তমিজের বাপ কিন্তু আসে নি। বেটার কাছে টুকরা টুকরা করে হামিদার স্বপ্ন বা জাগরণে দেখা ঘটনার সবটাই সে শোনে। প্রায় ঝিমাতে ঝিমাতে শোনে এবং শুনে ঝিম ধরে বসে থাকে। সন্ধ্যা হতে না হতে সানকিভরা ভাত খেয়ে মাচার ওপর চিৎপটাং হয়ে সে ঘুমায়। ঘুমের ভেতর তার যাবতীয় বিড়বিড় করা শুনতে সেদিন অনেক রাত্রি পর্যন্ত জেগে ছিলো কুলসুম। তমিজের বাপের মুখ থেকে মেলা আওয়াজই তো বেরোয়, কিন্তু এর কোনোটাই কুলসুমের কানে শব্দের গড়ন পায় না। তবে দাদার কোনো কোনো শোলোকের রেশ আঁচ করা যায়। এতে কুলসুমের মাথাটা শুধু কামড়ায়।
সেই রাতে নাকে লোবানের গন্ধ পেয়ে ও কানে গুনগুন শোলোক শুনে হামিদা নতুন করে ভয় পায়। ঘরভরা মানুষ সেদিন তার সঙ্গে জেগে ছিলো। হামিদার বড়ো বড়ো চোখে অপরিচিত ছায়া দেখে তাদের গা ছমছম করে। সকালবেলা কাদের তাড়া দেয় তমিজকে, তার বাপ এসে হামিদাকে অন্তত বানিয়ে বানিয়েও দুটো কথা বলুক। বাড়িতে তমিজ বাপকে রীতিমতো শাসায়, সে যদি মণ্ডলবাড়ি না যায় তো শরাফত তাদের জমি বর্গা করতে দেবে আর? বাপ এরকম করলে তমিজ কিন্তু এসপার ওসপার একটা কিছু করে ফেলবে। ছেলের হুমকিতে বাপ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, . তাকিয়েই থাকে। এ ছাড়া তার আর কোনো প্রতিক্রিয়া বোঝা যায় না।
কুলসুম তখন নিজে মণ্ডলবাড়ি যাবার প্রস্তাব করে। তা কুলসুম গেলেও হয়। হাজার হলেও সে হলো চেরাগ আলি ফকিরের নাতনি। তমিজ জানে তার এই সত্যটি কম মানুষ নয়। তার বাপটাকে এখনো ফকিরের কবজার মধ্যে ধরে রেখেছে এই কুলসুমই।
তমিজ ও কুলসুম পাশাপাশি হাঁটে এবং তমিজ মহা উৎসাহে হামিদার ভয় পাওয়ার গল্প বলে। অনেকটা এসে, বুলু মাঝির পালান পেরিয়ে তমিজ পেছনে তাকিয়ে দেখে, একটু দূরে ফকিরের ঘাটে দাঁড়িয়ে বাপ তাদের একসঙ্গে হাঁটা আর কথা বলা দেখছে। তমিজের বাপ দাঁড়িয়েই থাকে, তারা চলে মণ্ডলবাড়ির দিকে।
কুলসুমের কাছে হামিদা সেই রাতের বিস্তারিত বয়ান পেশ করে। সে শুরু করেছিলো ওইদিন সন্ধ্যা থেকে হুমায়ুনের কপালে জলপট্টি দেওয়া, এশার নামাজের পর তার ক্লান্ত সৎশাশুড়ির পাশের ঘরে জিরোতে যাওয়া এবং ছেলের পায়ের কাছে। আজিজের ঘুমিয়ে পড়ার বর্ণনা দিয়ে। যতোটা সময় জুড়ে এইসব কাণ্ড ঘটে, বর্ণনাতে সে বরাদ্দ নেয় প্রায় ততোটা সময়। এর ফাঁকে ফাঁকে তার ছেলের বিদ্যাবুদ্ধি, } খেলাধুলায় তার পারঙ্গমতা, ছেলের ওপর তার টাউনবাসী মামুদের প্রভাব এবং বড়ো ছেলে বাবর ও ছোটো ছেলে হুমায়ুনের স্বভাবের মিল ও পার্থক্য সম্বন্ধে অনেক তথ্য সে পরিবেশন করে যায়। অনেকগুলিই কুলসুম কিছু না বুঝলেও তার কাছে সেসব বিরক্তিকর কিংবা অপ্রাসঙ্গিক ঠেকে নি। হামিদার প্রত্যেকটি কথাই সে শুনছিলো নিবিষ্টচিত্তে, তার মুখ ছিলো সম্পূর্ণ বন্ধ। মাঝে মাঝে ঠায় বসে থেকে একটুও না ঝুঁকে সে নাক টেনে গন্ধ নিচ্ছিলো, গন্ধে গন্ধে হামিদার স্বপ্নের ভুলে-যাওয়া টুকরাগুলো হয়তো কিছু পাওয়া যেতে পারে। তবে সেই রাতে ছেলের জ্বরতপ্ত কপালে হামিদার চুমু খাওয়ার কথায় কুলসুম কেঁপে ওঠে। কাঁপুনি চেপে রাখতে চেষ্টা করলে তোলপাড় ওঠে তার বুকে, খানিকটা পাঁজরার হাড়ে এবং এতেই সেখানে বেড়ে ওঠে চেরাগ আলির গলা। কুলসুম স্পষ্ট শোনে,
খোয়বে জননী চুধে পুত্রের ললাটে।
ঝাঁপ দিয়া পড়ে বাছা মণ্ডতের ঘাটে।।
চুম্বিলে পুত্রেরে মা গো কী কহিব আর।
আজরাইল লুকায়া ছিলো ওষ্ঠেতে তোমার।।
তারপর হামিদার স্বপ্নে, হামিদা অবশ্য স্বপ্ন বলে মানতে চায় না, স্বপ্ন হলে হ্যারিকেন সত্যি সত্যি নিভে যায় কী করে?-কাফনপরা মানুষটি গায়েব হয়ে গেলে বাইরে যে শোলোক শোনা গিয়েছিলো কুলসুম সেটা শুনতে চায়। হামিদা তার একটি অক্ষরও মনে করতে পারে না, কুলসুমের বারবার তাগাদায় সে চোখ বন্ধ করে ভাবে, কিন্তু লাভ হয় না। ততোক্ষণে কুলসুম মাথার ভেতরে শোনে চেরাগ আলির দোতারার টুংটাং বাজনা। কুলসুম আস্তে করে বলে, আমি কই? মনে করা দেখেন, এই শোলোক লয়? এরপর কুলসুমের গলা একটু মোটা হয়, বোধহয় তার গলায় গাইতে শুরু করে চেরাগ আলি,
তপ্ত দেহে পোড়ে পাখি, জননীর না পড়ে আঁখি
আঁখিটি মুঞ্জিলে পরে ঘরত পাখি নাই।
ওগো ওগো মা জননী ঢাকো তোমার চোক্ষের মণি
ডিমের ভেতরে ডানা কেমনে ঝাপটাই।
জননী মুঞ্জিলে চক্ষু উড়াল দিয়া যাই।
মা জননী ঘুমাও গো এবার বিদায় চাই।।
শুনতে শুনতে হামিদার চোখে নামে ভয় আর উত্তেজনা। এই ভরদুপুরে নামে হ্যারিকেন নিভে-যাওয়া ঘনঘোট আন্ধার রাত, এর মধ্যে কুলসুমের গলায় সে শোনে সেই রাত্রির শোলোক। ব্যাকুল হাতে সে জড়িয়ে ধরে কুলসুমের হাত এবং জড়ানো গলায় বলে, ওই শোলাকই তো। একটা কথার ফারাক নাই। আরেকবার ক বুবু, আরেকুবার ক।
বুবু সম্বোধনে কুলসুম বিগলিত হয়, এক্ষুনি গুনগুন করা শোলোক তার গুলিয়ে যায়। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে পুরো শোলোক ফের মনে করার চেষ্টা করে, হামিদা মিনতি করে, বুবু, তুই আমার মায়ের পেটের বোন। আরেকবার ক বুবু। কিন্তু হামিদার চোখ তন্দ্রায় জড়িয়ে আসছে। কুলসুম ফের বলে,
চান্দ জাগে বাঁশ ঝাড়ে কতো কতো ডিম পাড়ে।
ভাঙা ডিমে হলুদবরণ হইল সকল ঠাঁই।
উঁকি দিয়া দেখি হামার ফকির ঘরত নাই।।
ময়না পাখি উড়াল দিছে কোনঠে তারে পাই।।
