এতো বড় আয়োজন,-শরিক না হয়ে কি তমিজ পারে? তমিজের বাপ এই নিয়ে গাঁইগুঁই করে : কারো জমিতে মাঙুন কামলা খাটতে তমিজের এতো আপত্তি, শমশেরের। ধান কাটার সময় মাঙুন কামলা খাটলো বলে বাপটাকে তমিজ তো কম হেনস্থা করে। নি। আর মণ্ডলের বাড়িতে তুমি মাগনা খেটে মরো, তাতে তোমার খুব পোষায়? ২ বাপটাকে নিয়ে তমিজের পদে পদে বিপদ! বুড়ার বেটার গো আর কমলো না। নিজের বেটা মরার আগে আবদুল আজিজ কতোবার খবর দিলো, তমিজও কতোবার বললো, আজিজের বৌ কি স্বপ্ন দেখেছে তাই নিয়ে কী বলবে,—তা বুড়া গেলো না তো গেলোই না। শেষপর্যন্ত কুলসুম না গেলে আবদুল আজিজ যে কী কাণ্ডটা করতো ভাবতেও তমিজের গা শিউরে ওঠে। আর সে-ই কি আর কাদেরের কাছে মুখ দেখাতে পারতো?
বাপের কথা শুনলে কী আর তমিজের চলে? আবুদল কাদের তো অনেকটা ভরসা করে তার ওপরেই। তার টাউনের মেহমানদের খেদমত করতে গফুর কলু একাই যথেষ্ট, কিন্তু চল্লিশার প্রস্তুতির কাজে কয়েকটা দিন তাকে ছেড়ে দিলে কাদেরের চলবে কী করে? কাদেরের দোকানে বসে তেল বেচার কাজটা গফুর একাই করে। ঘানিতে সর্ষে। তেল বার করার চাইতে দোকানে বসে কেরোসিন তেল বেচা অনেক সোজা। এখানে ইজ্জতও আছে,-কন্ট্রোল রেটে আধ পোয়া তেল পেতে কতো মানুষ তাকে কী তোয়াজটাই না করে। আগে এইসব মানুষ কলুর বেটা বলে তাকে কতো হেলা করেছে। গফুরের কাজ আরো আছে। মুসলিম লীগের ছেলেরা দোকানে আসে দলের কাজ করতে। কাদের না থাকলে তাদের বসতে দেওয়া, তাদের কাজের সুবিধা অসুবিধার দিকে খেয়াল রাখা এবং কাদের সম্বন্ধে কে কী বললো সেদিকে একটু নজর রাখাও বটে,—এসব করে কে?
ভদ্রলোক মেহমান যা অনুমান করা গিয়েছিলো তার চেয়ে কমই এসেছে। আবদুল আজিজের অফিসের লোকজন অতো দূর থেকে আসতে পারে না। টাউনের সিভিল সাপ্লাই অফিসে সে তার তিনজন বন্ধুকে দাওয়াত করেছিলো, এসেছে একজন। আবদুল কাদেরের মেহমান মেলা, তবে দাওয়াত করা হয়েছিলো আরো অনেককে। আজিজ বা কদেরের যত খুশি মেহমানকে আপ্যায়ন করতে শরাফত মণ্ডলের কিছুমাত্র আপত্তি নাই। কিন্তু কাঁচা রাস্তায় টমটমের ঝাকুনি খেতে খেতে টাউনের বাবুরা যে এই পর্যন্ত কতো আসবে সেটা তার ভালো করেই জানা আছে!
লাঠিডাঙা কাছারির মুসলমান পাইক বরকন্দাজদের সবাইকে বলা হয়েছিলো। কাদের খামাখা তড়পালো, নায়েববাবুর ভয়ে ওরা এক সঙ্গে এতোগুলো মানুষ কাছারি ছেড়ে আসবে কি-না সন্দেহ। শরাফত অবশ্য ঠিকই জানে কয়েক বছর আগে হলেও পাইক বরকন্দাজের এক দিনের কামাই নিয়ে নায়েববাবু হাম্বিতম্বি করতো, কিন্তু বুড়ো হতে হতে লোকটা ধর্মকর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। কারো ধর্মের আচার অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার মানুষই সে নয়। নায়েববাবুর এখনকার কথাই হলো; আমার ধর্ম আমি মানি। তোমার ধর্ম ভুল হক আর যাই হোক, সেটাই ঠিকমতো পালন করো। মানুষের সবই অনিত্য, এই ভবসংসারে সবই নশ্বর, কিন্তু ধর্ম আর জাত হলো জীবনের সার; ওটা গেলে মানুষের আর রইলো কী?
কামারপাড়ায় নেমন্তন্ন করলে সেটা বরং নায়েববাবুর সইতে না। মোসলমানের মড়ার শ্রাদ্ধের ভাত গিলে জাত খোয়ানোর অধিকার ভগবান কিংবা নায়েববাবু কেউই তাদের দিতে পারে না। তবে কাদেরের বিয়ের সময় মণ্ডল তার কামারপড়ার আধিয়ারদের ঠেসে খাওয়াবে; শিমুলতলার মিয়ারা তো বাড়িতে বিয়েসাদি হলে একটা দিন খওয়ায় শুধু হিন্দুদের। মণ্ডলও তাই করবে।
তা হুমায়ুনের চল্লিশায় মানুষও হয়েছিলো বাপু! গিরিরডাঙা, নিজগিরিরডাঙা, গোলাবাড়ি, ছাইহাটা থেকে ওদিকে রানিরপাড়া পারানিরপাড়া মহিষাবান,-কোনো গ্রামের মানুষ বাদ পড়ে নি। চাষা বলো, মাঝি বললা, কলু বলো আর জোলা বলো সবাই এসেছে ঝাঁক বেঁধে, ছেলেপুলে নাতিপুতি নিয়ে–এতো এতো সব মানুষে গোটা গাও গমগম করে; কালাহার বিলের সব মাছ ভিড় করে গিরিরডাঙার তটের দিকে। ফজরের নামাজের পরপরই মসজিদে দোয়া পড়া হলো। বলতে গেলে এই উপলক্ষেই মণ্ডলবাড়ির লাগোয়া জুম্মাঘরটার বেড়া নতুন করা হলো, জুম্মাঘরকে মসজিদ বলা শুরু হয়েছে এর আগে আগে। আহলে হাদিস জামাতের মসজিদ, এখানে মিলাদ পড়ানো চলে না। কাদের টাউনের টাইটেল পাস মৌলবিকে দিয়ে দোয়া পড়াতে চাইলেও মণ্ডল রাজি হয় নি, বাপদাদার আমলের রেওয়াজ মোতাবেক গায়ের জুম্মাঘরের ইমাম সাহেব দোয়া পড়ুক। পরে নাহয় খাওয়া দাওয়া দেওয়ার পর নাজাতের দোয়া পড়বে টাউনের আলেম সাহেবরা।
খানকা ঘরের উঁচু বারান্দায় সতরঞ্চির ওপর দুই দিকে বালিশ দিয়ে সাজানো। জায়নামাজে বসে নাজাতের দোয়া পড়ে টাউনের জামে মসজিদের ইমাম আলহাজ মওলানা হাফেজ আবু নসর বরকতুল্লাহ প্রতাপপুরী সাহেব। দুই পাশে বালিশের শিওরে কাঁসার গ্লাসে চালের ভেতর গোঁজা আগরবাতির ধোঁয়ায় ভর করে মওলানা সাহেবের সুরেলা মিষ্টি গলার এহলান ছড়িয়ে পড়ে বাড়ির সামনে বিশাল জমায়েতে এবং দেখতে দেখতে তা মিশে যায় বড়ো বড়ো ডেকচির গোরুর গোশতের সুরুয়ার গরম ধোঁয়ায় এবং রূপান্তরিত হয় খিদে-বাড়ানো সৌরভে।
এতো এতো লোক দেখে হামিদ সাকিদার ও গফুর কলু ঘাবড়ে যায় এবং সারিতে সারিতে ভাত দেওয়ার ব্যাপারে একটু তাড়াহুড়াই করে। দোয়া পড়ার শুরুতেই কলাপাতার ভাত ও নুন দেওয়া হয়ে গিয়েছিলো, বালতিতে বালতিতে আটা দিয়ে পাক-করা গোরুর গোশত নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পরিবেশনের জন্যে, তখন আরম্ভ হলো মোনাজাত। সারি সারি মানুষ অপেক্ষা করছে গোশতের জন্যে। গোশতের বালতি নিয়ে ছুটছে হুরমতুল্লা, কালুর বাপ, হামিদ সাকিদার, গফুর কলু, তমিজ,-মোনাজাতের দিকে এদের খেয়াল নাই। খানকা ঘরের বারান্দার ধারে দাঁড়িয়ে আবদুল আজিজ হঠাৎ জোরে নির্দেশ দেয়, মোনোজাত হচ্ছে, মোনাজাত; সবাই হাত তোলেন। পরপরই মওলানার স্বর হঠাৎ করে চড়ে গেলো।
