চারচালা টিনের ঘরের জানলার কপাট একটু ফাঁক করে দুইজন মানুষের দুই ধরনের আপত্তি অগ্রাহ্য-করা এক বুড়োর প্রবল তেজে খাওয়া দেখছিলো আবদুল আজিজের শাশুড়ি। নাতি মরার পর দিন সে এসেছিলো টাটকা শোক নিয়ে। এবার দিন তিনেক হলো এসেছে মেয়ের শোক ও নাতির চল্লিশায় যোগ দিতে। মণ্ডলের দুই নম্বর বিবির অনুরোধে খাস মেহমানদের রান্নার দেখাশোনাও করছে সে-ই। এদের বাড়ি টাউনের সঙ্গেই। তাদের হাটবাজার, টুকটাক ব্যবসাপাতি, রোজগার কামাই সব টাউনেই। ছয় মাসে নয় মাসে ফাস্ট শো টকি দেখে তাদের বাড়িতে মেয়েরা বাড়ি ফেরে শাড়ি-জড়ানো রিকশা করে।
টাউনের প্রভাবে এবং একটু টানাটানির জন্যেও বটে, তাদের খাওয়া-পরা, ঘোরাফেরা মোটামুটি ছিমছাম। উত্তেজনা যেটুকু আছে তাও. প্রায় বাঁধা ধরা। টাউন তাদের একেবাইে ছোটো; কিন্তু চাষবাস নাই বলে রোজগার সম্বন্ধে মোটামুটি আগে থেকেই সব জানা। জীবনযাপনও তাই ধরাবাঁধাই বলা চলে। মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে নাতির চল্লিশায় হৈ চৈ, ভিড়ভাট্টা এবং অনির্ধারিত ও অকল্পনীয় উত্তেজনা দেখে এবং খানদানি মেহমানদের রান্নার তদারকি করার সুযোগ পেয়ে হিংসায়, খুশিতে, গর্বে আজিজের শাশুড়ি ছটফট করে এবং যেদিকে চোখ যায় তাই দেখে নেয় নয়ন ভরে। রান্না সেরে মুখে একটা পান পুরতে এবং মেয়েকে কাছে পেলে ভালো রান্না সম্বন্ধে এই বাড়ির মানুষের সীমাহীন অজ্ঞতা নিয়ে তাকে যথাযথ ধারণা দিতে সে এসেছিলো মেয়ের ঘরে। জানলার ঠিক বাইরে কাঁচাপাকা দাড়িওয়ালা একটা বুড়াকে এরকম হেনস্থা হতে দেখে সে হেসে ফেলে। ব্যাপারটা দেখে সে বেশ তারিয়ে তারিয়ে এবং যতোই দেখে, ততোই হাসে।
ভেতর উঠানে সারি সারি কলাপাতার সামনে বসা মেয়েদের এবং তাদের কোলেপিঠেবুকে আসা রোগা, বেঢপ মোটা, পেটফোলা, মাথায় ঘা, চোখে পিঁচুটি ও নাকে-সিকনি বাচ্চাদের খাওয়ার তদারকি করতে করতে হামিদার হঠাৎ হঠাৎ করে মনে পড়ে তার ছেলের কথা। এতোগুলো মানুষ আজ মেতে উঠেছে ভাতের উৎসবে, গোশতের উৎসবে। তার সোনার টুকরা, বুকের মাণিকের অছিলাতেই এই বাড়িতে আজ এতোগুলো মানুষের মুখে ভাতের গেরাস ওঠে। অথচ, হায় রে, ছেলেটা তার কিছুই দেখতে পারলো না।-চোখের পানি মুছতে মুছতে হামিদা তার নিজের ঘরে এসে বিছানায় বসে হুহু করে কাঁদে। কিন্তু কান্নার সময় কৈ তার? তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে তাকে ফের যেতে হয় উঠানে। সে নিজের হাতে যতো মানুষকে যতো তৃপ্তি দিয়ে খাওয়াতে পারবে, মাসুম ছেলেটার রুহে ততো শান্তি, ততো তৃপ্তি। এখনি ফের উঠানে। যাবে বলে হামিদা উঠতে যাচ্ছিলো, জানলার পাশ থেকে ডাক দিলো তার মা, ও হামিদা, দেখ, মানুষটা ক্যাংকা করা ভাত খাচ্ছে, দেখ। আর একবার বলে খায়া আসিছে। দেখ, একোটা লোমা কতো বড়ো? গাঁয়ের মানুষ এতোও ভাত খাবার পারে গো!
গ্রামের মানুষের বেশি বেশি ভাত খেতে দেখার প্রবৃত্তি হামিদার একেবারেই নাই। বিয়ের পর থেকেই এটা দেখে দেখে সে একেবারে অতিষ্ঠ। নেহায়েৎ মায়ের উৎসাহে হামিদা এসে দাঁড়ালো একটু-ফাঁক-করা জানলার পাশে।
ঐ সময়টায় গফুর কলু ও হুরমতুল্লার দুইরকম অভিযোগ ও ধিক্কার শুনতে শুনতে তমিজের বাপ আরো চারটে ভাতের আশায় পাত থেকে চোখ তুলে তাকিয়েছিলো ওপরের দিকে। এই ঘরের জানলার ফাঁক দিয়ে তার মুখটা এবার স্পষ্ট দেখা গেলো। তমিজের বাপকে দেখেই হামিদা একটা জোর ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ে পেছন দিকে। বিছানাটা ছিলো বলে বসে পড়লো ওটার পরেই। তা জানলা দিয়ে তমিজের বাপকে চোখে পড়ে এই বিছানা থেকেও। পাতে দ্বিতীয় দফা ভাত তখনো পায় নি বলে তমিজের বাপের মুখটা তখনো ওপরের দিকে ফিট-করা। সুতরাং হামিদা তাকে নয়ন ভরে দেখতেই থাকে। দেখতে দেখতেই সে কাঁপে এবং তার পাশে বসে মা তাকে জড়িয়ে ধরে ব্যাকুল হয়ে বলে, কী মা? কী হলো রে মা?
ফ্যাকাশে চেহারার মুখ দিয়ে হামিদা ফিসফিস করে, এই মানুষই মা! এই মানুষটাই গো হুমায়ুন যাওয়ার আগের দিন রাতে, না-কি তার আগের রাতে, তোমাক কলাম না মা, কই নাই? এই মানুষটাই আসিছিলো গো। হামিদার মায়ের সব মনে আছে। হামিদার সেই কালরাত্রির অভিজ্ঞতার কথা হামিদার মা শুনেছে হুমায়ুনের মৃত্যুর পরদিনই এখানে এসে। এই বাড়ির সব মানুষ এই ঘটনা জানে। গ্রামের লোকও অনেকে শুনেছে আর হামিদা তার মাকে বলেছে অন্তত একশো বার।
১৫. প্রস্রাবে রক্তের ধারা
মরার দুই দিন আগে হুমায়ুন সারা দিনে প্রস্রাব করলো তিন বার, প্রস্রাবে রক্তের ধারা। তার সারা শরীর জুড়ে জ্বর মেতে ওঠে মাতালের মতো, বাড়তে বাড়তে জ্বর উঠে পড়ে ১০৬ ডিগ্রিতে। মাথায় অনেকক্ষণ পানি ঢাললে তাপ একটু কমে। জ্বর তখন আড়ি পেতে থাকে বালিশের তলায়, তোষকের নিচে। রোগীর মাথায় পানির ধারা একটু থামতে না থামতে জ্বর ফের লাফিয়ে এসে আসন পেতে বসে হুমায়ুনের কপালে। হরেন ডাক্তার বলে গেলো, এতো পানি ঢাললে নিউমোনিয়া হতে পারে, বরং কপালে জলপট্টি দিলে হয়।
অনেক রাত পর্যন্ত জলপট্টি দিলো মণ্ডলের ছোটোবিবি, পাশে পালা করে বসছিলো আজিজ ও কাদের। কিছুক্ষণ পরপর বাটির পানি পাল্টে দিচ্ছিলো হামিদা। নিজের ঘরে। জলচৌকিতে রাকাতের পর রাকাত নামাজ পড়ে চললেও নাতির প্রতিটি মুহূর্তের খবর রাখছিলো শরাফত মণ্ডল। পুবদুয়ারি ঘরে বড়োবিবি হুমায়ুনের জ্বরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিয়মমাফিক গালাগালি করছিলো স্বামীকে, রাত বাড়তে বাড়তে ক্লান্ত হয়ে না খেয়ে ও এশার নামাজ না পড়েই সে ঘুমিয়ে পড়ে। রোগীর ঘরে এশার নামাজ পড়ার পর ছোটোবিবির হাত আর চলে না, চোখ খুলে রাখাও তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। কাদের চলে গিয়েছিলো আগেই। আজিজ আর হামিদা ছোটোবিবিকে একরকম জোর করেই পাঠিয়ে দিলো, অন্তত ঘণ্টা দুয়েক ঘুমিয়ে আসুক। ছোটোবিবি চলে যাবার পরপরই আবদুল আজিজ ঝিমুতে শুরু করে, কখন গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়েছে ছেলের পায়ের কাছে সে বুঝতেই পারে নি। মিহি স্বরে তার নাক ডাকার আওয়াজ পেয়ে হামিদা আস্তে করে ডাকে, বাবরের বাপ। ও বাবরের বাপ। এতে তার নাক ডাকা থামে, কিন্তু ঘুম ভাঙে না। ঘরটা সম্পূর্ণ নীরব হয়ে যায়। টিনের চালে শুকনা পেয়ারা পাতা পড়ে তিন ফোঁটা শিশিরের ভারে, হালকা ভিজে শব্দে ঘরের নীরবতায় এক ফোঁটা ফাঁক থাকে না।
