড়িত তোলা লাগবি।
কিন্তু কামলা নেওয়ার কথা তো তমিজের ছিলো না। মণ্ডলের সঙ্গে এমন কথা তো হয় নি। তবে এগুলো কী?–না,কামলা নিতে হবে। শরাফত মণ্ডলের হুকুম। এই জমির ধান কাটতে হবে এক দিনে। তমিজ একলা কাটলে এক সপ্তাহেও কুলাতে পারবে না।
হামার বাপ তো হামার সাথে আছে। তাই হাত লাগালে তোমার দুই কামলার কাম সারবার পারে, সেই খবর রাখো?
তমিজের কথায় হুরমতুল্লা আমল দেয় না। ধান বেশি পেকে গেছে। কয়েক দিন ধরে কাটলে এর মধ্যে অর্ধেক ধান ঝরে পড়বে মাটিতে, ঝরা ধানে বরকত নাই। শরাফত তাই কাল রাত্রে হুরমতুল্লাকে ডেকে কামলা জোগাড়ের ভার দিয়েছে।
সবাই মাঠে নেমে পড়লে তিন মুঠা কাটা হলে আঁটি বান্দো, হুশিয়ার হুয়া কাম। করো, কাচি ধরার কায়দা আছে বাপু, ইটা তোমার জাল মারা লয়। ধান যানি ঝর্যা না পড়ে, হুরমতুল্লার প্রভৃতি উপদেশে শরাফতের হুকুমই গমগম করে ওঠে। তবে বাপের কাস্তের অতি দ্রুতগতিতে তমিজ তার ভোরবেলার, এমন কি, আরো আগেকার তেজ ফিরে পায় এবং হাম্বিতম্বি শুরু করে নিজেই, দেখো! চোখ দিয়া চায়া দেখো। বুড়া। মানুষটার ছ্যাও দেখ্যা তোমরা শিখ্যা লেও।
বাপের কাজে অসাধারণ ক্ষিপ্রতা ও পটুত্বের কল্যাণে দুপুরবেলার মধ্যেই জমি জুড়ে তমিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে ধানের পরিমাণে, আকারে, পুষ্টিতে ও সৌন্দর্যে অভিভূত হওয়ার সুযোগ সে পায় এবং এই জমিতে নিজের মেহনত ও কৌশল নিয়ে নানা কিসিমের বাকি ছাড়ে। তমিজের বাপ কথা কয় না। ধানের ফলনে বেটার কৃতিত্বে সে খুশি কি-না তার কিছুই বোঝা যায় না। কিন্তু তার কাস্তের গতি ও তমিজের চোপার নিচে চাপা পড়ে হুরমতুল্লার দাপট।।
বাপের চুপ মেরে যাওয়া সুদে-আসলে তোলে হুরতুল্লার বেটি ফুলজান। বাঁকের দুই দিকে ভারে ভারে ধানের আঁটি এনে হুরতুল্লার উঠানে কামলারা সাজিয়ে রাখছিলো থাক থাক করে, ফুলজান তখন চলে আসে সামনে। কামলাগুলো না থাকলে সে হয়তো মাঠেই চলে যেতো।
দুই দিন ধরে সব ধান কাটা শেষ হলে কামলারা চলে যায়, এখন থেকে ধানের সমস্ত তদবির করতে হবে তমিজকে একা। বাপটা ঘরেই পড়ে থাকে, জমি থেকে ধান। কেটে দেওয়ার পর তার আর কোনো উৎসাহ নাই। তমিজ বললে হয়তো আসতো। তা তমিজ কিন্তু বাপকে কিছু বলে নি। ফুলজানের চোপার কিছু ঠিক নাই, কার সামনে কী বলে বসে কে জানে? তমিজ অবশ্য রোজ ভোরবেলা এই বাড়িতে ঢোকার সময় বুকে। বল জুগিয়ে নেয়, সে কি ফুলজানের খায় না পরে, না-কি তার বাপের জমিতে বর্গা চাষ করে যে তাকে ভয় করতে হবে? আবার তার বিমারি বেটাকে দেখে তমিজের মায়াও লাগে, আহা ছেলের জন্যে মায়ের কষ্টের আর শেষ নাই। তা বেটাকে নিয়ে টাউনে যাবার কথা সে তুলবে, আগে ধানটা মণ্ডলের গোলায় তোলা হোক। ফুলজানের বেটা নবিতনের কোলে বসে ঘোলাটে চোখে জ্বলজ্বল নজরে তমিজের ধান পেটানো দেখে। ফ্যাকাশে মুখে তার চোখজোড়া চকচক করে দেখে তমিজের ধান পেটানো হাত শিথিল হয়ে আসে : দুত্তোরি! ছোঁড়াটা মনে হয় ভালোই হয়ে গেলো! ওকে নিয়ে প্রশান্ত কম্পাউনডারের কাছে যাবার কথা ছিলো, তা বুঝি আর হলো না!
ধানের কোবান দেওয়ার কায়দা আছে, বুঝিছো? কিন্তু কাঠের তক্তায় ধানের আঁটি বাড়ি মারার কৌশলটি দেখিয়ে না দিয়েই ফুলজান বলে, খালি গায়ের জোর খাটালেই ব্যামাক কাম হয় না গো মাঝির বেটা। বুদ্ধি খাটান লাগে।।
তার কাজের খুঁত ধরতে ফুলজান সবসময় কাছে থাকে। তমিজের একেক দিন রাগ হয়, ইচ্ছা করে, মাগীর পাওনা পয়সা কয়টা ঝনাৎ করে ফেলে দেবে সামনে। বলবে, ভালো করা গুন্যা লেও। কিন্তু ফুলজান তো পয়সা চায় না। তমিজও ভাবে, ধান ঘরে ওঠার আগে এতো খরচ করা ভালো নয়। তবে নিজেকে ফুলজান যে এতো কামলি মেয়েমানুষ বলে মনে করে, এই দেখে দেখে তমিজ ভাবে, এখানে কুলসুমকে একবার এনে ফেললে হয়। কাম তো আর ফুলজান একলা জানে না। কয়টা বছর আগেও কুলসুম মণ্ডলবাড়িতে ধান ভানার কাজ কম করে নি। আর বিয়ের আগে কালাম মাঝির। বাড়িতে কতো হাঁড়ি ধান যে সেদ্ধ করতে তার কোনো হিসাব আছে? আর এমনিতে কুলসুমের পাশে এই মাগী কি আর দাঁড়াতে পারে নাকি? ফুলজানের যে জায়গাটায় মস্ত ঘ্যাগ ঝোলে একটা, কুলসুমের ওইখানটা দেখতে কী মসৃণ। কুলসুমের রঙ কালো হলে কী হয়, তার মুখের দিকে তাকালে তাকে বড়োলোকের বাড়ির মেয়েদের মতো দেখায়। তমিজের সত্য হলেও কুলসুম তাকে কখনো হিংসা করে নি। মাঝির বংশ নিয়ে তাকে খোটা দেয় বটে, কিন্তু সেটা কেবল তার বাপদাদা নিয়ে তুমি কথা শোনালেই। কুলসুম এখানে থাকলে ফুলজানের নাহক খোটা মারা, তাকে হেয় করাটা বন্ধ হবে। তার নিজের বর্গা করা জমির প্রথম ধান উঠছে। মণ্ডল বাগড়া না দিলে তো জমি থেকে ধান সে তুলতো সোজা বাড়িতেই। কুলসুম বাড়ির বাইরের উঠানটা নিকাবার আয়োজনও করেই রেখেছিলো। নিজের বাড়িতে না হোক, নিজের জমির ধান ঝাড়ার সময় তমিজ কুলসুমকে পাশে পাবে না, তা কী করে হয়?
