অন্ধকার গাঢ় হয়। বাপেবেটায় এবার বাড়ি ফেরার জন্যে পা ফেলে পুব দিকে। কিন্তু পাশের বাঁশঝাড়ে কিসের শব্দ পেয়ে দুজনেই থমকে দাড়ায়। শরাফত মণ্ডল কপাল কোঁচকায় : মাঝিদের পুরনো কোনো লাশ কি মাটি খুঁড়ে বেরিয়ে আসছে গোরস্তানে টহল দেওয়ার জন্যে? আর আবদুল আজিজের ভাবনা কি ভয় পাবার শক্তির সবটাই ঢুকে পড়েছে সেই টহল-দেওয়া লাশের শূন্য কবরের ভেতর, সে কেবল প্রাণপণে চেষ্টা করছে কোনোমতে নিজের পা দুটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে। এতো বড়ো বাঁশঝাড়টা এখন এরা পেরোবে কী করে? দুই জনের একটি পা-ও এক পা নড়তে পারে না।
কিন্তু কয়েক মুহর্তেই শরাফত স্বস্তি ও ক্রোধের নিশ্বাস ফেলে। আলহামদুলিল্লাহ! সেরকম কিছু নয়। বাঁশঝাড়ে বসে পায়খানা করছে কোনো শালা ছোটোলোকের বাচ্চা। আজ জেয়াফতে গোগ্রাসে গেলা এবং হজম-বদহজম-হওয়া খানা সে খালাস করছে মিহি ও মোটা নানারকম ধ্বনি তুলতে তুলতে। ভূতপেত্নী আর যাই হোক হাগামাতা করে না, এই ভরসায় শরাফত তেজি গলায় হাঁক ছাড়ে, কেটা রে? কেটা হাগে? এটি হাগে কোন হারামজাদা?
বাঁশঝাড় থেকে মলত্যাগকারীর গলার আওয়াজও পাওয়া যায় এখন। কোৎ দেওয়ার ও পায়খানা করার আওয়াজ বাজে যুগলবন্দি হয়ে, লোকটা তাড়াতাড়ি কাজ সম্পন্ন করার জন্যে মরিয়া হয়ে লেগেছে। শরাফত মণ্ডল দ্বিতীয়বার হুংকার ছাড়ার পরেও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় দুজনকে। তারপর বাঁশঝাড় থেকে কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে আসে তমিজের বাপ। তার শরীরে উল্কট দুর্গন্ধ। গন্ধ ধাঁ করে ঢুকে পড়ে আজিজের গলায়, সেখান থেকে পেটেও চলে যেতে পারে। মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সে বমি করে ফেলে। তার বমির তরল ছিটায় হুমায়ুনের কবরের শিওরে একটি মোমবাতির শিখা একটু কেঁপে দপ করে নিভে যায়।
শরাফত মণ্ডলের দিকে তাকিয়ে তমিজের বাপ অপরাধী গলায় বলে, বাড়িত যাচ্ছিলাম। ঘাটাত বাহ্যি চাপলো, আর পারলাম না। হামাগোরে গোরস্তানের এটি বাঁশঝাড়ের মধ্যে
তমিজের বাপের গুয়ের গন্ধ এখন দখল করে নিয়েছে গোটা গোরস্তান। এখানে ফেরেশতা আসবে কীভাবে? শরাফত ও আজিজের পক্ষেই তো টেকা দায় হয়ে পড়েছে।
ঘরে যেতে যেতে শরাফতের ভুরু কুঁচকে আসে, তমিজের বাপ এই পথে বাড়ি ফেরে কেন? মাঝিপাড়ার মানুষের জন্যে এই পথে চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে অনেকদিন আগেই। এই গোরস্তান কি এখনো শালাদের হামাগোরে গোরস্তান? এতো সাহস ও পায় কোত্থেকে? কালাম মাঝি আবার লেলিয়ে দেয় নি তো? আর আবদুল আজিজের করোটিতে বেঁধে একটির পর একটি কাঁটা, কিংবা একটি কাটারই শাখাকাটা উপকাটা : এই লোকটাই না? দুপুরবেলা এই লোকটাকে দেখেই তো হামিদা অমন ভয় পেয়ে গেলো? আজিজ এখন বোঝে, এই তমিজের বাপই সেই রাত্রে কাফনের কাপড় পরে ওই রাতে এসেছিলো হুমায়ুনকে নিয়ে যেতে। ছেলেটা মরার পরেও সে তার পিছু ছাড়ছে না। সন্ধ্যার পর পায়খানা করার জন্যে সে কি হুমায়ুনের কবরের পাশে ছাড়া আর জায়গা পেলো না? লোকটা আসলে কী? তমিজের বাপ কি আসলেই তমিজের বাপ? লোকটা কে?-ভয়ে আবদুল আজিজ থরথর করে কাঁপে। কাঁপুনির বেগে সে ঘরে পৌঁছে যায় শরাফতের অনেক আগে। তমিজের বাপের আচরণ শরাফতকে বেশ ভাবনায় ফেলে দিয়েছে, ভাবনায় তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত বেশ ভারী। তার গতি একটু মন্থর।
১৭. ধান কাটার দিন
ধান কাটার দিন ভোর হওয়ার বেশ আগেই, আন্ধার থাকতে থাকতে আলের উপর কুলগাছতলায় দাঁড়িয়ে তার দুই বিঘা সাত শতাংশ জমি তমিজ দেখে নিচ্ছিলো দুই চোখ ভরে। এ বছর জমির এমন ভরা বুক তো সে আর দেখতে পারবে না। পাকা ধান মাথায় নিয়ে ধানগাছগুলো খানিকটা হেলে পড়েছে, আবার জায়গায় জায়গায় তমিজ ধানগাছ এলিয়ে দিয়েছে নিজেই, ধান যাতে সমানভাবে পাকে। কোলে ধান কাঁখে ধান নিয়ে একেকটি গাছ নিঃসাড়ে ঘুমায়। কুয়াশা ছুঁয়ে শিশিরের এক-একটি বিন্দু শীষের ওপর স্বপ্নের তরল ফোঁটার মতো পড়লে ধানগাছের ঘুম আরো গাঢ় হয়। ধানখেতের স্বপ্নের ঝাপটায় তমিজের গা কাঁপে, দেখতে দেখতে সে বসে পড়ে আলের ওপর।
ধানগাছের স্বপ্নের ধাক্কায় দুলতে দুলতে তমিজ হাতের কাস্তের ধার দেখে আলগোছে, কাস্তের কচি কচি দাঁতে তার হাতে সুড়সুড়ি লাগে, ভোতা আঙুলের মাথা বেয়ে তাই ছড়িয়ে পড়ে তার সারা শরীরে। দশরথ কর্মকারের পাশে বসে সে কাস্তে ধার করে নিয়ে এলো পরশুদিন। কাস্তে কোদালে ধার দশরথের মতো দিতে পারে-এ তল্লাটে তেমন আর কেউ নাই। মানুষটা কথা কয় কম, দিনরাত হাঁপর টানে, হাঁপর টানে আর ফাঁকে ফাঁকে এটা ওটা ধার দিয়ে দেয়। তবে প্যাচাল পাড়ে তার বেটাটা। বাপ কেমন চুপচাপ হপর চালাচ্ছে। আর দেখো এক নাগাড়ে কথা বলে চলে যুধিষ্ঠির।কী?-না, গোলায় ধান তোলার সময় মণ্ডল নাকি তার সঙ্গে খুব প্যাগনা করেছে। মণ্ডল খালি এটা চায়, ওটা চায়। এই খরচ দাও, ওই খরচ দাও। খরচ দিতে না পারো তো তোমার ভাগের ধান থেকে এ বাবদ এতো ধান দাও, ওই বাবদ অতো ধান দাও। যুধিষ্ঠির তমিজকে ভয় দেখায়, তোমার তো মেলা ধান হছে। হামি লিজেই দেখ্যা আসিছি। কতো ধান ঘরত তুলবার পারো দেখো!
আগেভাগে এসব অলক্ষুণে কথা বলার দরকারটা কী বাপু? তমিজের রাগই হচ্ছিলো। যুধিষ্ঠিরের ওপর, যার জমি তুমি বর্গা করো, যার জমিতে তোমার লক্ষ্মী তার নামে এমন গিবত করলে তোমার ধর্মে সইবে?-ধান মাপা আরম্ভ হলে মণ্ডল খালি প্যাগনা করবি।-এই দেখো, শীতের অন্ধকার ভোরে যুধিষ্ঠিরের বাড়ির হাঁপরের আঁচ লাগে, এই আঁচে ধানখেতের ওপরকার কুয়াশা উড়ে যাচ্ছে ধোয়া হয়ে, শিশিরবিন্দু শুকিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে জমির ভেতরে। আসমান সাফ হয়ে আসছে।
