মাঝির বেটা, আসমানেত ছ্যাপ ফালাবার হাউস করিস কোন সাহসে? ফুলজানের গলায় এই কথা সে শুনতে পায়, তবে সেটা তমিজের হাতের ভেতর সে থাকতে থাকতে না হাত থেকে গলিয়ে যাবার পর, তার খেয়াল নাই।আরো ব্যাপার আছে।-ফুলজানের এই ছিছিক্কার মোষের দিঘির ধার থেকে তার কানে বাজে অনেকক্ষণ পরে। মোষের দিঘির পাড়ে ফুলজান হঠাৎ হাওয়া হয়ে গেলে হাঁপাতে হাঁপাতে টলোমলো পায়ে তমিজ ঢুকে পড়ে নিজের ধানখেতে। সারা গায়ে তখন তার অবসাদ, হাতপা সব ঝিমঝিম করছে, তার সর্বাঙ্গে তখন ঝি ঝি ধরেছে। ধানের জমিতে ধপ করে বসে পড়ারও বেশ কিছুক্ষণ পর ফুলজানের কথা মরিচখেত হয়ে কচি মরিচের ঝাল মেখে নিয়ে তার দুই কানে দুটো চড় লাগালো। এতে তমিজের অবসাদটা কাটে, হাতে পায়ে ঝি ঝি কেটে গিয়ে সারা শরীর জ্বলতে লাগলো। তার অস্থির হাতের মুঠিতে গোছা গোছা ধানের শীষ ঢুকেও পিষে যায় না। গোছা ধরে ধানের শীষ তার খেউরি-না করা গালে ঘষতে সে বেশ আরাম পায়। তবে কয়েকটা শীষের মধ্যে থেকে ধানের দানা পড়ে গেলে তার ভয় হয়, ধান কাটতে অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে না তো?
বিলের উত্তর সিথান এড়াতে কিংবা নৌকায় বিল পাড়ি দিতে তমিজ রওয়ানা হয় দক্ষিণের দিকে। কিন্তু মণ্ডলের কোষা নৌকাটা বিলের ওপারে ফকিরের ঘাটে বাঁধা। তাই তাকে হাঁটতে হয় বিলের দক্ষিণ ধার ঘেঁষে। কিন্তু তার চোখ বিলের ওপারে। হাঁটতে হাঁটতে দেখে, একটি ছায়া চলেছে তার সঙ্গে সঙ্গে। গোটা বিল পার হয়ে তার ছায়া পড়বে বিলের ওপারে—এটা কি কখনো হতে পারে? না, ওই ছায়াটি তার নয়। ছায়া ছায়া মানুষটির ঘাড়ে তৌড়া জাল। ছায়া চলেছে উত্তরের দিকে। ভয়ে ও খানিকটা আশায় ভালো করে ঠাহর করলে তমিজ বোঝে, ওটা ছায়া নয়, লোকটি তমিজের বাপ। বাপ তার ঘুমের মধ্যে হেঁটে চলেছে উত্তরের দিকে। বিলের ওপারে তমিজের বাপ সুরা পড়ার মতো বিড়বিড় করে কী বলে; আর বিলের রুই কালা, পাবদা ট্যাংরা, খলসে পুঁটি, কৈ মাগুরের নিশ্বাসে প্রশ্বাসের বুদবুদে টাটকা হয়ে বিলের পানিতে ড়ুবসাঁতার দিয়ে সেইসব কথা এসে ভেড়ে বিলের পূর্ব তটে। পঁড়িয়ে একটু মনোযোগ দিলেই
তমিজ তার বাপের সব কথা শুনতে পায় :
সুরুজে বিদায় মাঙে শীতেতে কাতর।
শীষের ভিতরে ধান কাঁপে থরথর।।
পশ্চিমে হইল রাঙা কালা পানি অচিন ডাঙা
ফকিরে করিবে মেলা রাত্রি দুই পহর।
ধানের আঁটি তোলো চাষা মাঝি ফেরো ঘর।
জীবনে কখনো শুনেছে কি-না মনে করতে না-পারা এই লম্বা শোলোকের প্রতিটি অক্ষরের ঠেলায় ঠেলায় তমিজ বাড়ি পৌঁছে গেলো বেশ তাড়াতাড়ি। তার বাপের ঘরের দরজা খুলে দিয়ে কুলসুম একটু সরে দাঁড়িয়ে বলে, এতে আতেত তুমি কোটে গেছিলা গো? তোমার বাপের ব্যারাম তোমাক ধরিছে? দরজায় বাঁশের উঁশা লাগাতে লাগাতে সে হাসে, আজ তুমি কোটে কোটে ঘোরো আর তোমার বাপ নিন্দ পাড়ে ঘরের মদ্যে।
চোপসানো বুকে তমিজ ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজ করে, তাঁই ঘরত?
তো?
ঘরের ভেতর দিয়ে ভেতরের বারান্দায় গিয়ে তমিজ তখন ঢুকছিলো নিজের ঘরে। কুলসুমের কথা শুনে বাপের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো, মাচার ওপরে বাপ তার শুয়ে রয়েছে কাঁথা মুড়ি দিয়ে। তাহলে? বিলের ধারে ধারে তৌড়া জাল কাঁধে হাঁটতে হাঁটতে তাহলে শ্লোক বলছিলো কে? বাপকে তমিজ এভাবে ঘুমিয়ে থাকতে দেখায় এবং শোলোকের একটি কথাও মনে করতে না পারায় তার সামনে থেকে ছোট্টো উঠানের জ্যোৎস্না নিভে যায়। সে তখন ঢুকে পড়ে নিজের ঘরের ভেতর। তারপর কাঁথা গায়ের ওপর দিয়ে শুয়েছে কি শোয় নি, কুলসুম হঠাৎ জোরে চেঁচিয়ে ওঠে, হামার গিলাপ? গায়ের লয়া কাপড়খান হামার কুটি ফালায়া আসিছো?
কুলসুমের ব্যাকুল জিজ্ঞাসার জবাবে তমিজের মাথা পড়ে যায় তেলচিটটিচে বালিশের ওপর। আর নতুন সুতির র্যাপার নিয়ে উদ্বেগ ও আক্ষেপ জানাতে জানাতে কুলসুম করে কী, তমিজের মাথার কাছে নাক দিয়ে খুব টেনে টেনে নিশ্বাস নিতে থাকে। যতটা তীব্রভাবে পারে, নিশ্বাস নিয়ে তমিজের মাথার গন্ধে গন্ধে নতুন গিলাপের হদিস সে করে ছাড়বে। তমিজের মাথায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে, এটা কী? সেই ছোঁয়ায় তার চোখ বুজে আসে। একটু-আগে-শোনা ও এখন ভুলে-যাওয়া শোলোক, সুর করে শোলোক বলতে বলতে তার বাপের উত্তরের পানে যাওয়া এবং সেই বাপেরই আবার কোথাও না গিয়ে ঘরের মাচায় ভেঁস ভোঁস করে ঘুমানো,-এতোসব এলোমেলো কাণ্ড এড়াতেই সে হয়তো চলে যাচ্ছে ঘুমের আড়ালে। কিন্তু ঘুমের একটা পরত পেরিয়ে পরের পরতটিতে পৌঁছুতে পৌঁছুতে মরিচখেতের মশারি খুলে গলগল করে বেরিয়ে আসে চালের আটা গোলানো চাঁদনি, সেটা আবার দপ করে জ্বলে ওঠে মোষের দিঘির পুব পাড়ে। সেখান থেকে তৌড়া জালে জড়িয়ে নিয়ে তাকে ফেলে দেওয়া হয় কালাহারের গভীর নিচে। মস্ত একটা বেড় জাল গোটা বিল সেঁচে উত্তরদিকে গোটাতে শুরু করলে তার ঘুম বারবার ছিড়ে যায়। কী জ্বালা! তমিজ তখন পাশ ফিরে শোয় একটা হাত তার গালের নিচে রেখে।
হাতের চাপে তার কয়েকদিন না-কামানো দাড়ি গালে লাগে। তার গালে ধানের শীষ তখন খোঁচা খোঁচা চুমু দেয়। তার চোখ জুড়ে নামে রাজ্যের ঘুম। নতুন র্যাপারের হদিস জানতে কুলসুম আরো অনেকক্ষণ তার মাথার গন্ধ শুকেছে কি-না সে টের পায় নি। হয়তো শুকেছে। তবু সে ঘুমায়। কিংবা হয়তো এই জন্যেই ঘুম নামে তার দুই চোখ ঝেঁপে।
১৪. হুমায়ুনের চল্লিশার ধুম
ধান কাটতে তমিজের আরো কয়েকটি দিন সবুর করতে হবে। এর মধ্যে লাগলো হুমায়ুনের চল্লিশার ধুম। শরাফত মণ্ডলের বর্গাদারদের সবাই কয়েকটা দিন পেটে ভাতে খেটে দিলো। আপখোরাকি মজুরি দেওয়ার ইচ্ছা আজিজ ও কাদের দুজনেরই ছিলো, বাড়ির মাসুম ছেলেটার রুহের মাগফেরাতের জন্যে খরচ করতে তাদের কোনো দ্বিধা নাই, এখানে পয়সা ঢালা মানে আখেরাতের সঞ্চয়। কিন্তু মণ্ডলের বড়ো বর্গাদার হামিদ সাকিদার অভিমান মতো করে : যার জমি চাষ করে তাদের রেজেক, তার বাড়ির শোক উদযাপনে গতর খাটিয়ে তারা পয়সা নেয় কোন আক্কেলে? তাদের আল্লারসুল নাই? তাদের আখেরাত নাই? গরিব হলেও কেয়ামতের দিন তাদের জবাবদিহি করতে হবে না? তার কাকুতি মিনতিতেই শরাফত তাদের মজুরি না দিয়ে দুই বেলা গরম ভাত খাওয়াবার ব্যবস্থা করে। আবদুল আজিজ খাওয়াবার ঝামেলার মধ্যে যেতে চায় না বলেই পয়সা দিয়ে কাজ করার পক্ষে। পয়সা নাও, কাম করো। একেকজনের হাতির খোরাক জোটাবার চেয়ে পৌষ মাসের খেতমজুরির রেটে পয়সা দিলে রবং অনেকটা সাশ্রয় হয়। কিন্তু তার বর্গাদারদের দুনিয়াদারির সঙ্গে আখেরাতের দেখভালের জিম্মাদারি শরাফতের এখতিয়ারেই পড়ে। সুতরাং নতুন ধান ভানা, বর্গাদারদের কারো কারো বাড়ির গাছ কাটা, করতোয়ার ওপারে দশটিকার হাট থেকে ৭টা বড়ো বড়ো দামড়া কিনে তাদের হটিয়ে নিয়ে আসা, কয়েক মণ আটা, আলু মশলাপাতির জোগাড়যন্তর করা, বাড়ির খুলিতে মস্ত মস্ত চুলা কাটা, কয়েক মাইল পুবে শিমুতলার মিয়াবাড়ি গিয়ে ভারে করে বড়ো বড়ো ডেকচি বয়ে আনা এবং চল্লিশার দিন রান্নাবান্না ও পরিবেশনের কাজ করার অনুমতি দিয়ে শরাফত তার আধিয়ারদের সওয়াব হাসিলের সুযোগ করে দেয়।
