হুঁ, এই গানই করিছিলো গো, মানুষটা এই গানই করিছিলো গো, মানুষটা এই গানই করিছিলো। জড়ানো জিভ থেকে তার কথা পড়ে গড়িয়ে গড়িয়ে, চোখজোড়া তার খুঁজে খুঁজে আসে। পিড়ি থেকে সে পড়েই যেতো, মণ্ডলের ছোটোবিবি পেছন থেকে তাকে ধরে ওঠায় এবং নিয়ে যায় হামিদার শোবার ঘরে। হুমায়ুনের পাশে তাকে শোয়াতে না শোয়াতে হামিদা ঘুমিয়ে পড়ে।
হুমায়ুনের দাফনের সময় হামিদার ভাই টাউনের এক জবরদস্ত মৌলবিকে নিয়ে এসে বাড়িটাকে দোয়াদরুদ পড়িয়ে ভালো করে বাঁধিয়ে দেয়। চল্লিশ দিন ধরে হামিদার ঘরে কোরান শরিফ পড়া হচ্ছে। তবে হামিদার দেখা কাফনপরা মানুষটার ব্যাপারে কারো কোনো গা নাই। সেই একটি রাতের পর হামিদাকে সেও তো একবার চোখের দেখাটাও দেখতে এলো না।
১৬. মরার কথা ইশারায় জানিয়ে দিয়ে
বেটার মরার কথা ইশারায় জানিয়ে দিয়ে পাকা দেড়টি মাস পর কাফনের কাপড় পাল্টে খয়েরি-নীল চেক-কাটা লুঙ্গি পরে এই ভর দুপুরবেলা ওই মানুষটা এসেছে ওই ছেলেরই চল্লিশার ভাত খেতে। তাও একবার খেয়ে তার আশ মেটে নি, বেহায়ার মতো ফের বসেছে কলাপাতা পেতে। হামিদা মানুষটাকে দেখে, ভালো করে দেখে; তার নজর লেগেই কি-না কে জানে, লোকটার কাঁচাপাকা দাড়িগুলো দেখতে দেখতে পেকে ওঠে। এবং তার গলায় গজিয়ে ওঠে শেকলের মালা। এইসব কাণ্ডে হামিদার নজর দেওয়ার শক্তি লোপ পায় এবং তার চোখজোড়াও বুজে আসে। তবে তার শরীরের কাঁপুনি কমে।, ওই কাঁপুনির ধাক্কায় তার মায়ের শরীর কাঁপে দ্বিগুণ বেগে। তবে মেয়ের মতো তার জবান বন্ধ হয় নি। হামিদার মায়ের বিলাপে ভেতর-উঠান থেকে অনেকেই এই ঘরে আসে এবং তাদের অনেকেই হামিদার বিচলিত হওয়ার কারণ বুঝতে না পেরে তার ওপর বিরক্ত হয়। তবে সহানুভূতিও কারো কারো ছিলো বৈ কি? তারা জিভ দিয়ে চ চ। এবং গলায় নানারকম ভিজে আওয়াজ করে। তবে তাদের কিছুই করবার নাই এবং বৌয়ের প্রতি দায়িত্ব পালনের অধিকার তাদের এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয় নি। তাদের। সমবেদনা প্রকাশ অন্যদের বিরক্তিকে আরো বাড়ায়। রীতিমতো রাগ করে হামিদার শাশুড়ি, শরাফতের বড়োবিবি। বৌয়ের ওপর রাগের চোটে নাতির শোক তার স্থগিত থাকে এবং অনেকদিন পর হুমায়ুনের জন্যে উদ্বেগ ও কষ্ট থেকে মুক্ত হয়ে বিশুদ্ধ ক্রোধের হাওয়ায় তার নিজের রেওয়াজ বাতিল হয়ে যায়। পুবদুয়ারি ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে।
বারবার ডাক পেয়ে আবদুল আজিজ একবার আসে। হামিদার এইসব ব্যাপারে সে বেশ ব্ৰিত, বিচলিতও বটে। শাশুড়ির সামনে বৌয়ের সঙ্গে রাগারাগি করার ঝুঁকিও নিতে। পারে না, তাই হামিদাকে সে ধমকায় একটু আদুরে গলায়, বাবরের মা, তুমি একটু শক্ত না হলে চলে? মনটা শক্ত কর। আল্লার মাল আল্লার পছন্দ হছে, নিয়া গেছে।
আজিজ ঘরে ঢুকতে তার শাশুড়ি সরে গিয়েছিলো দরজার আড়ালে। টাউনের শাশুড়ি, লজ্জাশরম কম, তাই ওখান থেকেই জামাইকে সরাসরি বলতে পারলো, হামিদা টাসকা ল্যাগ্যা গেছে বাবা, একটা বড়ো ব্যারাম হতে কততক্ষণ? কাল না হয় হামি অক সাথে করা লিয়া যাই।
শুনে সবাই ঠোট বাঁকায়, বেটা যেন কারো আর মরে না! বেটার শোকে মায়ের কঠিন ব্যারাম হবে কেন? এটা আবার কোন দেশী কথা গো? টাউনের বুড়িগুলোর আক্কেল জ্ঞান কম।
এদিকে বৌয়ের রোগশোক নিয়ে পড়ে থাকলে আবদুল আজিজের চলে না। উঠানে সারি সারি বসা মেয়েদের পেছন দিয়ে সে চলে যায় বাইরে মজলিশের মাঝখানে। বৌ-সোহাগের সময় কোথায় তার? মানুষ এতো এসেছে, এরকম জেয়াফত তাদের বাড়িতে এই প্রথম। বংশে মানুষ কি আর মরে নি? তার দাদার চল্লিশায় ফকির খাওয়ানো হয়েছিলো, জনা পঁচিশেক মানুষ ছিলো কিনা সন্দেহ। আর আজ তার নিজের ছেলের মৃত্যুতে এতো বড়ো আয়োজন। আজিজের চোখ ছলছল করে, হুমায়ুন মরে গিয়ে বাড়িতে এতো মানুষের জমায়েতের পথ করে দিয়ে গেলো। অথচ আজিজের নিজের অফিসের একটি মানুষও এলো না। কেরানির চাকরি করে, তাকে পোছে কে? কিন্তু চাকরি সে যতো ছোটোই করুক, তার বাড়িতে কত মানুষের উৎসব হতে পারে সাব-রেজিস্ট্রার সাহেবকে একবার দেখাতে পারলে লোকটা কথায় কথায় তার ইংরেজি ভুল ধরার বাতিকটা কাটিয়ে উঠতো। লোকটা নিজে না আসুক, অফিসের একটা চাপরাশি এসেও যদি এই বাড়ির আজকের হালটা দেখে যেতো তো জয়পুর ফিরে গিয়ে অফিসের আর সবাইকে অন্তত ওয়াকিবহাল তো করতে পারতো!
বয়স কম হলে কী হয়, কাদেরটা এদিক থেকে অনেক চালাক। টাউনে সব ব্যবস্থা করে এসেছিলো, সবাই একসঙ্গে হয়ে ১৫/২০ জন মানুষ টমটমে করে এসেছে হৈ চৈ করতে করতে। গাড়ি থেকে নেমেই তারা মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ, কায়েদে আজম জিন্দাবাদ, লড়কে লেঙে, পাকিস্তান, নাড়া দিয়ে গ্রাম কাঁপিয়ে তুললো। জেলার নেতাগোছের মানুষও এসেছিলো তিন জন। কাদেরের এই মেহমানদের যেভাবে আজ খাওয়ানো হলো তাতে টাউনে কাদেরের পজিশন কতো বাড়বে!
সেখানে আবদুল আজিজের হালটা কী?-শোক, আক্ষেপ ও চিনচিনে হিংসা থেকে আজিজকে উদ্ধার করে গোলাবাড়ি প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার আলিমুদ্দিন। লোকটা হাজির হলো একেবারে বিকালবেলা। এক স্কুল ছাড়া মানুষটা সব জায়গাতেই লেট। মানুষ পেলেই দাঁড়ায়, আর চাষাভুষাদের সাথে তার জমে বেশি। বাড়ি অনেক দূরে, পশ্চিমে শান্তাহার কি আদমদিঘির ওদিকে, এখানে থাকে গোলাবাড়ির উত্তরে এক চাষার বাড়িতে। তার চাষবাসের কাজেও হাত লাগায়, নইলে চাষা তাকে থাকতে দেবে কেন? চাষাদের সঙ্গে তার মেলামেশা দেখে কাদের তার সঙ্গে লীগের ব্যাপার আলাপও করেছে, তেমন আমল বোধহয় পায় নি। আজ তাকে দেখে আবদুল আজিজ তার স্বভাবের অতিরিক্ত তৎপরতা দেখিয়ে আলাপ করে এবং খানকাঘরে নিয়ে তাকে বসায় মেহমানদের সঙ্গে। খাওয়া দাওয়া তখন তাদের শেষ। তবে কাদেরের লীগের কর্মীদের কেউ কেউ তখনো খায় নি। আলিম মাস্টারকে আজিজ তাদের সঙ্গে ভিড়িয়ে দিলো।
