মওলানার মোনাজাত হচ্ছিলো উর্দুতে, উর্দুতে সমবেত জনতার অজ্ঞতা এই ভাষার প্রতি তাদের ভক্তিকে উস্কে দেয় এবং এর রহস্যময়তা আরবি আয়াতের সঙ্গে সবরকম ফারাক মোচন করে। ওদিকে পঙক্তিতে বসা লোকজনের অনেকেই অধৈর্য হয়ে নুন দিয়েই ভাত মেখে খেতে শুরু করেছে। এমন কি কারো কারো ক্যা গো তরকারি দিবা না? ভাত কি শুধাই খাওয়া লাগিব? তোমরা কিসের সাকিদারি করো? পাতেত গোশত কুটি? প্রভৃতি অভিযোগ ঠোকাঠুকি লাগে মোনাজাতের কথার সঙ্গে। এতে বিরক্ত হয়ে কাদের আজিজের পাশে দাড়িয়ে হুকুম ছাড়ে, খামোশ! এই শব্দটির অর্থ পরিবেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকদেরও জানা না থাকায় ঘাবড়ে গিয়ে গোশতের বালতি মাটিতে রেখে তারা মোনাজাতের জন্যে হাত তোলে এবং তাদের দেখাদেখি হাত তোলে খেতে বসা মানুষের অনেকে। নুন দিয়ে ভাত যারা মেখে ফেলেছিলো তাদের নাকে লাগে ভাতের গন্ধ এবং ঘ্রাণে অর্ধ ভোজনং-এর তৃপ্তির বদলে তাদের পেটে তারা পায় খিদের নতুন মোচড়। মোনাজাতে নিষ্ঠার সঙ্গে শরিক হয়েছিলো সতরঞ্চি পাতা খানকা ঘর ও ওই ঘরের বারান্দায় বসা মেহমানরা। মাসুম বালক মোহাম্মদ হুমায়ুনের বেহেশত * নসিবের জন্যে আল্লাপাকের দরবারে, মওলানা সাহেবের আকুল আবেদনে তাদের চোখ ভিজে যায়, আমিন আমিন বললে তাদের গলা থেকে গড়িয়ে পড়ে নোনতা আওয়াজ। এই মাসুম আওলাদের অছিলায় তার বাপমা, দাদাদাদী এবং সমস্ত পূর্বপুরুষের গোনাখাতা মাফ করার জন্য মিনতি জানানো হচ্ছিলো। আগরবাতির ধোয়া এই ঘরে ছিলো স্বচ্ছ উৎসের মতো, গোশতের গন্ধে বিলুপ্ত হবার জন্যে ছোটার আগে ওই ধোয়া এই ছছাটো মজলিশে হুমায়ুনের তো বটেই, তার বাপদাদা এমন কি অপরিচিত পূর্বপুরুষের জন্যে লোকদের সংহত করে তোলে। হুমায়ুনের বড় ভাই বাবর বসেছিলো দাদুর কোল ঘেঁষে। পড়াশোনায় ভালো বলে এই নাতিটির জন্যে শরাফত মণ্ডলের টান একটু বেশি। দোয়ার প্রথম থেকে তার চোখ দিয়ে অবিরাম পানি ঝরছিলো, মোনাজাতের সময় ভাষার দুর্বোধ্যতা ছাপিয়ে মওলানা সাহেবের আকুল মিনতি তাকে ধাক্কা দেয় বেশ জোরেসোরে এবং সে কাঁদতে থাকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। আর শরাফত মণ্ডলের চোখ ছলছল করে, চোখের পানি আটকে থাকে চোখের গভীর গর্তে এবং নোনা পানির পর্দা ফুড়ে সে তাকিয়ে থাকে মিয়াবাড়ির ছোটোমিয়ার সৌম্য চেহারার দিকে। ছোটোমিয়ার ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবি ও পায়ের ওপর যেনতেনভাবে ছড়িয়ে রাখা একই রঙের কাশ্মীরি শাল থেকে আসা আতরের গন্ধ শরাফতের শোককে গৌরব দেয় এবং ছোটোমিয়ার প্রায়-বন্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে সে তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় বুদ হয়ে যায়।
শিমুলতলার বুড়ো বুড়ো চার ভাইয়ের পানজর্দা খাওয়া ও গড়গড়া টানা চার জোড়া ঠোঁটের বাঁকা হাসির কুচিতে তার নিজের চোখজোড়া খচখচ করতে পারে-এই ঝুঁকি নিয়েও শরাফত দুইবার গিয়েছিলো তাদের দাওয়াত করতে। বড়ো বড়ো ডেকচি কাদের জোগাড় করতে পারতো তো টাউন থেকেই। কিন্তু মণ্ডল ছেলের কথায় কান না। দিয়ে ওইসব চাইতে গেলো শিমুলতলার মিয়াদের বাড়িতে। এতে বড়ো বড়ো হাঁড়িপাতিল ও দামি বাসনপত্র সংগ্রহে মিয়াদের পুরনো সমৃদ্ধির ধারণাটির নবায়ন করা হয়। তা এতে কাজ হয়েছে; ছোটোমিয়া এসেছে তার মেজোভাইয়ের এক নাতিকে নিয়ে।
আবদুল কাদেরের মেহমানরা টাউনের যতো দাপটের বান্দা হোক না কেন, শরাফত মণ্ডলকে তারা ওপরে ওঠাবে কতোটা? তারা দল বেঁধে এসেছে, জমিয়ে গপ্পোজব করছে, তারা পাকিস্তান, মুসলিম লীগ, কংগ্রেস, গান্ধিজি, জিন্না সাহেব, ইলেকশন, জহরলাল, কৃষক প্রজা পার্টি, হক সাহেব, সোহরোয়ার্দি, আবুল হাশিম, নাজিমুদ্দিন, আলিগড়, ইসলামিয়া কলেজ নিয়ে মেলা বাক্য ছাড়বে। মানুষ হাঁ করে ওইসব শোনে এবং বেশিরভাগ কথা না বুঝে কিংবা বোঝে না বলেই অভিভূত হয়। তারপর স্লামালেকুম বলে টমটমে চেপে তারা টাউনের দিকে রওয়ানা হলে লোকজন অনেকক্ষণ বিলীয়মান টমটমের দিকে তাকিয়ে থাকে। টমটম চোখের আড়াল হতেই তাদের কথা লোকে ভুলে যাবে, তাদের কথাবার্তার যেটুকু বুঝেছে তাও ভুলে যাবে। কিন্তু শিমুলতলার মিয়াদের সঙ্গে এক কাতারে না হলেও একই দিনে, একই জেয়াফতে, একই বাড়িতে ভাত খাবার কথা তারা জীবনে ভুলবে না।
শিমুলতলার মিয়ারা আজকের খানদান নয়, সেই কবে থেকে দীঘাপতিয়ার রাজাদের মস্ত তরফের খাজনা আদায় করে আসছে এরা। জেলার গোটা পুর এলাকার দীঘাপতিয়ার প্রজাপাটের ওপর চোটপাট করা, তাদের মারধোর করা, তেমন সুন্দরী মেয়ে চোখে পড়লে তাদের ভোগ করা,—সবই তো করে আসছে এরা। ইদানীং দুই পাতা লেখাপড়া করে ছোটো ঘরের কেউ কেউ বেয়াদব হয়ে উঠছে, এই ছোটোলোকের বাচ্চারা কাউকেই আমল দিতে চায় না। শগ্রফত তবু জানে, মরা হাতির দাম লাখ টাকা। শিমুলতলা পড়ে গেলেও এদের নাম থেকে এখনো আভা বেরোয়। এদের অবস্থা। পড়ো পড়ো হয়েছে বলেই শরাফত এদের সঙ্গে একটা সম্পর্ক করার সখ করতে সাহস পায়। বড়োমিয়ার এক নাতনিকে কাদেরের বৌ করে আনার কথা সে একবার ভেবেছিলো, জগদীশ সাহাকে দিয়ে মিয়াবাড়িতে ইশারাও দিলো। জগদীশ বললো, সত্যিমিথ্যা জগদীশই জানে, প্রস্তাব শুনেই বৃড়োমিয়া জ্বলে ওঠে, চাষার, সাহস তো কম নয়, তার ঘরের মেয়ে নিতে চায় নিজের ছেলের বৌ করে!
বড়োমিয়া ওরকম রাগ না করলেও তো পারে। শরাফত নিজের হাতে লাঙল ধরে না, তার বাপই লাঙল ধরা ছেড়েছে জোয়ান বয়সেই। এ কথা ঠিক, জমিজমা কি জোতসম্পত্তির দিক থেকে মিয়াদের তুলনায় তারা কিছুই নয়। কিন্তু মণ্ডলের ধানপান, বাঁশঝাড়ের আয়, গোলাবাড়ি হাটের দোকানে কেরোসিন তেল বেচার টাকা—এসব ধরলে তার রোজগার তালুকদারদের কাছাকাছিই যাবে। জগদীশ সাহা অনেক রাত করে শিমুলতলায় তালুকদারদের বাড়ি যাওয়া আসা করে; এসবের মানে কি মণ্ডল বোঝে না? মিয়াদের নাক কারো কারো বেশ চাপাই, কিন্তু অবস্থা পড়তে শুরু করার পর থেকে তাদের নাক-উঁচু ভাবটা বাড়ছে।
