ঘরে একা জাগে হামিদা। জলপট্টির ভিজে ন্যাকড়া হুমায়ুনের শিওরের বালিশের পাশে রাখা কাঁসার জামবাটির পানিতে ভিজিয়ে হামিদা ওর কপালে রাখতে না রাখতে শুকিয়ে যায়, শুকিয়ে গরম হয়ে যায়। মানুষের শরীরে এতো তাপ? হুমায়ুনের শরীর থেকে ভাপ বেরোয়, এই ভাপে হামিদার চোখ জ্বলে। চোখ বুজলে একটু আরাম পাওয়া যায়। বেশ আরাম!-বাবা আম, সোনা আমার, আমার আব্বা, আমার ময়না।হামিদা তার ঠোট রাখে ছেলের কপালে, ঠোট রাখে ছেলের গালে। ঠোট রেখে সে ছেলেকে চুমু খেতে থাকে। চুমুর চুমুকে সে শুষে নেবে ছেলের সব তাপ, সব জ্বালা।আল্লা, আল্লা গো, আমার ছেলেকে তুমি ভালো করে দাও। আমার ছেলের সব রোগ, সব তাপ তুমি আমাকে দাও আল্লা। আমার হুমায়ুনকে তুমি ভালো করে দাও।আল্লাকে সে এইসব কথা বলছে, এমন সময় হামিদার পিঠে লাগে ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝলক। তাহলে আল্লা তার মিনতিতে সাড়া দিয়েছে। ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটা পাঠিয়ে দিলো, এই শীতল বাতাসে। ছেলের গা জুড়াবে। এরপর হামিদার গায়ে লাগে আরেক ঝাপটা ঠাণ্ডা হাওয়া, তার মাথাটা আরো ঝরঝরে হয়। কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গে নাকে লাগে লোবানের গন্ধ। লেবানের গন্ধে তার বুকে ধক করে আওয়াজ হয়, সে চট করে মাথা তোলে। তার সামনে সাদা ধবধবে কাপড়পরা কাচাপাকা দাড়িওয়ালা একটা মানুষ। লোকটার গলায় ঝোলানো লম্বা লোহার শেকল। হামিদার ডান হাতটি তখন ছেলের বুকের ওপর, সেই হাতটিতে তার ধরা রয়েছে জলপট্টির শুকনা ন্যাকড়া। তার হাতের ভারে ছেলেটা বুঝি হাঁসফাঁস করছে। কিন্তু হামিদা না পারে তার হাতটা তুলতে, না পারে সাদা কাপড় জড়ানো লোকটির চেহারা থেকে চোখ সরাতে। ঘরের দরজা জানলা সব বন্ধ; হুমায়ুন অসুখে পড়ার পর থেকে জানলাগুলো সব সময়েই বন্ধ থাকে, আর বিকাল হতে না হতে দরজা আটকে দেয় বড়োবিবি। তাহলে এই লোকটি ঘরে ঢুকলো কী করে, এই প্রশ্নটি কিন্তু তখন হামিদার মাথায় ওঠে নি। বরং সুবেহ সাদেকের হালকা আলোর মতো একটি জিজ্ঞাসার আঁচ লাগে তার শরীর জুড়ে : এই মানুষটিকে সে কোথায় দেখেছে? কবে দেখেছে? ঘোলাটে লাল চোখে লোকটি হুমায়ুনকে দেখে। তার চোখের ঘোলাটে সাদা জমি জুড়ে ঘোলা আলো। মণিহীন চোখ সে ফেরায় হামিদার দিকে। তার ঠোট নড়ে না, কিন্তু বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে ফ্যাসফেসে কথা, আর কদ্দিন? বেটাকে এখন আরাম দে, আরাম দে! লোবানের গন্ধ আরো তীব্র হয়।
এই খসখসে স্বর হামিদা আগেও শুনেছে। কোথায় শুনলো? কবে শুনলো? কোনোদিন কি শুনেছে?–এসব মনে করার চেষ্টা বাদ দিয়ে সে বলে ফেলে, যাও।। যাও। কিন্তু বোৰা-ধরা মানুষের মতো তার গলা থেকে আওয়াজ বেরোয় না। দুই কামরার মাঝখানে খোলা দরজায় পেরেক ঝোলানা হ্যারিকেনে সলতে জ্বলছিলো কালচে লাল আলোয়। সেই আলোয় মানুষটির পরনের সাদা কাপড়টিকে হামিদা কাফনের কাপড় বলে ঠাহর করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে হ্যারিকেন দপ করে জ্বলে উঠেই নিভে গেলো। বাতি নেভার আগে দুপ-করে জ্বলে-ওঠা আলোয় কাফনের ওপর কয়েক জায়গায় ছোপ ছোপ মাটির দাগও হামিদার চোখে পড়ে। আলো যাওয়ার পর মানুষটিকে আর দেখা গেলো না। তবে এর পর উঠানে গুনগুন শোলোক শোনা যায়। গানের কথাগুলো হামিদা শুনতে পায় সবই, কিন্তু ঘর্ঘর গলার স্বর মিশে যেতে না যেতে হামিদা চিৎকার করে পড়ে যায় ছেলের বুক ঘেঁষে।।
কিছুক্ষণের মধ্যে পানির ঝাপটায় তার জ্ঞান ফেরে, ঘরে তখন ঘরভরা মানুষ। বাকি রাতটায় হুমায়ুন ছাড়া আর কারো ঘুম হয় না। হঠাৎ করে তার জ্বর নেমে আসে ১০০ ডিগ্রিতে। হামিদা রাতভর তার দেখা দৃশ্য শব্দ ও গন্ধের বিবরণ দেয়, ভয়ে কাঁপা গলায় তার বর্ণনা ক্রমেই অস্পস্ট ও এলোমেলো হতে থাকে।
শরাফতের ছোটোবিবি টের পায়, এসব চেরাগ আলি ফকিরের কেরামতি। কাউকে বলে সে কোথায় না কোথায় চলে গিয়েছে, কোথায় তার মরণ হয়েছে কে জানে? সে-ই কোনো ভেক ধরে এসে এই গাঁয়ের ছেলেদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে নিজের ঠিকানায়। হামিদার এই খোয়বের মাজেজা যদি কেউ বার করতে পারে তো এক তমিজের বাপ ছাড়া আর কেউ নয়। চেরাগ আলির সঙ্গে সঙ্গে থাকতে তো কেবল সেই। ফকিরের নাতনিকে বিয়ে করার পর তার যাবতীয় বিদ্যা, যাবতীয় বুদ্ধি, যাবতীয় ফন্দিফিকির এখন চলে এসেছে তার কবজায়। হামিদা বারবার জানায়, সে তো স্বপ্ন দেখে নি। স্বপ্নই যদি দেখবে তো হ্যারিকেন সত্যি সত্যি নিভে যায় কী করে? সে বেহুঁশ হয়ে পড়লে আবদুল আজিজ জেগে উঠে ঘর কি অন্ধকার পায় নি। তারপর, স্বপ্নে মানুষ কি আর লোবানের গন্ধ পায়? এই গন্ধটি কিন্তু ছোটোবিবির নাকেও ঢুকেছিলো।
পরদিন সকাল থেকে বাড়ির সবার মেজাজ ফুরফুরে। হুমায়ুনের জ্বর ৯৯.৫ ডিগ্রি, নেবুর রস দিয়ে সে বার্লিও খেয়েছে আধ বাটি। হামিদা কিন্তু ছেলের রোগশষ্যা থেকে এক পা নড়ে না। কিছুক্ষণ পরপর সে কেবল শিউরে শিউরে ওঠে।
তমিজের বাপেক ডাকো। বাবরের মায়ের খোয়বের তাবির না শুনলে হুমায়ুনের কী হবি কেউ করার পরবি না। মণ্ডলের ছোটোবিবি বারবার করে বললে আজিজেরও ভয় লাগে। ছেলের সঙ্গে বৌও পড়ে গেলে আবদুল আজিজের হালটা হবে কী? সুতরাং
তমিজকে দিয়ে খবর পাঠানো হলো তার বাপকে। ঘরের ব্যাপারে চারবাকর কি আধিয়ারদের জড়ানো শরাফত মণ্ডল কিংবা আজিজ একেবারেই পছন্দ করে না। কিন্তু হামিদার জোর হলো তার সৎশাশুড়ি, ছোটোবিবির সঙ্গে লাগতে যাওয়া শরাফতের। পক্ষে কঠিন। আর আজিজ কি আর নিজের বৌকে ভয় পেয়ে মরতে দেখবে?
