টিনের আটচালা ও নতুন চারচালার মাঝখানে চওড়া গলির ভেতর থেকে গোরুর–গোশতের তরকারির বালতি হাতে তমিজকে ছুটে আসতে দেখে কাদের চোখে ও ভুরুতে প্রশ্ন ফুটিয়ে তুললে তমিজ বলে, হুরমত পরামাণিক ক্যাচাল করিচ্ছে।
ঝামেলা হুরমতুল্লা শুরু করলেও এতে তীব্রতা দেওয়ার কৃতিত্ব গফুর কলুর। বাইরের উঠানে কয়েকশো মানুষ বসার পর মানুষ উপচে পড়লে ওই গলিতে মুখোমুখি দুটি সারিতে পঞ্চাশ ষাটজন মানুষ বসাবার হুকুম দিয়ে গিয়েছিলো কাদের নিজেই। এখান সেখানে যারা বসেছে তাদের মধ্যে আছে হুরতমুল্লা আর তমিজের বাপ।। পরিবেশনের দায়িত্বে থাকলেও প্রথম দল বিদায় হবার পর হুরমতুল্লা খিদেয় অস্থির হয়ে আর অপেক্ষা করতে পারে না, গলির একটি সারিতে পাতা পেতে বসে পড়ে একটু চাপাচাপি করেই। কিন্তু পাশেই তমিজের বাপ। কেন বাপু, গোয়ালঘরের পেছনেই তো তোমাদের মাঝির জাতের মানুষের পাত পড়েছে, ওখানে সাকিদারি করার কাজও করছে মাঝিপাড়ার লোক। ওখানে বসলে তোমার পাতে ভাতের ভাগ কি কম পড়বে? না-কি গোশতের বালতি তোমাকে বাদ দিয়ে চলে যাবে সামনের দিকে? এক সারিতে বসলেও হয় কথা ছিলো, তা তো নয়, তমিজের বাপ বসেছে তার গা ঘেঁষে। শালা মাঝির এঁটো পাতের সুরুয়ার ছিটা কি ভাতের একটা দানা হুরমতুল্লার পাতে পড়লে সে সহ্য করে কী করে? হুরমতুল্লা তাই চাচায়, মাঝি, তোমার জাতের মানুষ তো ওটি এক ঠেনে বসিছে। তুমি এটি পাত পাতো কোন আক্কেলে গো?
তমিজের বাপ এসব কথায় কান না দিয়ে তার কলাপাতার টুকরাটা হাত দিয়ে। মোছে, কলাপাতায় ময়লা দাগ পড়ে, বারবার মুছলে সবুজ রঙ চাপা পড়লেও সেদিকে তার খেয়াল নাই, তার দুই চোখেই সে তাকিয়ে থাকে ধোয়া-ওঠা ভাতের চাঙাড়ির দিকে, ওটা এ পর্যন্ত পৌঁছুতে আর কতো দেরি?
হুরমতুল্লার সব অভিযোগ শুনে গফুর কলু এগিয়ে আসে। তার মূল দায়িত্ব ভদ্রলোক মেহমানদের খেদমত করা। তারা তো এখানে খানকাঘরে বসে গপ্পো করেছ; এই সুযোগে সে কলুদের খাওয়ার দেখাশোনা করছিলো। কলুরা বসেছে শিমুলতলার বকের ঝকের নিচে। তাদের জন্যে গোশতের বালতিতে সুরুয়ার সঙ্গে গোশতের পরিমাণ নিশ্চিত করতে সে নিজেই যাচ্ছিলো ভেতর উঠানের দিকে। এদিক দিয়ে হাঁটার সময় জাত তুলে কথা বলতে শুনে প্রথমেই সে ধমক দেয়, মোসলমানের আবার জাত কী গো? খবরদার, জাতের কথা কলে এই বাড়িত খাওয়া চলবি না।
ধমকে হুরমতুল্লা ভয় পায়। কলু জাতের মানুষ হলেও গফুরের দাপট সম্বন্ধে হুরমতুল্লা ওয়াকিবহাল, তাই সে তাড়াতাড়ি অন্য নালিশ করে, জাতের কথা লয় বাপু, খালি জাতের কথা লয়। খ্যাপশা বুড়া খাবার বস্যা খালি পাদে, গোন্দে প্যাট হামার খালি ঘাঁটিচ্ছে। বুড়াক তুমি সর্যা বসবার কও।
গোশতের খুশবুতে অন্য যে কোনো গন্ধই তো চাপা পড়বে। তবু তমিজের বাপের এই কাজটিকে গফুর কলু অনুমোদন করতে পারে না। থুথু ফেলে সে নাকে হাত দেয়। তার দেখাদেখি এবং তার সম্মানে আরো কয়েকজন নিজনিজ পাতের সামনে গোশতের সুরুয়া মেশানো আঠালো থুথু ফেলে। ততোক্ষণে হুরমতুল্লা ও তমিজের পাতে ভাত পড়েছে এবং গোশতের সুরুয়াও দেওয়া হয়েছে দুই হাতা করে। দুজনেই ভাতের গর্ত করে গোশতের টুকরাগুলি আলাদা করে একটু আড়াল করে রেখে সুরুয়ামাখা আঙুল চোষে। গোশত পাতে পড়ার আগেই অবশ্য নুনমাখা ভাতের কয়েকটি লোকমা তাদের মুখে উঠে পড়েছে।
গফুর কলু কপাল কুঁচকে তমিজের বাপের মুখে সরাসরি তাকায় এবং হঠাৎ বলে, ক্যা গো তুমি না গোয়ালঘরের পাছামুড়াত বস্যা খায়া আসলা। আবার এটি খাবার বসিছো? ওঠো, এখনি ওঠো। দুইবার কর্যা কাকো খাওয়া দেওয়া হবি না। একবার যতো খুশি খাও, প্যাট ড়ুমড়ুম্যা করা খায়া ওঠো। কিন্তু দুইবার দেওয়া হবি না, পোটলাও বান্দার দিমু না। এই জেয়াফতে খাওয়ার বিধিমালা জানিয়ে সে বিধি প্রয়োগের উদ্যোগ নেয়, ওঠো! ল্যালপা বুড়া। ওঠো কলাম।
তখন মোটা একটা হাড় থেকে মজ্জা বের করার কাজে তমিজের বাপ খুব ব্যস্ত, গফুর কলুর নির্দেশ মানা তার পক্ষে অসম্ভব। বরং গফুরের হুমকিতে তার খিদে বাড়ে দশ গুণ এবং মজ্জা চোষা স্থগিত রেখে ভাত মুখে দিতে থাকে, তখন তার একেকটা গ্রাস তেআঁটিয়া তালের সমান। তার আশেপাশের এবং সামনের সারির কেউই তার দুইবার খাওয়া একেবারেই অনুমোদন করে না, জেয়াফতে এসে একবারের বেশি খাওয়া যে খুবই বদ খাসলতের প্রকাশ এ ব্যাপারে তারা একমত। তবে তাদের ধিক্কার জ্ঞাপনও পানসে। গফুর কলুকে খুশি করা তাদের উদ্দেশ্য, কিন্তু এই নিয়ে বেশি কথা বলা মানে এখন সময়ের অপচয় বিবেচনা করে পরম নিষ্ঠার সঙ্গে একটির পর একটি লোকমা মুখে তোলে। তমিজের বাপের দৃষ্টান্ত তাদের কাউকে কাউকে দ্বিতীয়বার চুপচাপ পাত পাতার ফন্দি আঁটতে উদ্বুদ্ধ করেও থাকতে পারে।
হুরমতুল্লা ও গফুর কলু দুইজনের দুই ধরনের আপত্তি সত্ত্বেও তমিজের বাপ ফের ভাত নেওয়ার জন্যে পাত থেকে মুখ তুলে এদিকে ওদিকে তাকায়। ওই সময় তমিজ ওই গলি দিয়ে যাচ্ছিলো গোশতের বালতি হাতে। মাঝিপাড়ার মানুষদের পরিবেশন করতে করতে গফুরের মতো সেও যাচ্ছিলো ভেতরের উঠানে তার বালতিটা ভরে নিতে। রান্নাবান্না বাইরে হলেও নিরাপত্তার স্বার্থে গোশতের বড়ো বড়ো ডেকচিগুলো রাখা হয়েছিলো বাড়ির ভেতরের উঠানে একটা নতুন চালার নিচে। তা তমিজ তো কিছুক্ষণ আগে নিজেই বাপকে পাত ভরে ড়ুমা ড়ুমা গোশত ঢেলে দিয়েছে। গোয়ালঘরের পেছনে এক পেট খেয়ে বাপকে ফের এখানে এসে বসতে দেখে তমিজের হাসিই পায় : বুড়ার বেটার খাবার হাউসটা একটু বেশি। তা খাক, বুড়া মানুষ, এরকম খাবার ফের কবে জোটে আল্লাই জানে। মণ্ডল এতো এতো খাওয়াচ্ছে, দুইবার কেন, তিনবার চারবার। খেয়েও বাপের দিলটা যদি মণ্ডলের প্রতি একটু নরম হয় তো ভালো। বাপটাকে বেশি করে গোশত দেওয়া যায় কী করে এই ভাবতে ভাবতে সে শুনতে পায় গফুর কলুর কড়া নির্দেশ, ওঠো। তুমি ওঠো কলাম। সঙ্গে সঙ্গে বাপের প্রতি প্রশ্রয় তার চাপা পড়ে তীব্র। ক্ষোভের তলায়।কয়টা দিন মণ্ডলবাড়ির এই জেয়াফতের জন্যে বেগার খাটলাম দেখ্যা বুড়া কী কথাটাই না হামাক শুনালো। আর তুমি এটি আসো ল্যালপা ফকিরের লাকান। তোমার দশগজি জিভখান লিয়া একবার গোলঘরের ওটি খায়া উঠা তুমি ফির আরেক জায়গাত অ্যাস্যা পাত পাতো। খাওয়ার এতো লালচ তোমার?—উচ্চারণ করে বলতে না পারলেও মনে মনে সে এই কথাগুলি ঠিক এমনি করেই আওড়ায়। গফুর কলু যেমন হারামি, মাঝির ঘরের তালাক-খাওয়া মাগীকে বিয়ে করে আর কাদেরের পাছার পেছনে। পেছনে ঘুরে ঘুরে শালা কি-না-জানি-হনু-রে ভাব নিয়ে থাকে, শালা বুড়া মানুষটাকে পাত থেকে না উঠিয়ে ছাড়বে না।-এতোগুলো মানুষের সামনে বাপের ভোগান্তি দেখা এড়াতে তমিজ হনহন করে হাঁটে গোয়ালঘরের দিকে, এমন কি গোশতের বালতি ভরে না নিয়েই। মাঝিদের পেট পুরে খাওয়াতে পারলে তাদের জানগুলো আরাম পায়। আবার তাদের মতো মাঝির ঘরের মানুষ হয়েও মণ্ডলবাড়িতে তমিজের দাপট দেখে ওই জানগুলোই হিংসায় চিনচিন করে। এতোগুলো জানের আরাম ও হিংসা তৈরির গৌরব ও সুখ থেকে সে বঞ্চিত হচ্ছে বাপের লালচের জন্যে।
