হুমায়ুনকে কবর দেওয়ার পর জায়গাটিকে মণ্ডলদের পারিবারিক গোরস্তানে পরিণত করার ব্যবস্থা এখন পোক্ত করা যায়। ছেলের কবরটা বাধাবার জন্যে আবদুল আজিজ কয়েক দিন ঘ্যানঘ্যান করলো। বড়োবেটাটা তার বড়ো বৌচাটা, বৌ ফোৎ ফোৎ করলেই তার মাথা খারাপ, বৌ যা বলে তাই করার জন্যে হন্যে হয়ে ওঠে। শরাফত বলেই দিয়েছে তাদের আহলে হাদিস জামাতে কবর সাজানো শেরেকি কাজ।
তবে এখন হুমায়ুনের কবরের পাশে দাড়িয়ে তার চোখ জুড়ে শুয়ে থাকে। শিমুলতলার মিয়াদের বাড়ির গোরস্তানের সার সার কবর। মিয়াদের কোনো কোনো কবর কী সুন্দর করে বাঁধানো। কোনো কবরের শিওরে সিমেন্টের ওপর চাঁদ তারা, কোনো কবরে পাথরে খোদাই-করা আল্লার কালামের নিচে মরহুমের নাম, বাপের নাম, জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ। সেখানে গেলে সেই সব মরহুমের অছিলায় তাদের ছেলেমেয়ে নাতি পুতিদের জন্যেও ভক্তিতে বুকটা ভরে ওঠে। শিমুলতলার মিয়াদের খানদানি বোঝার জন্যে জ্যান্ত মানুষকে না দেখলেও চলে, ওইসব বাঁধানো কবরই হলো খানদানের নীরব নকিব।
তা হুমায়ুনের কবর বাধালে ক্ষতি কী? ছেলেটা তাদের কতো ইজ্জত এনে দিলো, মরার পর তার কি এটুকুও প্রাপ্য নয়?
ইট সিমেন্ট কবর বাঁধালে নায়েববাবু কি আপত্তি করতে পারে? কয়েক বছর আগে বিলের উত্তরে কাশবন কেটে চাষবাস করার উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হলে টাউনের উকিল রমেশ বাগচি ওখানে ইটের ভাটা করার কথা ভাবছিলো। উকিলবাবুর ভাগ্নে টুনুবাবু পয়সাকড়ি নিয়ে বোম্বাই না মাদ্রাজ ভাগলে এসব ভাবনা তারা ঝেড়ে ফেললো। তারপর কাদের একবার বাই তুললো ইটের ভাটা করবে। ওদিকে তো জঙ্গুলে জায়গা, কাঠের খরচ নাই। সস্তায় হঁট করে প্রথমে না হয় নিজেদের বাড়িটাই পাকা করে ফেলবে। তা। কাদেরের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা কী করে লাঠিডাঙা কাচারিতে পৌঁছুলে নায়েববাবুই
একদিন মণ্ডলকে ডেকে পাঠিয়ে বলে, মণ্ডল, কর্তা আমাদের মাটির মানুষ। তার সহ্যশক্তিও অনেক। ভগবান একেকজন মানুষকে সৃষ্টিই করেন ওইভাবে। কিন্তু চাষাভুষা প্রজাপিট সবাই যদি দরদালানে থাকতে শুরু করে তখন তার সম্মানটা থাকে কোথায় বলো তো? ইঙ্গিত ধরতে পেরে শরাফত বলে, সোগলি দালানেত থাকলে দালানের ইজ্জত থাকে ক্যাংকা করা? কথা ঠিকই কছেন বাবু। ধরেন, হামার কথাই ধরেন। বাপের ছনের ঘর আছিলো, হামি করলাম টিনের ঘর। আশীর্বাদ করেন বাবু, নায়েবের আশীর্বাদ নিতে শরাফত অন্তত পাঁচ হাত দূরে মাটি ছুঁয়ে ফের উঠে দাঁড়ায়, আশীর্বাদ করেন, ওই টিনের ঘরত যেন মরবার পারি। ওই ঘরত যানি হামার মরণ হয়। তখন কাচারিতে সে নিয়মিত ভেট দিয়ে যাচ্ছিলো, শরাফতের এক কথাতেই নায়েব গুজবটা বাতিল করে দেয়।
তবে কবর বাঁধালে নায়েববাবু আপত্তি করবে কেন? বাড়ি আর কবর কি আর এক হলো?
কিন্তু অসুবিধা আর একটা আছে। সেটা অন্যরকম। কী—এখানে তো শরাফতের মুরুব্বিরাও আছে। বাপজান আছে, মা আছে, মিয়াভাই আছে, এদের কবর পাকা না করে হুমায়ুনের কবরে সে ইঁট বসায় কী করে?
তাহলে হুমায়ুনের জন্যে, তার লাশ হেফাজতের জন্যে শরাফত কি কিছুই করতে পারে না? এটা কি তার সঙ্গে নিমকহারামি করা হচ্ছে না? এই ভাবনা ও উদ্বেগে তার জিয়ারতের দোয়া বারবার এলোমেলো হয়ে যায়। নতুন করে সমস্ত মনোযোগ সে নিয়োগ করে দোয়ার দিকে। আসসালামু আলাকুম ইয়া আহলাল কুবরে, মিনাল মুসলিমিনা, ওয়াল মুমিনিনা, আন্তম লানা পর্যন্ত বলেছে, তখন তার পাশে এসে দাঁড়ালো আবদুল আজিজ। জিয়ারতে সে শরিক হয়, কিন্তু মোমবাতি ও আগরবাতি জড়ানো কাগজের মোড়কে তার একটা হাত বন্ধ, মোনাজাতের জন্যে হাত ভোলা তার পক্ষে বেশ মুশকিল। দোয়া শেষ হলে হাতের প্যাকেটার জন্যে আবদুল আজিজ বাপের দিকে তাকায় অপরাধী চোখে। তাদের জামাতে গোরে বাতি দেওয়া একেবারেই নিষেধ। মিনমিন করে সে কৈফিয়ৎ দেয়, বাবরের মাও খালি কান্দিচ্ছে, বাপের সঙ্গে দূরত্ব না রাখার জন্যে কিংবা শোকেও হতে পারে, তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে ছোটোবেলার বুলি, খালি কান্দে আর কয়, বেটাটা হামার ঘুটঘুটা আন্ধারের মধ্যে একলা পড়া থাকে। তাই হামি–
শরাফত চুপচাপ ছেলের হাত থেকে মোমবাতি নিয়ে হুমায়ুনের শিওরে সাজায়, তারপর আজিজের কাছ থেকে দেশলাই নিয়ে মোমবাতি ও আগরবাতি সব এক এক করে ধরিয়ে কবরের চারদিকে মাটিতে পুঁজে খুঁজে দেয়। এই করতে করতে, হয়তো মোমবাতির আলো ও আগরবাতির সুবাসেই হবে, শরাফতের মাথায় ঝিলিক দিয়ে ওঠে, তার বাপ-মা কি মিয়াভাই তো নিজেদের কবর বাঁধাবার জন্য কোনো অসিয়ত করে যায় নি। তারা পাকা আহলে হাদিস। মিয়াভায়ের নাম শেতল মণ্ডল পাল্টে শমশের আলি মণ্ডল হলো তো মওলানা আবদুল্লাহেল বাকির কথায়। না, তাদের কবর পাকা করলে তাদের রুহ কষ্ট পাবে। কিন্তু হুমায়ুন এক মাসুম বাচ্চা, নাবালক। তার কবর কী হবে না। হবে সেটা ঠিক করবে তার মুরুব্বিরা। তার কবরে কোনো শেরেকি কাজ তারা করবে না, শুধু পাকা দেওয়ালে ঘিরে দেবে যাতে ভবিষ্যৎ বংশধররা শিশুটিকে চিনতে পারে, শিশুটি তাদের পরিবারে অনেক মর্যাদা দিয়েছে।
সিদ্ধান্তটি শরাফত ঠিক তক্ষুনি আজিজের কাছে প্রকাশ করে না। কিন্তু হুমায়ুনের। প্রতি দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হবে ভেবে তার মাথার জট খুলে যায় বলে হুমায়ুনের জন্যে শোকের প্রতি মনপ্রাণ নিবেদন করতে পারে। এর মধ্যে আবদুল আজিজ কবরের ওপর গোলাপজল ছিটিয়ে দিয়েছে এবং আগরবাতি ও গোলাপজলের খুসবু মোমবাতির কচি আলোর আভায় ছড়িয়ে পড়ে তামাম গোরস্তান জুড়ে। এইভাবে অনেক অনেক আগে দাফন-হওয়া মাঝিদের কবরগুলোও চলে আসে হুমায়ুনের কবরের আওতার ভেতরে। চল্লিশার অনুষ্ঠানের এমন নিটোল উপসংহারে শরীফত মণ্ডলের মাথা খুব হালকা হয়ে যায়, তার চোখ থেকে প্রবাহিত নোনা পানি আগরবাতির মিষ্টি গন্ধ ও মোমবাতির কচি আলো কবুল করে নিয়ে হয়ে ওঠে মিষ্টি ও স্বচ্ছ।
