এদের মধ্যে ছোটোমিয়াই বরং মানুষটা ভালো। টাউনে তার যাতায়াত বেশি। মাসে দুমাসে একবার কলকাতা যায়, দুই বছর পরপর দার্জিলিং ঘুরে আসে। আবার খদ্দরও ধরেছিলো কিছুদিন। দেশবন্ধু মারা যাবার সময় ছোটোমিয়া দার্জিলিঙে। দেশবন্ধুর শবদেহ নিয়ে কংগ্রেস ভলান্টিয়ারদের সূঙ্গে ছোটোমিয়া একই ট্রেনে কলকাতা গিয়েছিলো। ওই ট্রেনে মুসলমান ভলান্টিয়ার ছিলো আর কয়জন? এসব অবশ্য অনেক আগেকার কথা। রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছে তা বছর দশেক তো হবেই। এই লোকটা এখনো সবার সঙ্গে মিশতে পারে। ছোটোমিয়ার আর একটা ব্যাপার মণ্ডলের বড়ো পছন্দ, অবস্থাপন্ন ঘর হলেই তাদের সঙ্গে আত্মীয়তা করতে ছোটোমিয়ার আপত্তি নাই, অতো খানদানের ধার সে ধারে না। তবে তার ব্যারাম অন্যখানে। গ্র্যাজুয়েট না হলে তাদের বাড়ির জামাই হতে পারবে না। আরে এ কি গভর্নমেন্ট অফিসে অফিসার পোস্টে চাকরি দিচ্ছো যে বি এ পাস না হলে এ্যাপ্লাই করতে পারবে না?
গ্র্যাজুয়েট না হলেই বা আবদুল কাদের কম কিসে? ছোটোমিয়ার সঙ্গে কাদেরের আলাপ শুনতে শুনতে শরাফত মণ্ডল মুগ্ধ। বড়ো ছেলেটা তার সরকারি চাকরি করে, কিন্তু ভারিক্কি গোছের কি নামী দামি লোক দেখলে সরে সরে থাকে। গুজুরগাজুর ফুসুরাসুর সব ওই সিভিল সাপ্লাইয়ের কেরানির সঙ্গেই। অথচ আবদুল কাদের কেমন দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছে।
আপনে ইসমাইল সাহেবকে বলেন, টিকেটের একটু চেষ্টা তদবির করুক। আমাদের এদিকে তার ফিল্ড খুব ভালো। আর বাঙালির পুবে যমুনার পশ্চিমে আপনাদের কথা কেউ ফেলতে পারবে না।
কাদেরের কথায় ছোটোমিয়া মোটেই ফুলে ওঠে না, এসব কথা তারা জন্ম থেকেই শুনে আসছে। তবে ইসমাইলের প্রশংসা করায় লোকটা খুশি। ইসমাইল হোসেন তার আপন ভাস্তিজামাই, বড়োমিয়ার মেজোমেয়ের স্বামী। তবে ইলেকশনে সে নমিনেশন পাবে কি না তাতে ছোটোমিয়ার একটু সন্দেহ আছে, দামাদমিয়া টিকেট পাবে কী করে? এই এলাকায় তো তোমাদের পুরনো লোক অনেক। কাদের এতে দমে না, বরং আরো উৎসাহিত হয়ে বলে, তা আছে। তারা তেমন কামের মানুষ নয়। কলকাতার নেতাদের সঙ্গে ইসমাইল ভায়ের খাতির কতো বেশি। ছাত্রনেতা ছিলেন তো। পাকিস্তান ইসু সারা বাঙলায় যারা প্রচার করে।
পাকিস্তানের ব্যাপারে ছোটোমিয়ার উত্তেজনা কম, আমাদের বাবাজি পাকিস্তান ছাড়া কিছু বোঝে না। তুমিও তাই। তোমরা ছেলেমানুষ, মাথা গরম করা তোমাদের বয়সের ধর্ম।
ছোটোমিয়া ইসমাইল হোসেন ও তাকে বয়সের ও মাথা গরম করার ব্যাপারে এক কাতারে ফেলায় কাদের এই লোকটার প্রতি কৃতজ্ঞ হয়, এই কৃতজ্ঞতাবোধ তাকে একটু লাই দেয়। ফলে উত্তেজিত হয়ে সে বলে, পাকিস্তান ছাড়া মোসলমানের টেকার পথ নাই। মোসলমান কী ছিলো আর আজ কোথায় নেমেছে–।
মুসলমানদের বর্তমান হাল ব্যাখ্যা করার ভার তার হাত থেকে স্বেচ্ছায় তুলে নেয় টাউনের মাঝবয়েসি নেতা ডাক্তার আমিরুদ্দিন আখন্দ। দেখেন না, শিক্ষদীক্ষা, স্কুল কলেজ, কোর্ট কাচারি, অফিস আদালত, বিজনেস সব হিন্দুদের হাতে। আর জমিদার তো নাইন্টি পার্সেন্ট হিন্দু। লোকটা মনে হয় আজ সকালেই রিহার্সেল দিয়ে এসেছে, কিংবা নিজের চেম্বারে বসে রোজ রোজ বলতে বলতে তার মুখস্থ, মোসলমান হলো হিন্দু জমিদারের প্রজা, হিন্দু উকিলের মক্কেল, হিন্দু মহাজনের খাতক, হিন্দু মাস্টারের স্টুডেন্ট, হিন্দু ডাক্তারের পেশেন্ট।
ছোটোমিয়া তার কথার স্রোত একটুখানি আটকায়, কেন আপনার কাছে মোসলমান পেশেন্ট যায় না? ডাক্তার আসিরুদ্দিন জবাব দেয়, হিন্দু পেশেন্ট তো আমার কাছে যায়ই না, আবার মোসলমান সব ভালো ভালো শিক্ষিত মানুষের ধারণা, মোসলমান কখনো ভালো ডাক্তার হতে পারে না।
তাহলে খালি হিন্দুদের দোষ দেন কেন? মোসলমান ডাক্তার যদি ভালো হয় তো হিন্দু পেশেন্ট কি তার কাছে না গিয়ে পারবে? টাউনের চোখের ডাক্তার দুজনেই তো মোসলমান, হিন্দুরা তাদের দিয়ে চোখ দেখায় না? কলকাতায় সবচেয়ে বড়ো দাঁতের ডাক্তার তো মোসলমান, তার পেশেন্টদের মধ্যে হিন্দুর হার কতো বেশি তা হিসাব করে দেখেছেন?
এসব একসেপশন। টোটাল পজিশনটা কী? প্রশ্ন করে আবার জবাব দেওয়ার কাজটিও সম্পন্ন করে ডাক্তার সাহেবই, বিজনেস ওদের হাতে, চাকরি বাকরিতে বড়ো বড়ো পোস্টও দখল করে আছে তো ওরাই। ভালো পজিশনে থাকলে জাতভাইদের টেনে তোলা যায়। আমাদের সেই অপরচুনিটি কোথায়?
গভর্নমেন্ট তো মুসলিম লীগের। লীগ তো বেঙ্গল রুল করছে অনেক দিন। এক ফেমিন ছাড়া এদের বড়ো কীর্তি আর কী বলেন তো?
এই তো ঠিক পয়েন্টে আসলেন। ছোটোমিয়াকে জুতমতো ধরা গেছে এমন ভাব . করে ডাক্তার, ফেমিনের সময় বেঙ্গল গভর্নমেন্ট চাল চাইলো বিহার গভর্নমেন্টের কাছে, হিন্দু ডমিনেটেড কংগ্রেস গভর্নমেন্ট না করে দিলো। এখানকার হিন্দু লিডাররা পুরো সায় দিলো বিহারকে। ওয়ারের নাম করে বৃটিশ চাল সব গায়েব করে দিলো। বদনাম হলো। মুসলিম লীগের। পাকিস্তান হলে হেলপ করবে গোটা ইনডিয়ার মোসলমানরা। মোসলমান বিজনেস কমিউনিটি হেলপ করার স্কোপ পাবে।
মোসলমান জমিদার যারা আছে তারা এখুন কী হেলপ করছে? হিন্দু জমিদার ছাড়া দেশে স্কুল কলেজ হতো? এই ডিস্ট্রিক্টে এক জেলা স্কুল ছাড়া আর সবই হিন্দু জমিদারদের দান। টাউনে তো বড়ো বড়ো জমিদার দুজনেই মোসলমান, কোনো স্কুল কলেজের জন্যে একটা ইট দিয়েছে কেউ? ডাক্তার সাহেব, এসব কাজ করতে আলাদা মেন্টালিটি লাগে, বুঝলেন?
