মেন্টালিটি তৈরি হবে পাকিস্তান হলে। নিজের দেশে পাওয়ার থাকবে নিজেদের হাতে, মুসলমান জমিদারদের তখন সোস্যাল রেসপনসিবিলিটি গ্রো করবে।
কিন্তু ডাক্তারের এই কথায় কাদেরের সায় নাই, সে বরং প্রতিবাদ করে, পাকিস্তানে জমিদারি সিস্টেম উচ্ছেদ করা হবে। বিনা খেসারতে জমিদারি উচ্ছেদ করা হবে। পাকিস্তানে নিয়ম হবে জমি তার লাঙল যার। পাকিস্তানের আমিরে গরিবে ফারাক থাকবে না।
এই কথাগুলো অনেক গুছিয়ে বলতে পারে ইসমাইল হোসেন। কলকাতা থেকে বস্তা বস্তা কাগজ আসছে, পপাস্টারে লিফলেটে এইসব কথা লেখা থাকে। পাকিস্তান নামে বইও এসেছে। কাদের সেসব পড়ে, কিন্তু ঠিকমতো বলতে পারে না। তার অগোছালো উত্তেজনায় কেউ সায় দেয় না। আসিরুদ্দিন ডাক্তার বরং একটু বিরক্ত হয়। জমিদারি ব্যবস্থার অভাবে সম্পত্তির মালিকানায় অরাজকতা দেখা দেবে ভেবে শরাফত মণ্ডল ছেলের মন্তব্যে সায় দিতে পারে না। বরং নিশ্চিন্তে হাসে ছোটোমিয়াই, বলে, তোমরা জমিদারদের সম্পত্তি কেড়ে নেবে, বড়োলোকদের মারবে। কম্যুনিস্টদের সঙ্গে তাহলে তোমাদের ফারাক কী? এদিকে দীন ইসলামের কথা বলো, ওদিকে নাস্তিকদের কথা ধার করে বলো। আমরা এখন কোনটা ধরি, বলো?
ইসলাম তো সব মানুষকে সমান অধিকার দিয়েছে। ইসলামে কোনো কাস্ট সিস্টেম নাই। আমাদের নবী এই কথা বলে গেছেন কতো আগে। কম্যুনিস্টরাই এসব ধার করেছে ইসলামের কাছ থেকে। কাদেরের গলা আত্মবিশ্বাসে ঝাঝালো হয়ে উঠেছে। এই ঝাঁঝ ইসমাইলের কাছ থেকে ধার-করা টের পেয়ে ছোটোমিয়া সন্তুষ্ট দামাদমিয়া এই এলাকায় সাগরেদ বেশ ভালো জুটিয়েছে। নমিনেশন পেলে ভোটটা ভালোভাবেই পাড়ি দেব। যাক, করতোয়ার পুব দিকটা তাহলে তাদের আত্মীয় কুটুম্বের দাপটে থাকে। ছোটোমিয়ার সন্তোষের আরেকটি কারণ হলো এই যে, ইসমাইলের সঙ্গে রাজিয়ার বিয়ের সম্পর্কটা পাকা হয় তার হাতেই। বড়ো ভাইয়ের তো ইচ্ছাই ছিলো না, মেজাভাইও তেমন গা করে নি। জমিজমা তেমন নাই; শুধু শহরের চাকুরে পরিবারের ছেলে হয়ে শিমুলতার মিয়াদের বাড়ির জামাই হওয়া অতো সোজা নয়। এই কঠিন কাজটি সম্পন্ন হলো কেবল ছোটোমিয়ার গোঁ ছিলো বলেই। আজ সেই জামাইয়ের সাফল্যের আভাস পেয়ে সে তো একটু খুশি হবেই। কাদেরকে তার ওই জামাইয়ের কথাগুলোর জবাব দিতেও তার ভালো লাগে, ইসলামে কি কারো সম্পত্তি দখল করার হুকুম আছে? আমাদের হজরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাহিসালাম কি হজরত ওসমান রাজিআল্লাহু আনহুর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিলেন? বরং তার সঙ্গে তিনি তার দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। ধনী গরিব বড়ো কথা নয় বাবা। পরহেজগার মানুষ আমির হলেও ভালো, গরিব হলেও ভালো।
এতোসব খুঁটিনাটি ব্যাপার কাদেরের জানা নাই, জবাবই বা সে দেবে কোত্থেকে? ইসমাইল ভাই আজ খামাখা কলকাতা গেলো। কর্পোরেশনের মেয়র ইলেকশনের এখনো এক মাস, অথচ সেই অছিলা করে লোকটা ছুটলো। সুযোগ পেলেই খালি কলকাতা ছছাটে। ইসমাইল হোসেন আজ থাকলে এখানে চমৎকার মিটিং করা যেতো একটা। এক সাথে এতো মানুষ পাওয়া কি সোজা কথা?
তোমাদের লীগের বড়ো বড়ো হোমরাচোমরা তো সবই জমিদার আর বড়োলোক। তাদের উচ্ছেদ করলে তোমাদের পার্টি টিকবে কী করে? তার দীর্ঘ বক্তব্যের উপসংহার সেরে তার যুক্তি প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে ভেবে ছোটোমিয়া তৃপ্তি পায় এবং বিজয়ীর উদারতায় আবদুল কাদেরকে রেহাই দিতে সে প্রসঙ্গ পাল্টায়। আবদুল আজিজের বড়ো ছেলে বাবরকে কোলে কাছে টেনে নিয়ে তার নাম, কোন স্কুলে কোন ক্লাসে পড়ে, পরীক্ষায় কেমন করে, ধান গাছে বড়ো বড়ো তক্তা হয় বাক্যটির ইংরেজি অনুবাদ কী প্রভৃতি জিগ্যেস করে এবং নিজের রসিকতায় হো হো করে হাসে। বাবর কিছুক্ষণ উসখুস করে ছোটোমিয়ার কৌতূহল ও আদর সহ্য করে ঘর থেকে বাইরে চলে যায়। ছেলে হাতছাড়া হলে ছোটোমিয়া ধরে তার বাপকে। আবদুল আজিজের বস সাব-রেজিস্ট্রার সাহেবের জীবন বৃত্তান্ত তার প্রায় সবটাই জানা। মুর্শিদাবাদের কোন এক। খান বাহাদুরের অকর্মণ্য ছেলে, আনওয়ার্দি সন অফ ওয়ার্দি ফাদার হিসাবে লোকটা চাকরি পেয়েছে কবে, সব কথা ছোটোমিয়া ফাঁস করে দেয়। আবার এটাও জানায়, সাব-রেজিস্ট্রারের সঙ্গে তাদের তিন পুরুষের আত্মীয়তা। ছোটোমিয়ার এক চাচী এসেছে ওই পরিবার থেকে এবং ওই চাচীর বাবা আবার ছোটোমিয়ার খালার দেওরের খালুশ্বশুর। তাদের এই ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধের কথা জেনে আজিজ বড়োই পুলকিত। জয়পুরে। অফিসে যোগ দিয়েই স্যারকে এটা জানাতে হবে। বেশ আনন্দিত চিত্তে এই খানকা। ঘরের মেহমানদের খাওয়ার বন্দোবস্ত কতোটা হলো তার খবরদারি করতে সে রওয়ানা হলো বাড়ির ভেতর। এইসব খাস মেহমানদের রান্নাবান্না হচ্ছে বাড়ির ভেতরে রান্নাঘরে, রাঁধছে তার বৌ আর শাশুড়ি। এদের জন্যে দুটো খাসি জবাই করা হয়েছে, এদের কেউ হয়তো গোরু নাও খেতে পারে। আর শুধু গোরুর গোশত দিয়ে কি সবাইকে ভাত খাওয়ানো যায়? দৈয়ের জন্যে লোক পাঠানো হয়েছিলো হাতিবান্ধায়, গোপাল ঘোষ নিজে দৈ নিয়ে আসবে। এখন পর্যন্ত তার দেখা নাই। বেলা হয়ে যাচ্ছে। তবে খানকা। ঘরের মেহমানদের আসার পরপরই ভারী নাশতা দেওয়া হয়েছে, তাদের খিদে লাগতে একটু সময় দেওয়ার দরকার।
এদিকে কিছুক্ষণের মধ্যেই জেয়াফতের মজলিশ থেকে জোরে জোরে ধমক দেওয়ার আওয়াজ পাওয়া গেলো। কী নিয়ে কে কাকে ধমক দিচ্ছে না এই খানকাঘর থেকে বোঝা গেলেও একজনের গর্জনে আঁচ করা যায় যে, ওখানে কেউ সাংঘাতিক অপরাধ করে। ফেলেছে। মজলিশের হৈ চৈতে এখানেও অস্বস্তিকর নীরবতা নামে। মুসলিম লীগের এক উত্তেজিত কর্মী এই সুযোগ পাকিস্তানের অপরিহার্যতা নিয়ে নতুন করে কথা বলতে শুরু করে। জমিয়ে আলাপ করার প্রস্তুতি নেয় আবদুল কাদের। কিন্তু শরাফত মণ্ডলের ইশারায় তাকে উঠে যেতে হয় বাইরে যেখানে কে যেন কাকে কষে ধমকাচ্ছে।
