নামীদামি মেহমানরা কাঁচা রাস্তায় টমটমে ফিরে যাবে, তারা একটু তাড়াহুড়া করে গাড়িতে ওঠে। শিমুলতলার ছোটোমিয়ার ফিটনগাড়িতে জোড়া ঘোড়া জুতে সহিস অপেক্ষা করছে। ছোটোমিয়া হাতের ছড়ি একটু একটু নাড়াচ্ছে আর মণ্ডলের সঙ্গে কথা বলছে। আবদুল আজিজ হোটোমিয়ার কাছছাড়া হয় না, শেষ সময়ের কথাটাই মানুষের মনে থাকে।–সাব-রেজিস্ট্রার সাহেবের সঙ্গে দেখা হলেই ছোটোমিয়া যেন আজিজের প্রসঙ্গ তোলে।
আবদুল কাদেরের মেহমানদের মধ্যে কমী গোছের রয়ে গেলো পাঁচজন। আজ রাতে তারা মানুষের ঘরে ঘরে যাবে। দলের পোস্টার আর হ্যান্ডবিল আনতে কাদের গোলাবাড়ি লোক পাঠিয়েছে।
বিকাল শেষ হতে না হতে বেশ ঠাণ্ডা পড়লো। খানকাঘরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে শরাফত মণ্ডল দেখে শুকনা খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোয়াচ্ছে তার বাড়ির কামলাপাট, সঙ্গে আরো কিছু মানুষ জুটেছে। লোকগুলো জেয়াফত খেয়ে এখনো বাড়ি ফিরে যায় নি। এরা এতোক্ষণ করে কী? আহা থাক, শীতে কষ্ট পাচ্ছে, এখানে একটু গা গরম করে যাক! শরাফত ছলছল চোখে তাদের দেখে। তার ছোট্টো দাদাভাইকে আল্লা বেহেশত নসিব করবে, মাসুম বাচ্চাটার জন্যে এই লোকগুলোর দোয়া আল্লার আরসে পৌঁছুবে সবার আগে। গরিব মানুষকে আলাদা করে দোয়া পড়তে হয় না, ভুখা মানুষের তৃপ্তিই আল্লাকে সন্তুষ্ট করে, গরিব বান্দার ভরা পেটের চেয়ে সুখ আল্লার কাছে আর কী আছে? এই এলাকায় এতগুলো গরিব মানুষ ভুখা নাঙা মানুষ আছে বলেই তো তাদের খাইয়ে তৃপ্তি দেওয়ার সুযোগ আজ শরাফত মণ্ডলের হলো। আহা এরা থাক। নাঙা মানুষের গায়ে আগুনের ওম লাগলে সেই আরামে তার নাতির রুহের মাগফেরাত হবে।
শিমুলগাছের সাদা বকের ঝক নিচের আগুনের তাপে ওম নিতে নিতে তাদের পাখাগুলো আস্তে আস্তে মেলে, কিন্তু গুটিয়ে নেয় ঝপ করে। কয়েকটা বক শান্ত ও অলস উড়ালে চলে যায় বিলের ওপরকার পাতলা কুয়াশার ভেতর, তারপর ছোটো ছোটো ঝকে ভাগ হয়ে ডানায় কুয়াশার হিম মাখতে মাখতে বিলের ওপর ঘিরে ঘিরে ওড়ে।
গোলাবাড়ির রাস্তায় এখনো যারা হাঁটছে তারা সবাই ফিরে যাচ্ছে এই বাড়ি থেকেই। পাতলা কুয়াশায় তাদের গতি বোঝা যায় অনেক দূর পর্যন্ত। বিলের ওপারে শরাফত মণ্ডলের নিজের জমি এবং তার আকাঙ্ক্ষিত জমির ওপর কুয়াশা একটু ঘন। ধান কাটা হয়ে-যাওয়া জমির উদাম বুক ধানগাছের স্মৃতিতে কুয়াশার ভেতরে একটু কঁপে কাৎলাহার বিলের ওপরকার কুয়াশা আঁশটে পানির গন্ধে পুরুষ্ট হচ্ছে। ওদিকে তাকিয়ে শরাফতের বুক পেট মাথা ভরে যায় কানায় কানায়।
শীতের সন্ধ্যা নামে ঝপ করে, কুয়াশার কোলে-পিঠে অন্ধকার ক্রমে ঘন হয়। বিলের হাওয়া এসে লাগে শরাফতের কিস্তি টুপি-পরা মাথায়। ঘরের ভেতরে গিয়ে পশমি-টুপি মাথায় দিয়ে, গলায় মাফলার ও গায়ে খয়েরি শাল জড়িয়ে সে নামে বারান্দার নিচে। নিচে নামলে বিল চলে যায় চোখের আড়ালে। তখন আবছা আবছা শোনা যায় নামীদামি মানুষের কথাবার্তা। চোখের সামনে দোলে ছোটোমিয়ার হাতের ছড়ি। এই ছোট্টো দাদাভাইটা মরে গিয়ে শরাফতকে আজ কী ইজ্জতটাই না দিয়ে গেলো! আর সেই মাসুম বাচ্চাটাই পড়ে থাকে মাটির নিচে একা একা। সবই আল্লার ইচ্ছা!—শরাফতের দুই চোখ বেয়ে নামে পানির ধারা। সে তখন আস্তে আস্তে হাঁটে পশ্চিমের দিকে, বাড়ির পেছনে পালানে জোড়াপুকুরের ওপারে বেগুনখেত পেরিয়ে মস্ত বাঁশঝাড়। বাঁশঝাড়ের গা ঘেঁষে হুমায়ুনের কবর।
চল্লিশ দিনে হুমায়ুনের কবরে ঘাস গজিয়েছে, চারপাশে শীতের দাপটে ঘাসগুলো একটু রক্তশূন্য। এর ওপর টাঙানো কুয়াশার মশারি, সামনে গেলে মশারি পাতলা হয়ে আসে। শরাফতের বাবা, মা, সৎ, বড়োভাই, ভাবী ও ছোটেভাইয়ের কবর। সবই এলোমেলো। এই কবরগুলো এখানে তবু চেনা যায়। এছাড়া এই বড়ো জমিটা জুড়ে শুধু কবর আর কবর। সে গুলোকে আলাদা করে চেনা কঠিন। বড়ো বড়ো ঘাস আর গাছড়ার নিচে কোনোমতে মুখ গুঁজে থাকে। শুধু এই জমির শেষ মাথায়, একেবারে উত্তর পশ্চিম কোণে কালাম মাঝি মাঝে মাঝে এসে মোমবাতি জ্বালিয়ে যায়, সেটা নাকি ওর বাপের কবর। কবরে মোমবাতি দেওয়া বেদাত কাম, মোহাম্মদি জামাতের মানুষ হয়ে শরাফত এটা সহ্য করতে পারে না। কিন্তু কালাম মাঝি বড়ো ঘাড়ত্যাড়া মানুষ, তাকে দুই একবার বলে লাভ হয় নি, সে জবাব দেয়, হামাগোরে আলাদা জামাত, হানাফির গোরস্থান, হামার দাদা পরদাদা তার পরদাদা সোগলি এটি আছে। মোমবাতি হামার দেওয়াই লাগবি। জায়গাটা অবশ্য আগে থেকেই গোরস্থান ছিলো, এখানে মাঝিদের কাছ থেকে জমি কেনার সময় শরাফতের বাপ দলিলে পুরো জমিটাই নিজের নামে লিখে নেয়। তবে শরাফতের বাপের আমলেও মাঝিদের লাশ কিন্তু দাফন হতো এখানেই। শরাফতের জমি বাড়তে লাগলো পশ্চিমে ও উত্তরে, এমন কি কালাম মাঝির এক ভাগীদারের কাছ থেকে গোরস্তানের দক্ষিণের মজা ডোবাটাও মণ্ডল কিনে নিয়েছে আকালের বছর। গোরস্তানের চারো দিকের জমি শরাফতের দখলে আসার পর সে এমন চাষবাস শুরু করে দিলো যে, মাঝিপাড়ার মানুষ এখানে গোর দেওয়ার রেওয়াজ চালু রাখতে আর সাহস পায় না। কাৎলাহার বিলের উত্তর পুবের একটা পতিত জমি শরাফত তাদের দেখিয়ে দিয়েছে, বেটারা সেখানেই মড়া পেতে আজকাল। এই কালাম মাঝির মতো রগত্যাড়া মানুষ মাঝে মাঝে এটা সেটা কয়। বাপের কবরে মোমবাতি দেওয়ার নাম করে মরা মাঝিদের অছিলায় এখানে জ্যান্ত মাঝিদের দখল কায়েম করার ফন্দি করে। বুলু মাঝি মরলে তাকে এখানে গোর দেওয়ার কথা উঠিয়েছিলো এই কালাম মাঝিই। তা কী করতে পারলো? বুলুর দাফনে শরাফত খরচা করলো কতো। কালাম মাঝির এতো বড়ো দোকান থেকে একটা পয়সা তো বেরুলো না। এরপর বুলু মাঝির দাফন কোথায় হবে সে নিয়ে মাঝির বেটারা আর কথা বলতে পারে? শরাফত মণ্ডল বিল। ইজারা নেওয়ার পর থেকেই কালাম হিংসায় ফেটে যাচ্ছে। আরে বাবা, জমিদার তার এলাকার ভেতর কাকে কী দেবে সে জানে কেবল জমিদারই। হিংসা করে কালাম মাঝি কী করতে পারে? মাঝিপাড়ার সবাইকে জমি বর্গা দিয়ে শরাফত তাদের বিলের কথা ভুলিয়ে ছাড়বে। আজ জেয়াফতে মাঝিপাড়ার একটি প্রাণী বাদ পড়ে নি। কালাম মাঝি প্রথমদিকে এলো না দেখে কাদের তমিজকে পাঠাতে চেয়েছিলো। মণ্ডল বললো, আসবি বাবা। দোকানপাট করে, কতো কাম তার। দেরি হবার পারে। তা সে ঠিকই এসেছিলো। কালাম মাঝির ছেলে তহসেন বর্ধমান জেলায় কোথায় পুলিসের চাকরি পেয়েছে, ছুটিতে বাড়ি এসেছে। শরাফত সেদিন নিজে তাকে বলে এসেছিলো। সে তো এসে খানকাঘরে ভদ্রলোকদের মধ্যে দিব্যি খেয়ে গেলো। বিকালের দিকে কালাম কখন এসে গোয়ালঘরের পেছনে আর দশজন মাঝির কাতারে বসেছিলো, শরাফত সব খবরই রাখে। কালাম মাঝির জারি-জুরি আর কতোদিন? গোরস্থান দখল করার ফন্দি ওর আজই মিটে যাবে।
